মেহেরুন্নিসা মোমের আলোয় বাঁকা ফলাটা ঝলসাতে দেখে যখন জল্লাদ কুঠারটা এক মোচড়ে নিজের মাথার উপর তুলে ধরে। হন্তারক ফলাটা নামিয়ে আনতে সে টের পায় তার গালের পাশ দিয়ে বাতাসের একটা ঝাপটা বয়ে যায়, তারপরে ফলাটা তার ভাইয়ের গলা নিখুঁতভাবে দ্বিখণ্ডিত করতে হাম আর মাংসের সাথে ইস্পাতের সংঘর্ষের ভোঁতা আওয়াজ সে শুনতে পায় এবং আরো একটা মৃদু ভোঁতা শব্দের সাথে তাঁর ছিন্ন মস্তক মাটিতে আঘাত করতে উজ্জ্বল রক্ত ছিটকে উঠতে দেখে। মেহেরুন্নিসা কিছুক্ষণ নিথর দাঁড়িয়ে থাকে। তারপরে স্বস্তিকর একটা অনুভূতি–জল্লাদ লোকটা নিজের কাজ ভালোই জানে। তাঁর ভাই কষ্ট পায় নি। সে তাকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর হাত থেকে নিকৃতি দিয়েছে। সে তাকিয়ে দেখে জল্লাদ দ্রুত মীর খানের ছিন্ন মস্তক আর দেহটা চামড়া দিয়ে ঢেকে দেয় এবং একজন প্রহরীর সাহায্যে সেগুলো কক্ষ থেকে সরিয়ে নেয়। আয়তাকার পাথরের খণ্ডের উপরের পড়ে থাকা কয়েক ফোঁটা রক্তই কেবল সাক্ষী দেয় যে কিছুক্ষণ আগে এখানে একজনের জীবনাবসান হয়েছে।
‘সবকিছু মিটে গিয়েছে, মেহেরুন্নিসা শুনতে পায় জাহাঙ্গীর বলছেন। ‘আপনি এবার হেরেমে ফিরে যেতে পারেন।’
মেহেরুন্নিসার অনুভব করার আর চিন্তা করার সব শক্তি যেন বিলীন হয়েছে। সে অন্ধের মত আদেশ পালন করে, কক্ষের দূরবর্তী প্রান্তের অতিকায় সোনালী দরজার দিকে টলতে টলতে এগিয়ে যায় যা ইতিমধ্যে তার জন্য খুলতে শুরু করেছে।
হেরেমে নিজের কক্ষে ফিরে এসে যা সে ভেবেছিল আর কখনও দেখতে পাবে না মেহেরুন্নিসার কিছুটা সময় লাগে অবশেষে কান্নায় ভেঙে পড়তে। নিজের ভাইয়ের মৃত্যুদণ্ড প্রত্যক্ষ করা খুবই কঠিন। নিজেকে সুস্থির রাখার জন্য সে তার হাতের নখ দিয়ে যেখানে আঁকড়ে ধরেছিল সেখান থেকে এখন রক্তপাত শুরু হয়েছে। কিন্তু মীর খান নিজেই নিজেকে এই বিপর্যয়ে আপতিত করেছে। সে দোষী আর ন্যায়বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তাকে বাঁচাবার জন্য তার কিছুই করার ছিল না এবং সেই চেষ্টা করতে গেলে সে সম্ভবত নিজেকে আর সেই সাথে তাঁদের পুরো পরিবারকে বিপদগ্রস্থ করে তুলতো। তাঁর আব্বাজান যেমন শিশুকালে তাকে মরুভূমিতে পরিত্যাগ করেছিলেন তাঁদের বাকি পরিবারকে বাঁচবার একটা সুযোগ দিতে, তাকে ঠিক সেভাবেই মীর খানকেও উৎসর্গ করতে হয়েছে। তাঁর বিচক্ষণতার মানে এই নয় যে সে ভাইকে ভালোবাসে না, যতই দুর্বল আর বোকা সে হোক। কিন্তু এখন কি করণীয়? জাহাঙ্গীরের সাথে সাক্ষাতের বিষয়ে সে এতদিন ধরে যে স্বপ্ন দেখছিলো তা অবশেষে পূরণ হয়েছে কিন্তু সে যেমন কল্পনা করেছিল তার থেকে একেবারে ভিন্ন একটা প্রেক্ষাপটে। ভবিষ্যতের গর্ভে তার জন্য… বা তাঁর পরিবারের জন্য… কি অপেক্ষা করছে?
