‘আমার আব্বাজান কোনো অপরাধ করতে পারেন না, মেহেরুন্নিসা নিজের কণ্ঠস্বর শান্ত আর সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে কোনোমতে বলে। কে তাকে অভিযুক্ত করেছে?
‘গোয়ালিওর দূর্গের প্রধান আধিকারিক। তাঁর গুপ্তচরেরা আড়িপেতে আমার ছেলেকে আপনার ভাই মীর খানের সাথে আলোচনা করতে শুনেছে যে পারস্যের শাহের কাছে যদি কান্দাহার সমর্পণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় তাহলে কি সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্য করতে তিনি রাজি হবেন। আপনার ভাই উত্তর দেয় যে পারস্যের রাজদরবারে গিয়াস বেগের এখন প্রভাব রয়েছে… সে ইঙ্গিত দেয় সে তাকে ষড়যন্ত্রে অংশ নিতে হয়তো রাজি করাতে পারবে।’
মেহেরুন্নিসার মুখ ক্রোধে রক্তিম হয়ে উঠে। সে চোখের সামনে পুরো পরিস্থিতিটা স্পষ্ট দেখতে পায় একজন যুবরাজের বিশ্বাসভাজন হতে পারার গর্বে মীর খান এতটাই উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে যে সে যেকোনো কিছু করবে বা বলবে…মেহেরুন্নিসা থুতনি উঁচু করে। এমন একটা ধারণা ঘৃণার অযোগ্য। মীর খান কেবল নিজেকে একজন কেউকেটা হিসাবে জাহির করতে চেয়েছে। আমি ভূমিষ্ঠ হবার আগেই আমার আব্বাজান পারস্য ত্যাগ করেছেন। তিনি পারস্যের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের একজন আধিকারিক নিযুক্ত হবার পরে আর যোগ্যতার সাথেই তিনি নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে যদি ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত করা সম্ভবও হয়–যা তিনি কোনোভাবেই হবেন না–আর পুরো বাপারটা কোনো অর্থ বহন করে না যেখানে তার নাতনির সাথে যুবরাজ খুররমের বিয়ের হতে চলেছে সেখানে আপনার বিরুদ্ধে আপনার অন্য সন্তানকে সমর্থন করে তাঁর কি লাভ?
জাহাঙ্গীর তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মেহেরুন্নিসা ভাবে তার জন্য যদি এখনও কোনো অনুভূতি তার ভিতরে অবশিষ্ট থাকেও সেটা তিনি ভালোভাবেই গোপন রেখেছেন।
‘আপনার কথায় যুক্তি রয়েছে কিন্তু আপনি এতটা উত্তেজিত হয়ে তর্ক করার আগেই আমি ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে ষড়যন্ত্রের বিষয়ে গিয়াস বেগ কিছুই জানেন না, জাহাঙ্গীর অবশেষে কথা বলে। আমি তাকে বহুদিন ধরেই চিনি এবং বিশ্বাস করি তিনি একজন সৎ লোক।
মেহেরুন্নিসা ভাবে, আমার আব্বাজান নিরাপদ। তার চারপাশের সবকিছু এক নিমেষের জন্য মনে হয় যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠে এবং সে নিজের চোখের উপর হাত রাখে, নিজেকে শক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে।
কিন্তু আপনার ভাইয়ের ব্যাপারে এটা প্রযোজ্য নয়…’
‘আমার ভাইজান…’।
‘মীর খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সে প্রথমে যদিও সবকিছু অস্বীকার করেছিল, একটা সময় পরে… জেরার একটা পর্যায়ে… সে স্বীকার করে যে আমার বিশ্বাসঘাতক সন্তান যুবরাজ খসরু তাকে বিপুলভাবে পুরস্কৃত করার লোভ দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্রে তাকে অংশ গ্রহণ করতে বলে এবং সে রাজি হয়।
মেহেরুন্নিসা কথা বলে না।
‘আপনি এখানে ন্যায়বিচার চাইতে এসেছেন। এইমাত্র আপনি প্রমাণ করেছেন যে আপনি কতটা বিবেচনাবোধের অধিকারী। আমার স্থানে আপনি থাকলে কি করতেন?
সে কোনো কথা না বলে গাঢ় নীলের জমিনে ঘন লাল ফুলের নক্সা করা পুরু গালিচার দিকে তাকিয়ে থাকে যখন হাসতে হাসতে খুবানি গাছের পচা ডাল বেয়ে এগিয়ে গিয়ে তার জন্য কয়েকটা ফল পারতে এগিয়ে যাওয়া উৎফুল্ল, ভাবনাহীন মীর খানের বালক বয়সের স্মৃতি, তাকে প্রায় দৈহিক যন্ত্রণায় বিদ্ধ করে। সম্রাট। তার কণ্ঠস্বর শান্ত, সংযত, আতঙ্কের লেশমাত্র নেই সেখানে। আপনার সামনে পছন্দের কোনো সুযোগ নেই। মীর খান একজন বিশ্বাসঘাতক। তাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করুন। আপনার স্থানে আমি থাকলে তাই করতাম।
‘আপনি চিঠিটে আপনার পরিবারের প্রতি আপনার ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য পরামর্শ দেয়াটা কি একজন স্নেহময়ী বোনের উপযুক্ত কাজ?
‘পারস্যে একটা প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে: “একটা গাছে যদি বাছে ফল ফলে তাহলে বাগান বাঁচাতে হলে গাছটা কেটে ফেল।” মীর খান তাঁর সম্রাট হিসাবে আপনার প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সেই সাথে নিজের পরিবারের প্রতিও সে তার দায়িত্ব পালন করে নি। সে একটা কীট আক্রান্ত বৃক্ষ। তাঁর বাকি পরিবার হল প্রবাদে উল্লেখ করা উদ্যান।
‘বেশ কথা। আপনার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ হবে। জাহাঙ্গীর ঝুঁকে পড়ে তার পেছনে রাখা পিতলের একটা ঘন্টা তুলে নিয়ে সেটা বেশ জোরে বাজায়। ঘন্টার ধাতব শব্দ দুই কি তিনবার বোধহয় ধ্বনিত হয়েছে বেদীর ডানদিকে অবস্থিত একটা দরজা দিয়ে একজন কর্চি কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে।
‘আদেশ করুন, সম্রাট?
‘বিশ্বাসঘাতক মীর খানকে আমার সামনে হাজির করা হোক।’
মেহেরুন্নিসা কিংবা বেদীর উপরে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা জাহাঙ্গীর কেউ কোনো কথা বলে না অপেক্ষার সময়গুলো যখন অতিবাহিত হয়। নিজের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘতম বিপর্যয়ের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত করে। এখন বোধহয় সন্ধ্যা সাতটা বাজে–আরজুমান্দ বানুর আতঙ্কিত চিঠি নাদিয়া তাকে পৌঁছে দেয়ার পরে পনের ঘন্টা অতিবাহিত হয়েছে। সে মানসিকভাবে যদিও পরিশ্রান্ত কিন্তু তার এখন কোনোভাবেই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা চলবে না। সে এই পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে কেবল শক্ত থেকেই বের হয়ে আসতে পারবে এবং নিজেকে আর নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে পারবে।
