সুফিবাবা চোখ এখন অর্ধনিমিলিত এবং তার থুতনি এই মুহূর্তে নিজের ভাঁজ করা হাতের উপরে রাখা কিন্তু এখনও তিনি কোনো কথা বলেন না। জাহাঙ্গীর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। সে সম্ভবত মেহেরুন্নিসাকে এমনিও ডেকে পাঠাতে পারতো কিন্তু সুফি সাধক আর বহুকাল আগে গত হওয়া তার বাবার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা তাকে সেটা করা থেকে বিরত রেখেছে।
সুফিবাবা অবশেষে মৌনতা ভঙ্গ করেন। আপনি যা বললেন তার কিছুটা অংশ বাস্তবিকই যুক্তিযুক্ত। আপনার অপরাধের চুড়ান্ত বিচারের ভার আল্লাহতালার হাতে কিন্তু এই মুহূর্তে আপনাদের দুই পরিবারের ভিতরে এখন আপনিই কেবল একমাত্র অপরাধী নন। আমার বিশ্বাস পাপে পাপ ক্ষয় হয়েছে। কিন্তু স্মরণ রাখবেন যে আপনার ভাগ্যে যাই লেখা থাকুক, আপনি নিজের আকাঙ্খকে চরিতার্থ করতে আপনি যে পদক্ষেপ নিয়েছেন সেটা একজন মানুষ আর বিশেষ করে একজন সম্রাট হিসাবে আপনার জন্য অগৌরবের।’
‘আমি জানি। জাহাঙ্গীর তার মাথা নত করে। সুফিবাবা ঠিকই বলেছেন। শের আফগানকে হত্যা করাটা তার একেবারেই ঠিক হয় নি। পুরো ব্যাপারটা ঈর্ষাতুর এক প্রেমিকের মত কাজ হয়েছে কোনোভাবেই সেটা একজন অমিত-ক্ষমতাধর সম্রাটের উপযুক্ত নয়। কিন্তু সুফিবাবার কথাগুলো এসব ভাবনা ছাপিয়ে তাকে আনন্দে আপ্লুত করে তুলে। মেহেরুন্নিসা অবশেষে তার হতে চলেছে। সুফিবাবা আমায় বলেন ভবিষ্যতের গর্ভে কি অপেক্ষা করছে? এই রমণী কি আমি যাকে খুঁজছি আমার সেই আত্মার আত্মীয় হবে?
‘সম্রাট আমার পক্ষে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। আমি আপনাকে আগেই বলেছি আমার আব্বাজানের মত আত্মার অধিকারী আমি নই। তাঁর মত ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু আপনি যেমন বলেছেন সত্যিই যদি আপনি তাকে সেরকমই ভালোবাসেন–এবং তার মাঝেও আপনার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারেন তাহলে সবকিছুই সম্ভব।
বাঁচালেন। আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না আপনার কথায় আমি কতটা স্বস্তি পেয়েছি। আমি কীভাবে আপনাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি?
