কিন্তু তখনই সে খেয়াল করে যে তাঁদের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত হেরেমের দরজার দিকে মালা তাকে নিয়ে যাচ্ছে না। সে বরং দ্রুত বামদিক দিকে বাঁক নেয় এবং নিচু ধাপ বিশিষ্ট একপ্রস্থ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় যা দূর্গের এমন একটা অংশের দিকে উঠে গিয়েছে মেহেরুন্নিসা আগে কখনও দেখেনি। তার বক্ষপিঞ্জরের সাথে তার হৃৎপিণ্ড ধাক্কা খায়। মালা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? খাজাসারা সিঁড়ির একেবারে উপরের ধাপে পৌঁছে থামে এবং কাঁধের উপর দিয়ে পিছনের দিকে ঘুরে তাকায়। ‘পা চালিয়ে এসো। মেহেরুন্নিসা তাঁর নীল আলখাল্লার ঝুল সামলে নিয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। সে উপরে উঠে এসে একটা প্রশস্ত চতুরে নিজেকে আবিষ্কার করে। ঠিক উল্টো দিকে দুই পাল্লা বিশিষ্ট উঁচু একটা দরজা যার গায়ে কমদামি পাথর বসান রূপার পাতা ঝলমল করছে। মালা দরজার বাইরে প্রহরারত চারজন রাজপুত প্রহরীকে দ্রুত কিছু একটা বলার সময় মেহেরুন্নিসার দিকে ইঙ্গিত করে।
প্রহরীরা দরজার পাল্লা খুলে দেয়। মালা দরজার নিচে দাঁড়িয়ে মেহেরুন্নিসার এগিয়ে আসবার জন্য অপেক্ষা করে, তারপরে তাঁর কব্জি আঁকড়ে ধরে তাকে নিয়ে দু’পাশে বুটিদার রেশমের পর্দা দেয়া একটা প্রশস্ত অলিন্দ দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। পুরুষ ময়ুরের মত দেখতে, যার ছড়ান পেখমে পান্না আর নীলা বসান, সোনার দাহকে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা ধূপ আর মশলার সুগন্ধে অলিন্দের বাতাস ভারি হয়ে আছে। তাদের সামনে আরো একজোড়া দরজা পেছনের দরজার চেয়ে আরও উঁচু আর চওড়া আর পাল্লার উপরে সোনার পাতের উপরে কচ্ছপের খোলা আর হাতির দাঁতের কারুকাজ করা। দরজার সামনে ইস্পাতের ফলাযুক্ত বর্শা হাতে দশজন রাজপুত প্রহরী ঋজু আর স্থির ভঙ্গিতে সামরিক কায়দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ‘আমরা কোথায় এসেছি?’ সে মালার কাছে ফিসফিস করে জানতে চায়।
রাজকীয় হেরেমে মহামান্য সম্রাটের এটা ব্যক্তিগত প্রবেশ পথ। এই দরজা দিয়ে তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষে যাওয়া যায়।
‘তুমি আমাকে সম্রাটের কাছে নিয়ে চলেছো?
