পুরুষ কণ্ঠস্বর আর আগুয়ান পায়ের শব্দ এক ঝটকায় তাকে তার ভাবনা থেকে বের করে আনে। কর্চি সেই একটা দরজা দিয়ে কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করেছে এবং তারপরে দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে সে চিৎকার করে বলে, “মীর খানকে ভিতরে নিয়ে এসো।
দু’জন প্রহরী নিজেদের মাঝে তৃতীয় আরেকজনকে টেনে ভিতরে নিয়ে আসে। মোমবাতির দপদপ করতে থাকা আলোয় তারা যখন বেদীর দিকে এগিয়ে যায় মেহেরুন্নিসা তখন নিজের উপর রীতিমত বলপ্রয়োগ করে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া থেকে বিরত থাকতে। সে যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রহরীরা তার পাশে এসে দাঁড়ায় এবং তাদের মাঝের লোকটা ঠেলে সামনের দিকে মাটিতে ফেলে দেয়। মীর খান কোনো বাধা না দিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। বস্তুতপক্ষে, তাকে দেখে মনে হয় না যে তার জ্ঞান আছে। সে যখন সামনের দিকে টলমল করে আছড়ে পড়ে সেই অবসরে মেহেরুন্নিসা তাঁর কালচে, রক্তাক্ত মুখ দেখতে পায়। তার পরনের কাপড় ছেঁড়া, তাঁর পিঠে আগুনের ছ্যাকার লাল ক্ষত, সম্ভবত তপ্ত লোহার সাহায্যে সৃষ্ট। সে নিজেকে প্রবোধ দেয় মীর খানকে নিজের ভুলের মাশুল অবশ্যই দিতে হবে–যে তাকে অবশ্যই উৎসর্গ করতে হবে যাতে বাকি সবাই তারা রক্ষা পায়–কিন্তু তার পাশে মেঝেতে নিজের অত্যাচারিত ছোট ভাইকে পড়ে থাকতে দেখাটা সহ্য করাও তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে উঠে। জাহাঙ্গীর মীর খান নয় বরং তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে বুঝতে পেরে, সে প্রাণপণে আত্মসংবরণের চেষ্টা করে। সম্রাট কিছুক্ষণ পরে বন্দির দিকে তাকায়।
‘মীর খান, নিজের সাফাই দিতে তোমার কি বলার আছে?
মীর খানের পুরো দেহ থরথর করে কাঁপছে। প্রহরীদের একজন তাঁর মাথার লম্বা কালো চুলের ঝুটি ধরে এবং তার মাথাটা তুলে ধরে। মহামান্য সম্রাটের প্রশ্নের জবাব দাও।’
মীর খান বিড়বিড় করে দুর্বোধ্য কিছু একটা বলে এবং প্রহরী নিজের জুতো পরা পা তুলে এবার তার পেটে সজোরে একটা লাথি বসিয়ে দেয়। সে এইবার কয়েকটা শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করতে সক্ষম হয়। সম্রাট, আমাকে ক্ষমা করুন।
‘বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ক্ষমা করার প্রশ্নই উঠে না। একজন বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যুই তোমার প্রাপ্য। তোমায় প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করার পরামর্শ এমনকি তোমার নিজের বোনও দিয়েছে।’ মীর খান হতাশ চোখে তার দিকে তাকালে মেহেরুন্নিসা কুঁকড়ে যায়। আমার উচিত ছিল তোমাকে হাতির পায়ের নিচে পিষে ফেলা কিংবা শূলে দেয়া যেমনটা আমি আমার সন্তানের পূর্ববর্তী বিদ্রোহের সমর্থকদের করেছিলাম যাঁদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেয়ার মত বুদ্ধিও তোমার নেই।’ জাহাঙ্গীরের কণ্ঠস্বর হিম শীতল শোনায়। মীর খানের পাশে বসে তাকে আগলে ধরে একটু আগে যা বলেছিল সেসব ভুলে গিয়ে ভাইয়ের জীবনের জন্য করুণা ভিক্ষা করা থেকে মেহেরুন্নিসা অনেক কষ্টে নিজেকে বিরত রাখে। জাহাঙ্গীর অবশ্য এসবে ভ্রূক্ষেপ না করে বলতে থাকে, কেবল তোমার বোনের খাতিরে যার মত সাহসী তুমি কখনও হতে পারবে না আমি তোমাকে এই জীবন থেকে তোমার প্রাপ্য ধীর আর যন্ত্রণাদায়ক নিস্কৃতির হাত থেকে রেহাই দিলাম। মৃত্যুর পূর্বে তোমার কি কিছু বলবার আছে?