‘আমি যা কিছু বলেছি সবই আল্লাহতালার প্রতি আমার বিশ্বাস আর তাঁর অভিপ্রায় মাথায় রেখে বলেছি কোনো পুরষ্কারের আশায় নয়, কিন্তু ফতেপুর শিক্রি থেকে চলে যাবার আগে আমার আব্বাজানের কবরটা জিয়ারত করলে আমি খুশি হব। আপনার সমস্ত অত্যাচার আর পাপের জন্য, কেবল শের আফগানের হত্যাকাণ্ডের জন্যই না, আবারও আল্লাহতা’লার কাছে করুণা ভিক্ষা করবেন। আব্বাজান হয়ত তাহলে বেহেশত থেকে আপনাকে আশীর্বাদ করবেন এবং আপনার আগামী জীবনটা আরও সুগম করে দেবেন।
*
‘নাহ্, এটাও পুরোপুরি ঠিক হয় নি। শোন…’ সাল্লা পংক্তিটা জোরে জোরে আবৃত্তি করে, আবৃত্তি করার সময় সে তার মাতৃভাষা আর্মেনীয় থেকে পার্সীতে অনুবাদ করতে থাকে। মেহেরুন্নিসা মাথা নাড়ে। ভাষাটা রপ্ত করতে তাঁর আরও সময় লাগবে কিন্তু এই বিনোদনটা তার ভালোই লাগে। এখানে প্রতিটা দিন আগের দিনের মতই এবং নিঃসন্দেহে আগামী দিনও। সে যদিও পুনরায় ফাতিমা বেগমের সাথেই বসবাস করছে, তাকে একঘরে করে রাখা হয়েছে। পুরোটা সময় কেবলই খসরুর সাথে ষড়যন্ত্রকারী সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারের তাজা খবর সে শুনছে। তাঁর ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ডই হেরেমের অধিবাসীদের তাঁর প্রতি সতর্ক করার জন্য যথেষ্ট। সাল্লার যদিও, তাঁর বিদ্বান বাবা রাজকীয় পাঠাগারের আধিকারিক, এসব নিয়ে কোনোপ্রকার হেলদোল আছে বলে মনে হয় না। ফাতিমা বেগমের পরিচারিকা হিসাবে তাকে সম্প্রতি নিয়োগ করা হয়েছে এবং মেহেরুন্নিসা তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে একরকম বর্তে গিয়েছে। সাল্লা আর্মেনিয়াসের পাশাপাশি মেহেরুন্নিসাকে খানিকটা ইংরেজিও শিখাবে বলেছে, যা তার আব্বাজান, যখন তরুণ বয়সে জনৈক ইংরেজ ব্যবসায়ীর অধীনে মুনশী বা সেক্রেটারি হিসাবে কর্মরত থাকার সময়ে রপ্ত করেছিলেন, তাকে শিখিয়েছে।
মেহেরুন্নিসা যে পংক্তিগুলো ভাষান্তর করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল সেই পংক্তিগুলো সে পুনরাবৃত্তি করার সময়ে সাল্লার আন্তরিক মুখের চারপাশে তাঁর ঘন কালো লম্বা চুলের গোছা বৃত্তাকারে ঝুলতে থাকে তাঁর চুল এতই ঘন যে চুল আচড়াবার সময়ে তাকে চিরুনির সাথে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়: ‘রাত যখন গম্ভীর হয়ে আলকাতরার ন্যায় কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে তখন ভয় পাবে না। জানবে সেটা কেবলই ভেসে যাওয়া কোনো মেঘের কারসাজি যা চাঁদ আর তারাদের আলো শুষে নিয়েছে। আবারও তাদের আলোর দীপ্তি ফিরে আসবে, পূর্বের মতই সৌন্দর্যমণ্ডিত যা একদা হারিয়ে গিয়েছিল।’
শব্দগুলো মেহেরুন্নিসাকে স্পর্শ করে। এটা কার কবিতা?
‘আমাদের অন্যতম মহান কবি-ইয়েরেভানের হ্যাগোপান।
কতদিন আগের…’ মেহেরুন্নিসা কথা শেষ করতে পারে না কারণ নাদিয়া ঝড়ের বেগে তার কক্ষে এসে প্রবেশ করেছে।
‘মালকিন, আপনাকে এখনই আমার সাথে যেতে হবে। খাজাসারা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।
আবার কি ঘটলো? মেহেরুন্নিসা চিন্তিত মুখে উঠে দাঁড়ায়। জাহাঙ্গীরের সাথে তার সাক্ষাৎকারের পর থেকেই সে আশঙ্কা করছে যেকোনো মুহূর্তে তাকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফেরত পাঠানো হবে। বাবা মা আর ভাই আসাফ খানের কাছে যে চিঠিগুলো সে লিখেছিল সেগুলোয় আশঙ্কার কথা ছিল। সে নিশ্চিত যে হেরেম থেকে বাইরের সাথে যেকোনো ধরনের সংবাদ বিনিময়–বিশেষ করে ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত পরিবারের সাথে সতর্কতার সাথে খুটিয়ে দেখা হবে।