১.০৭ পাপস্খলন
ফতেপুর শিক্রি যাবার পথে শুকনো মাটির উপরে ঘোড়ার খুরের ছন্দোবদ্ধ শব্দ তাঁর কানে সন্তুষ্টির পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, জাহাঙ্গীর ভাবে। শব্দটা তাকে বলছে যে মাসাধিক কাল অপেক্ষার পরে সে অবশেষে অভীষ্ট সাধনে কাজ করছে। মেহেরুন্নিসাকে দেখার পর থেকেই তাকে নিজের ভাবনা থেকে সে কদাচিত দূরে রাখতে পেরেছে। সে যে সাহসের সাথে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বাবার পক্ষে সাফাই দিয়েছে সেটা বহুবছর পূর্বে সে যা আঁচ করেছিল সেটাকেই অভ্রান্ত প্রমাণিত করেছে–যে সে রূপবতী হবার সাথে সাথে একজন অসাধারণ মহিলা। অন্য যে কেউ হলে শোকে কাঁদতে বিলাপ করতো কিন্তু তিনি নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। তাঁদের মধ্যকার আলাপচারিতা শেষে একটা বিষয়ে তাঁর মনে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে তার পুরো পরিবারে মীর খানই একমাত্র বিশ্বাসঘাতক। সে সেই সাথে এটাও জানে যে বহু বছর আগে সে তার মাঝে যে অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল সেটা আজও একই রকম রয়েছে। সে এখন তাকে আগের চেয়ে আরও বেশি করে কামনা করে।
অবশ্য, গোয়ালিওরে খসরুর কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে অঙ্কুরিত তাঁর বিশ্বাসঘাতকতার শেষ প্রচেষ্টা সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করাই ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। যতই দিন অতিবাহিত হয়েছে সে ততই মীর খানের মত আরো মাথা গরম তরুণদের কথা জানতে পেরেছে যারা খসরুর প্রতি নিজেদের আনুগত্য ঘোষণা করেছিল তার প্রতিশ্রুতির বহরের কারণে মোহিত হয়ে যা করার কোনো এক্তিয়ারই তার উচ্চাকাঙ্খী ছেলের ছিল না। সে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, খসরুর সহযোগীরা উড়াল দেয়ার আগেই তাদের গ্রেফতারের বিষয়টা নিশ্চিত করে, তাদের জেরা করে আরো ষড়যন্ত্রকারীদের নাম তাঁদের কাছ থেকে আদায় করে এবং তারপরে তাঁদের প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করে।
খসরুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়াটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। সে অতীতে অনেক বেশি করুণা প্রদর্শন করেছে কিন্তু তার ফলাফল কি হয়েছে? খসরু তাঁর উদারতার বদলে কেবলই ছলনার আশ্রয় নিয়েছে। না, সে তার কাছ অনুতাপ কিংবা কৃতজ্ঞতা কিছুই আশা করতে পারে না। খসরুকে সে যে শাস্তিই দিক না কেন সেটা যেন এতটাই কঠোর হয় যে ভবিষ্যতে তাঁর বিদ্রোহের ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। কিন্তু তারপরেও তাঁর তাড়াহুড়ো করার কোনো দরকার নেই… সে বর্তমানে খসরুকে কেবল গোয়ালিওরের ভূগর্ভস্থ একটা কারা কুঠরিতে অন্তরীণ করে রাখতে আদেশ দিয়েছে এবং নির্দেশ দিয়েছে তাকে যেন সম্পূর্ণভাবে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাখা হয়।
