সে ইয়ার মোহাম্মদকে, বাদখশান থেকে আগত বৃদ্ধ কিন্তু কঠোর শাসক, বিশ্বাস করতে পারে যাকে সে সম্প্রতি গোয়ালিয়রের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছে, তার আদেশ যেন যথাযথভাবে পালিত হয় সেটা নিশ্চিত করতে। পূর্ববর্তী শাসনকর্তার বিষয়ে, সে নিশ্চিতভাবেই অনেক বিষয়ে শিথিলতা প্রদর্শন করেছিল আর খসরুকে অনেকবেশি সুযোগ সুবিধা দিয়েছিল। যুবরাজকে ষড়যন্ত্রের সুযোগ দেয়ার জন্য সেই সবচেয়ে বেশি দায়ী আর সে কারণেই জাহাঙ্গীরের কোপানলে পরার ভয়ে সে নিজের অবহেলার জন্য খেসারত দিতে মরীয়া হয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করেছে, এমনকি নিজেকে বাঁচাতে সে নিরীহ গিয়াস বেগকেও পর্যন্ত ফাঁসিয়ে দিয়েছে। জাহাঙ্গীর তাকে বরখাস্ত করতে, তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে এবং তাকে নির্বাসিত করতে দ্বিতীয়বার চিন্তা করে নি।
তার ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবার হঠকারী ভাবনা বহুদিন আর কারো মনে উদয় হবে না। আর বিপর্যয় এখন যখন সমাপ্তির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে তখন সে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কিছু বিষয়ে মনোযোগ দেবার মত সময় সে অবশেষে লাভ করেছে। গতরাতে, মেহেরুন্নিসার ভাবনা যখন তাকে পুনরায় আবার রাতের বেলা জাগিয়ে রাখতে আরম্ভ করেছে, তখন সে না ভেবে থাকতে পারে নি যে খসরুর এই অনাকাঙ্খিত বিদ্রোহের কারণে মেহেরুন্নিসার পরিবার আর তার নিজের মধ্যকার পরিস্থিতি কি আদতে খুব সূক্ষভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এই প্রশ্নের উত্তর কেবল পাক কেবলা সুফি বাবাই দিতে পারবেন। আর এই কারণেই তাঁর প্রাত্যহিত দরবারিক কর্মকাণ্ড সমাধা হতেই সে তার সাথে দেখা করার জন্য যাত্রা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাহাঙ্গীর তার সামনে দ্রুত ঘনিয়ে আসা সন্ধ্যালোকে, সে দেখতে পায় ইতিমধ্যেই রাতের খাবারের জন্য আগুন জ্বালান হয়েছে। ফতেপুর শিক্রি এখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। সে তার কচি আর দেহরক্ষীদের চমকে দিয়ে সহসাই নিজের ঘোড়ার খুরে ঝড়ের বোল তুলে। তারা সবাই নিজের ঘোড়ার গতিবেগ বৃদ্ধি করে তার কাছাকাছি থাকবার প্রয়াসে তাঁদের ব্যস্ত হয়ে উঠার আওয়াজ সে পেছনে থেকে ভেসে আসতে শুনে।
পনের মিনিট পরে, তাকে বেশিরভাগই এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ফতেপুর শিক্রির বেলেপাথরের শহরের মূল প্রতিরক্ষা প্রাচীরের বাইরে নিচু একটা মাটির বাড়ির সামনে ঘোড়া থেকে নামতে দেখা যায়। সে ছেলেবেলায় বর্তমান সুফি সাধকের বাবার সাথে প্রথমবার যখন দেখা করতে এসেছিল তখনকার চেয়ে বাড়িটাকে এখন যেন অনেকবেশি ছোট আর হতদরিদ্র মনে হয়, কিন্তু এটাও সত্যি যে স্মৃতির সাথে সময় প্রায়শই বিবিধ ছলনা করে থাকে। তোমরা সবাই এখানেই অপেক্ষা করো।’ দরজার ডানপাশে অবস্থিত একটা ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে সে একটা তেলের প্রদীপের খুবানি আভা দেখতে পায়। সে হাত থেকে ঘোড়া চালনার দস্তানা জোড়া খুলে ফেলে কাঠের দবেজ দরজায় টোকা দেয় এবং তারপরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে দরজার পাল্লা খুলে। কক্ষের ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে আবারও দরজায় টোকা দেয় এবং এবার মাথা নত করে নিচু সরদলের নিচে দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
কক্ষটার মেঝে দুরমুজ করা মাটির তৈরি তার উপরে কেবল কয়েকটা জীর্ণ মাদুর বিছানো রয়েছে এবং তাঁর যতদূর মনে পড়ে এক কোণে একটা দড়ির চারপায়া থাকবার কথা কিন্তু সুফি বাবার কোনো চিহ্ন সেখানে নেই। জাহাঙ্গীরের মনটা এক মুহূর্তের জন্য হতাশায় ছেয়ে যায় কিন্তু পরক্ষণেই সে বাইরে থেকে কণ্ঠস্বরের আওয়াজ ভেসে আসতে শুনে এবং মুহূর্ত পরেই সুফিবাবা ভেতরে প্রবেশ করেন, তিনিও নিজের সাদা পাগড়ি পরিহিত মাথা সরদলের সাথে গুতো খাওয়া থেকে বাঁচাতে নিচু করে রেখেছেন।
‘সম্রাট, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকতে পারি নি। আমি আগুন জ্বালাবার কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম।’
‘আপনাকে আগে থেকে না জানিয়ে আসবার কারণে আমিই আসলে ভুল করেছি।’
‘সম্রাট, অনুগ্রহ করে…’ সুফিবাবা একটা মাদুরের দিকে ইঙ্গিত করে এবং জাহাঙ্গীর যখন তাঁর মুখোমুখি আসন পিড়ি হয়ে থিতু হয়ে বসে। এত ব্যগ্রভাবে আমার কাছে ছুটে আসবার কারণটা কি এবার জানতে পারি?
‘আপনার দিক নির্দেশনা আমার আবার প্রয়োজন।
‘সেই একই বিষয়ে?
জাহাঙ্গীরের মনে হয় সে বুঝি সুফিবাবার চোয়াল সামান্য চেপে বসতে দেখেছে। হ্যাঁ। পরিস্থিতি এখন বদলে গিয়েছে।
কীভাবে সেটা হয়েছে?
‘আপনি আমায় বলেছিলেন যে আমি কেবল আল্লাহতালার চোখের গুনাহগার নই সেইসাথে আমি আমার ভালোবাসার রমণীর এবং যাকে আমি আমার স্ত্রীর মর্যাদা দিতে চাই–আমার কোষাধ্যক্ষ গিয়াস বেগের কন্যা মেহেরুন্নিসার–পরিবারের প্রতিও অন্যায় করেছি, তাঁরা তাঁর জন্য যাকে স্বামী হিসাবে নির্বাচিত করেছিল তাকে হত্যা করে। আমার এই অন্যায়ের কারণে আপনি আমাকে হুশিয়ার করেছিলেন আমি যা চাই সেটা পাবার জন্য কোনো ধরনের ব্যগ্রতা প্রদর্শন করে আল্লাহ্তা’লার রোষানলে পড়ার ঝুঁকি না নিয়ে বরং ধৈর্য ধারণ করতে আর অপেক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। সুফিসাধক কোনো কথা না বলে কেবল মাথা নাড়ে এবং জাহাঙ্গীর পুনরায় বলতে শুরু করে, আমার সন্তান খসরু আবারও আমায় সিংহাসনচ্যুত করে আমাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। গিয়াস বেগের ছোট ছেলে প্রধান ষড়যন্ত্রকারীদের অন্যতম–মেহেরুন্নিসার আপন ভাই। সে অপরাধ স্বীকার করে এবং আমি তাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করি। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন হলো আমার প্রতি তার অপরাধ কি তাঁর পরিবারের প্রতি আমার অন্যায়কে কি নাকচ করবে না?
