কামরাটার এক কোণে পিতলের ধূপাধারে জ্বলতে থাকা ধূপের ঝাঁঝালো গন্ধে তার মাথা ঘুরতে শুরু করে। সে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলে যখন তার মালিশ শেষ হতে কোথা থেকে এক খোঁজা এসে তাঁর দেহ মসলিনের একটা আলখাল্লায় জড়িয়ে দেয় যা এতই সূক্ষ যে তার দেহের চারপাশে এটাকে প্রায় স্বচ্ছ দেখায় এবং তাকে একটা নিচু তেপায়র কাছে বসার জন্য নিয়ে আসে। তাকে সেখানে বসিয়ে খোঁজাটা এবার তার চুল আচড়াতে আরম্ভ করে, সুগন্ধি ছিটিয়ে দেয় এবং পাথরখচিত ফিতে দিয়ে চুলে বেণী করে দেয়। আরেক খোঁজা, মনোসংযোগের কারণে এর জ্বটা কুঁচকে রয়েছে, তার ভ্র তুলে দেয় এবং তারপরে চোখে সুন্দর করে কাজল দিয়ে তার লম্বা কালো চোখের পাপড়িতে আরও কালো করে তুলে। তারপরে, মর্মরসদৃশ অ্যালাবাস্টারের একটা আলতার পাত্র থেকে আলতা নিয়ে তার ঠোঁট দুটো রাঙিয়ে দেয়। খোঁজাটা যখন উঠে দাঁড়িয়ে উফুল্ল একটা শব্দ করে মেহেরুন্নিসা বুঝতে পারে সে নিজের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট। তৃতীয় খোঁজা এবার সবুজ জেড পাথরের পাত্রে মেহেদী নিয়ে আসে। একটা সূক্ষ্ম তুলি দিয়ে সে তার হাতে পায়ে আর বাহুতে জটিল আলপনা এঁকে দেয়। অন্যমনস্কভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে যেন অনেক দূর থেকে দেখছে এমনভাবে সে তার কাজ দেখে-ভাবটা এমন যেন সে একটা ছোট্ট পুতুল সাজাচ্ছে যার সাথে তার নিজের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু লোকটা পরবর্তী কথায় তার সম্বিত ফিরে সে বুঝতে পারে এটা আসলেই তাঁর দেহ। মালকিন, এবার আপনার আলখাল্লাটা খুলতে যে হবে।’
মেহেরুন্নিসা তার মসৃণ, খানিকটা বিরক্তিকর মুখে দিকে চোখ তুলে তাকায়। খোঁজা হলেও তার কণ্ঠস্বর পুরুষের মতই ভারি। তুমি কি বলছো?’
‘অনুগ্রহ করে আপনার আলখাল্লাটা খুলেন, সে আবারও বলে। সে তারপরেও যখন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেই তার দিকে ঝুঁকে এসে তাঁর মসলিনের আলখাল্লার গলার নিচে হাত ঢুকিয়ে আলতো করে সেটা তার কাঁধের উপরে তুলে নিয়ে আসে যতক্ষণ না তাঁর স্তনযুগল অনাবৃত হয়। তারপরে, শক্ত করে ঠোঁট চেপে রেখে সে তার স্তনবৃন্তে তুলির অগ্রভাগ আলতো করে ছুঁইয়ে সেগুলোকে আরও গাঢ় করে তুলতে তুলির স্পর্শে তার স্তনবৃন্ত শক্ত হয়ে যায় এবং এসব কিছুই লক্ষ্য না করে লোকটা তার স্তনবৃন্তের চারপাশের আপাত ধুসর ত্বকে ছোট ছোট ফুলের নক্সা আঁকতে থাকে। তার কাজ শেষ হতে সে পুনরায় তাঁর আলখাল্লাটা জায়গামত নামিয়ে দেয় এবং চিৎকার করে বলে, ‘খাজাসারা মালকিন প্রস্তুত।’