মীর খান অনেক কষ্ট করে হাঁটুর উপর ভর দিয়ে বসে কিন্তু সে যখন কথা বলে সেগুলো না তার বোন না সম্রাটকে উদ্দেশ্য করে বলা। কথাগুলোর মাঝে কোনো প্রকার ক্ষোভ কিংবা ক্রোধ না থাকায় সে হাফ ছেড়ে বাঁচে। ‘মেহেরুন্নিসা… আমাকে ক্ষমা করে দিও…’
‘ভাইজান, আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। তার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকায় কথাগুলো ধীরে নিঃসৃত হয়।
‘আর আমাদের আব্বাজান আর আসাফ খানকেও বলে দিও আমায় যেন মার্জনা করে। ষড়যন্ত্রের বিন্দুবিসর্গ সম্বন্ধে তারা জানতো না… এবং আমাদের আম্মাজানকে জানিয়ে তাকে আমি ভালোবাসি আর আমার জন্য যেন কষ্ট না পায়। মীর খান এখন ফুঁপিয়ে কাঁদছে, অশ্রুধারায় তার মুখের শুকনো রক্ত গলতে শুরু করে।
‘জল্লাদকে ডেকে পাঠাও, জাহাঙ্গীর আদেশ দেয়। লোকটা নিশ্চয়ই এতক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করেছিল কারণ সাথে সাথে কালো পাগড়ি ধাতব-বোম শোভিত আটসাট জামা পরিহিত দীর্ঘদেহী একটা লোক দুই মাথাযুক্ত একটা কুঠার হাতে ভেতরে প্রবেশ করে এবং তার অন্য পেষল হাতে মনে হয় একটা পশুর চামড়া মুড়িয়ে ধরা রয়েছে।
‘সম্রাট?
‘এই লোকটার শিরোচ্ছেদ কর।
জাহাঙ্গীরের আদেশ শুনে মীর খান পুনরায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। জল্লাদ লোকটা এবার চামড়াটার ভাঁজ খুলে, তারপরে বেদীর সামনে থেকে গালিচাটা সরিয়ে দিয়ে সেখানে পাথরের মেঝের উপরে যত্ন নিয়ে চামড়াটা বিছিয়ে দেয়। সে প্রস্তুত হতে প্রহরীদের উদ্দেশ্যে মাথা নাড়ে। মীর খান তখনও ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো যখন প্রহরীরা তাকে পুনরায় ধরে এবং টেনে সামনের দিকে চামড়ার উপরে নিয়ে আসে। তোমার গর্দান বাড়িয়ে দাও, জল্লাদ আদেশের সুরে বলে। একজন প্রহরী তার ডান হাতটা দেহের কাছ থেকে টেনে ধরলে যা এখন ভীষণভাবে কাঁপছে অন্য প্রহরীও তাঁর বাম হাতটা একইভাবে টেনে ধরতে, মেহেরুন্নিসা লক্ষ্য করে তার ভাই দারুণ সাহসের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে ধীরে নিজের গলা বাড়িয়ে দেয়। জল্লাদ তাঁর ঘাড়ের উপর থেকে কালো চুলের গোছা সরিয়ে দেয় তারপরে, সন্তুষ্টচিত্তে পিছিয়ে এসে কুঠারটা হাতে তুলে নেয়। সে তারপরে যত্নের সাথে কুঠারটার ওজন নিজের হাতে ভারসাম্য অবস্থায় রেখে কাঁধের উপর দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জাহাঙ্গীরের দিকে তাকাতে সে বোঝা যায় কি যায় না এমনভাবে মাথা নাড়ে।
