নাদিয়াকে অনুসরণ করে বাইরের আলোকউজ্জ্বল প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়াতে–উত্তল মার্বেলের উপর সূর্যঘড়ির ছায়া বলছে এখনও দুপুর হয়নি–মেহেরুন্নিসা দেখে মালা তার জন্য অপেক্ষা করছে। খাজাসারার দীর্ঘদেহী অবয়বের পিছনে গাঢ় সবুজ বর্ণের আলখাল্লা পরিহিত ছয়জন পরিচারিকা মালার দিকে তাকিয়ে থেকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁদের ভিতরে তিনজন খোঁজা আর তিনজন মহিলা।
‘আপনি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, মেহেরুন্নিসা খাজাসারার উদ্দেশ্যে বলে।
‘হ্যাঁ, মালকিন।
‘আপনি কি বলতে চান?
‘জনসমক্ষে কথাটা বলার অনুমতি আমায় দেয়া হয়নি। অনুগ্রহ করে আমায় অনুসরণ করুন।
খাজাসারা উচ্চপদস্থ কোনো রাজকীয় কর্মচারীর ন্যায় দন্ডটা হাতে নিয়ে সদর্পে এগিয়ে যায়, একদিক দিয়ে বিবেচনা করতে গেলে সে আসলেও তাই। পরিচারিকার দল তাকে অনুসরণ করে এবং মিছিলটার একেবারে শেষে থাকে মেহেরুন্নিসা। ছোট্ট মিছিলটা জাহাঙ্গীরের ব্যক্তিগত খাস কামরায় প্রবেশের বাঁকটা এড়িয়ে, যা মেহেরুন্নিসা এখন ভালো করেই চেনে, প্রধান প্রাঙ্গণের উপর দিয়ে হেরেমের প্রবেশ পথের দিকে এগিয়ে যায়। তাকে শেষ পর্যন্ত তাহলে বহিষ্কারই করা হচ্ছে…
কিন্তু তখনই মেহেরুন্নিসা তোরণগৃহের বামে একটা ক্ষুদ্র খিলানযুক্ত তোরণদ্বার লক্ষ্য করে। সেখানে পৌঁছে মালা ভেতরে প্রবেশ করে হারিয়ে যায়। পরিচারিকার দলকে অনুসরণ করে খিলানাকৃতি তোরণের নিচে দিয়ে এগিয়ে যেতে মেহেরুন্নিসা একটা সংকীর্ণ গলিপথের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করে যা বামদিকে বাঁক খেয়ে খাড়াভাবে নিচের দিকে নেমে গিয়েছে। সে এক মুহূর্তের জন্য আতঙ্কিত হয়ে চিন্তা করে তাকেও কি একই ভূগর্ভস্থ কারাপ্রকোষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিন্তু তারপরেই সে খেয়াল করে যে ভেতরের বাতাস ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। বেলেপাথরের দেয়াল বেয়ে জলকণা গড়িয়ে নামছে এবং কারাগারের সেঁতসেঁতে গন্ধের বদলে তাঁর নাকে–গোলাপজল, চন্দনকাঠ আর তিমিমাছ থেকে প্রাপ্ত গন্ধদ্রব্যের সুগন্ধ ভেসে আসে। সামনে আরেকটা তীক্ষ্ণ বাঁক দেখা যায় এবং মেহেরুন্নিসা সামনে আলো দেখতে পায়। আরও কয়েক কদম সামনে এগিয়ে যেতে সে নিজেকে একটা ক্ষুদ্র আয়তাকার আঙ্গিণায় আবিষ্কার করে যার চারদিকেই উঁচু দেয়াল। সে উপরের দিকে তাকিয়ে সে কেবল ছোট আয়তাকার আকাশের ধাতব নীল দেখতে পায়। প্রাঙ্গণের মাঝে একটা ঝর্ণা থেকে বুদ্বুদ নিঃসৃত হচ্ছে এবং ঠিক উল্টোদিকের দেয়ালের ফাঁকাস্থানের ভিতর দিয়ে সুগন্ধি স্রোত, আর্দ্রতার উৎস দেখা যায়– হাম্মামখানা।
‘অনুগ্রহ করে কাপড় খুলে রাখুন, খাজাসারা বলে।
মেহেরুন্নিসা বিস্মিত চোখে অপলক তাকিয়ে থাকে।