মালা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় তারা দু’জনে জহুরীর চোখ নিয়ে তাকে খুটিয়ে দেখে। তারপরে মালা সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। চমৎকার। তুমি দারুণ কাজ দেখিয়েছে। আর মেহেরুন্নিসাকে সে বলে, বাইরের আঙিনায় আবার ফিরে চলো।’ প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্থানে বন্ধনীযুক্ত মশালদানে মশাল জ্বলতে শুরু করেছে এবং আঙিনার উপরের এক চিলতে আকাশের বুকে তাকিয়ে সে দেখে ইতিমধ্যে রাতের প্রথম তারারা উঁকি দিতে শুরু করেছে, যেন তাকে বলছে প্রস্তুতি নিতে তার কত দীর্ঘসময় অতিবাহিত হয়েছে।
‘এসো কিছু খেয়ে নেবে। খাজাসারা ঝর্ণার কাছে একটা রূপার তৈরি কাঠামোর উপরে রাখা একটা পাত্রে রক্ষিত খুবানি, পেস্তা আর অন্যান্য শুকনো ফলের দিকে ইঙ্গিত করে কিন্তু মেহেরুন্নিসার পেটে শক্ত গিট অনুভূত হয় এবং সে মাথা নেড়ে মানা করার সময় মাথায় পরানো অলঙ্কারের ভার অনুভব করে। যেমন তোমার অভিরুচি। খাজাসারা আবার হাততালি দিতে তিন মহিলা পরিচারিকা হলুদ রঙের ব্রোকেডের কাজ করা ঢোলা একটা আলখাল্লা, স্যাটিনের সোনালী রঙের পাদুকা এবং গলায় পরার জন্য হলুদ বিড়ালাক্ষের মত দেখতে পাথরের ছড়া তার গলায় আর কোমড়ে পরাবার জন্য নিয়ে আসে। অনুগ্রহ করে একটু ঘুরে দাঁড়ান যাতে করে আমি অন্তত সন্তুষ্ট হতে পারি যে সবকিছু ঠিক ঠিক করা হয়েছে, পরিচারিকার দল তাদের কাজ শেষ করার পরে মালা কথাটা বলে। মেহেরুন্নিসা অনুগত ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে পাক খেয়ে ঘুরতে শুরু করে। মালা তাকে আসন্ন রাতে তাঁর জন্য কি অপেক্ষা করছে খুলে বলার পর থেকেই তাঁর কেবলই মনে হচ্ছে যে কেউ একজন যেন তার নিয়তির ভার তার হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে আর এই বোধটা আশঙ্কাজনকভাবে কেবল প্রবলতর হচ্ছে। সে অচিরেই আরো একবার জাহাঙ্গীরের সামনে নিজেকে দেখতে পাবে। শেষবার তার কি বলা আর করা উচিত সে সম্বন্ধে তার ঠিক ঠিক ধারণা ছিল। এইবার তাঁর কোনো ধারণাই নেই…
যথেষ্ট হয়েছে। মালা বলে। চলুন এবার যাওয়া যাক। সময় হয়ে এসেছে।’
‘খাজাসারা… আমাকে পথ দেখান, একটু পরামর্শ দিন।’ সে যদিও তাকে অনুরোধ করে মেহেরুন্নিসা এর জন্য নিজেকে তিরস্কার করে, কিন্তু সে কোনোভাবেই নিজেকে বিরত রাখতে পারে না।
মালা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কেমন চাপা একটা হাসি হাসে। তোমার দায়িত্ব সম্রাটকে প্রীত করা। এটুকুই কেবল তোমার জানা থাকা জানা দরকার।
*
মেহেরুন্নিসাকে খোঁজাদের একজন মূল আঙিনায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং উপরে সম্রাটের কক্ষের দিকে উঠে যাওয়া সিঁড়ি বেয়ে সে উঠে আসে। মালা সতর্কতার সাথে তাঁর মাথায় সোনালী চুমকি বসানো যে নেকাবটা পরিয়ে দিয়েছে সেটার ঝকমকে পর্দার ভিতর দিয়ে তাকাতে সবকিছু কেমন নির্বাক আর তুচ্ছ মনে হয়–রাজপুত প্রহরীর দল দরজার রুপালি পাল্লাগুলো হট করে খুলে দিয়ে তাকে আর তাঁর সঙ্গী খোঁজাকে অতিক্রম করতে দেয়, জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত কামরার অতিকায় দরজার সোনালী পাল্লাগুলো মনে হয় যেন শীতল শক্ত ধাতুর চেয়ে নরম কাপড়রে মত যেন চকচক করছে।