‘হ্যাঁ। তোমার সাথে কি করা হবে সন্দেহ নেই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।
মেহেরুন্নিসা কিছুই শুনতে পায় না। সে সম্রাটের সামনে উপস্থিত হবার পূর্বে মূল্যবান সময়ের যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে সেই অবসরে জাহাঙ্গীরের কাছে চিঠিটা লেখার পর থেকেই তাকে বলার জন্য সে নিজের মনে যে কথাগুলো আউড়ে এসেছে সেগুলোই আরেকবার স্মরণ করে নেয়। বিশাল দরজাটার সোনালী পাল্লা দুটো এখন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। মালা একপাশে সরে দাঁড়ায় এবং তাকে একলাই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সে মাথা উঁচু করে দরজার নিচে দিয়ে এগিয়ে যায়।
বিশাল কক্ষের দূরবর্তী প্রান্তে সম্রাট একটা নিচু মঞ্চে উপবিষ্ট। মেহেরুন্নিসা আশা করেছিল কর্চি, পরিচারকদের, এমনকি প্রহরীও হয়তো দেখতে পাবে সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকের মেয়ে আর বোনের হাত থেকে সম্রাটকে সুরক্ষিত রাখতে, কিন্তু কক্ষে তারা দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই। বাতায়ন দিয়ে আগত আলোয় দীর্ঘায়িত হতে থাকা ছায়া আর মোমবাতির কাঁপতে থাকা আলোর কারসাজিতে তাঁর পক্ষে জাহাঙ্গীরের অভিব্যক্তি বোঝাটা কঠিন করে তুলে। সে তাঁর কাছ থেকে তখনও পনের ফিট দূরে থাকার সময়ে, মেহেরুন্নিসা যেমন ঠিক করে রেখেছিল সেভাবেই মুখ নিচের দিকে রেখে তাঁর সামনে ছুঁড়ে দেয়, তাঁর খোলা চুল তার চারপাশে উড়ছে। সেইসাথে সে তার পরিকল্পনা অনুসারে জাহাঙ্গীর কথা বলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে না।
‘সম্রাট আমার সাথে দেখা করার মহানুভবতা প্রদর্শনের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমি এখানে এসেছি আপনার সামনে আমার আব্বাজান গিয়াস বেগের পক্ষে সাফাই দিতে। আমি আমার জীবনের দিব্যি দিয়ে বলতে পারি যে আপনার, তাঁর শুভাকাঙ্খি, যিনি তাকে সবকিছু দিয়েছেন, ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছু তিনি কখনও করবেন না। আমার আব্বাজান কখনও নিজের পক্ষে সাফাই দিবেন না তাই আমাকেই সেটা করতে হলো। আমি কেবল ন্যায়বিচার কামনা করছি।’ মেহেরুন্নিসা স্থির হয়ে পুরু গালিচায় মুখটা আরো গুঁজে দিয়ে, দুই হাত দু’পাশে ছড়িয়ে, যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকে।
তাঁর সামনের ছায়াচ্ছন্ন বেদীতে উপবিষ্ট লোকটার কাছ থেকে কোনো শব্দ ভেসে আসে না। সে মাথা তুলে তাকাবার ইচ্ছাকে জোর করে দমন করে কিন্তু সে যখন কেবল ভাবতে শুরু করেছে যে তার দিকে না তাকিয়ে তার পক্ষে আর থাকা সম্ভব না ঠিক তখনই তার শক্তিশালী হাত নিজের বাহু নিচে সে অনুভব করে, তাকে পায়ের উপরে দাঁড় করাবার জন্য তুলছে। সে চোখ বন্ধ করে থাকে। তিনি যখন তাঁর এত কাছে অবস্থান করছেন তখন সে তার মুখে করুণার পরিবর্তে দোষারোপের অভিব্যক্তি দেখবে সেই ভয়ে চোখ খুলে তার মুখের দিকে তাকাতে পারে না। তাঁর কাঁধ থেকে হাত সরে যায় কিন্তু তারপরেই সে টের পায় তিনি তাঁর নেকাবের একটা পাশ সরিয়ে দিচ্ছেন। সে চোখ খুলে তাকায় এবং জীবনে দ্বিতীয়বারের মত তার চোখে চোখ রাখে। কাবুলে বহু বছর আগে দেখার পর থেকে তার মনে গেঁথে থাকা সেই মুখ সে সামনে দেখতে পায়। মুখাবয়বে বয়সের ছাপ পড়ায় আরও বেশি সুদর্শন দেখায় কিন্তু এই মুহূর্তে সেখানে কঠোর আর শীতল একটা অভিব্যক্তি ফুটে রয়েছে যার দিকে তাকিয়ে সে সহসাই অসুস্থবোধ করে এবং নিস্তেজ হয়ে যায়। জাহাঙ্গীর তার দিকে আগ্রহের সাথে তাকিয়ে কিন্তু তাঁর ভাবনার বিন্দুমাত্র চিহ্ন মুখে ফুটে উঠে না। সে কয়েক মুহূর্ত পরে ঘুরে দাঁড়ায় এবং নিজের বেদীতে উঠে সেখানে পুনরায় আসন গ্রহণ করে। আপনার আব্বাজান আর ভাইজান দু’জনকেই জেরা করা হয়েছে।’