‘হেরেমের প্রচলিত নিয়মরীতির কারণে আমরা এই নিভৃতস্থানে পৌঁছাবার পূর্বে আপনাকে কিছু জানানো থেকে আমায় বিরত রেখেছিল, কিন্তু সম্রাট আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। আজ রাতে আপনি যদি তাকে প্রীত করতে, পারেন তাহলে আপনি তার সাথে একই শয্যায় শয়ন করবেন। কোনো তর্ক করা চলবে না। আমি যা বলছি আপনাকে তাই করতে হবে।
মেহেরুন্নিসা এতটাই বিস্মিত হয় যে পরিচারিকার দল তার দেহ থেকে পোষাকের আবরণ সরিয়ে নিয়ে তাকে নগ্ন করতে থাকলে সে বাধা না দিয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকে। তারা প্রথমেই তাঁর পালিশ করা গোলাপি স্ফটিকের টুকরো বসানো কলাই করা পরিকরের মুক্তাখচিত টাসেল খুলে দেয় তার পরনের গোলাপি রেশমের আলখাল্লা সরিয়ে দিয়ে তাঁর অন্তর্বাস খুলে নেয় এবং তার পা থেকে রেশমের তৈরি চটিও তাঁরা সরিয়ে নেয়। সে কিছু বোঝার আগেই সে দেখে পুরোপুরি নগ্ন অবস্থায় সে ছোট আঙিনায় নেমে আসা উজ্জ্বল সূর্যালোকে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর খাজাসারা কাবুলের দাসবাজারে তার দেখা দাস ব্যবসায়ীদের মত নিরাসক্ত চোখে তাকে খুটিয়ে দেখছে। নিজের ঘন কালো চুল ঝাঁকিয়ে সে চেষ্টা করে নিজের স্তনযুগল আড়াল করতে এবং ঘুরে দাঁড়ায়, সে এখনও মালা একটু আগে যা বলেছে সেটাই বুঝতে চেষ্টা করছে। জাহাঙ্গীর অবশেষে তাহলে তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন কিন্তু মনে হচ্ছে তিনি তাকে আর নিজের স্ত্রী করতে চান না। মামুলী একজন রক্ষিতার মত তাকে তার শয্যার জন্য উপযোগী করা হচ্ছে।
‘চলুন, খাজাসারা উন্মুক্তস্থানটার দিকে ইশারা করে তাকে হাম্মামে প্রবেশ করতে বলে। ভেতরে, গরম পাথরের উপরে প্রবাহিত সুগন্ধি পানির স্রোত থেকে উষ্ণতা নির্গত হচ্ছে যা মার্বেলের সংকীর্ণ ঢালু পথ দিয়ে নিচে নামছে। তার চোখ জ্বালা করে এবং সে টের পায় তাঁর ত্বক ঘামতে শুরু করেছে। সে বরাবরই হাম্মাম পছন্দ করে কিন্তু এখন দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হতে সে অনুভব করে তার দেহ উত্তেজনায় টানটান হয়ে আছে। প্রথমে, একটা মার্বেল পাথরের খণ্ডের উপর শুয়ে থাকার সময় পরিচারিকার দল গরম হিসহিস করতে থাকা উষ্ণ পাথরের উপরে আরো পানি ঢালে, সে টের পায় এবার আসলেই তাঁর দেহ কুলকুল করে ঘামতে শুরু করেছে, তার ত্বক পরিষ্কার করে এবং সেটাকে এখন রেশমের ন্যায় নরম আর তুলতুলে মনে হয়। এরপরে, পাশের একটা কক্ষে সে পানির ছোট্ট একটা চৌবাচ্চায় অবগাহন করে যার পানি এত ঠাণ্ডা যে দূর্গের বরফঘর থেকে চৌবাচ্চায় দেয়ার জন্য নিয়ে বরফের টুকরোগুলো এখনও পানিতে ভাসছে। তাকে এরপরে তৃতীয়, বড় একটা কক্ষে নিয়ে আসা হয়। কক্ষটায় কোনো প্রাকৃতিক আলো নেই কিন্তু চারপাশের দেয়ালের কুলুঙ্গিতে স্থাপিত অসংখ্য তেলের প্রদীপের আভায় দেখা যায় দেয়ালের আস্তরের উপরে আর উঁচু খিলানাকৃতি ছাদে জটিল ফুলের নক্সা করা রয়েছে। সেখানে তূর্কী এক মহিলা বিশাল পুরুষালি হাতে সুগন্ধি তেল দিয়ে তার সারা দেহ মালিশ করে দেয়ার সময় সে মুখ নিচু করে একটা মার্বেলের বেঞ্চে শুয়ে থাকে।
