সে দিল্লিতে আসাফ খানকে সবকিছু জানিয়ে চিঠি লিখতে পারে। তিনি হয়তো ইতিমধ্যেই এখানকার পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত হয়েছেন এবং এই মুহূর্তে আগ্রার পথে ঘোড়া নিয়ে ধুলোর ঝড় তুলে ছুটে আসছেন। তাঁরা একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিবে তাঁদের পরিবারকে এই বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে তাঁদের কি করা উচিত। তাছাড়া এই ষড়যন্ত্রে তিনিও হয়তো জড়িয়ে পড়েছেন এবং এখন হয়তো বন্দি রয়েছেন। নাহ্, আসাফ খানের ভাগ্যে কি ঘটেছে সেটা জানার জন্য সে অপেক্ষা করবে না। তাকে এবং তাকে একলাই যা করার করতে হবে।
নিজের ছোট কক্ষে প্রায় ঘন্টাখানেক অস্থিরভাবে পায়চারি করার পরে, দিগন্তের কোণে ভোরের ধুসর আলোর রেখা উঁকি দিতে মেহেরুন্নিসা পা আড়াআড়িভাবে রেখে তার লেখার টেবিলের সামনে এসে বসে। সে সবুজ অনিক্স পাথরের দোয়াতদানিতে–তাঁর আব্বাজান দোয়াতদানিটা তাকে উপহার দিয়েছিল–নিজের কলমটা ডুবিয়ে নিয়ে আরজুমান্দের উদ্দেশ্যে দ্রুত কয়েকটা কথা সাজিয়ে লিখে। তোমার আব্বাজান ফিরে আসা পর্যন্ত আমার দাদিজানের কাছে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করো এবং আমার কাছ থেকে পুনরায় কোনো সংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত কিছু করবে না। আমার উপরে আস্থা রাখো। সে লেখাটা শেষ করেই ভিজা কালি শুষে নেয়ার জন্য বালির মিহিগুড়ো সেটার উপরে ছিটিয়ে দিয়ে, কাগজটা ভাজ করে এবং গালার লম্বা একটা টুকরো উত্তপ্ত করে সেটা ফোঁটায় ফোঁটায় ভজের উপরে ফেলে এবং নিজের মোহর দিয়ে সেটার উপরে ছাপ দেয়, পারস্যে বহু শতাব্দি যাবত তাঁদের পরিবারে ব্যবহৃত ঈগলের প্রতীক মোহরটায় খোদাই করা রয়েছে। সে মোহরটা কদাচিত ব্যবহার করে কিন্তু এখন ব্যবহার করলে কারণ তাঁদের পরিবারের গৌরবোজ্জল দীর্ঘ অতীতের কথা অহঙ্কারী ঈগলটা, সে যা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিন্তু আরজুমান্দের কাছে প্রকাশ করে নি সেটা করার জন্য পদক্ষেপ নিতে তাকে সাহস জোগায়।
সে পুনরায় দোয়াতদানি থেকে লেখনীটা তুলে নিয়ে জাহাঙ্গীরের উদ্দেশ্যে আরেকটা চিঠির মুসাবিদা শুরু করে। মহামান্য সম্রাট, আপনাকে এই চিঠি লেখার সাহস আমার কখনও হতো না যদি না আমার পরিবারের প্রতি আমার ভালোবাসা এবং তাঁদের সম্মান রক্ষার জন্য তাঁদের প্রতি আমার ভিতরে একটা কর্তব্যবোধ কাজ করতো। মহামান্য সম্রাট, অনুগ্রহ করে আমাকে একবার দেখা করার অনুমতি দেন। গিয়াস বেগের কন্যা, মেহেরুন্নিসা। সে চিঠিটার আবার ভাঁজ করে এবং গালা গরম করে আর কিছুক্ষণ পরে রক্ত-লাল গালার নরম ফোঁটায় গলে পরতে শুরু করে।
*
যন্ত্রণাদায়ক মন্থরতায় দিনটা অতিবাহিত হতে থাকে। চারপাশ অন্ধকার করে শীঘ্রই সন্ধ্যা নামবে। মেহেরুন্নিসা ভাবে, সবাই নিশ্চয়ই জানে কি হয়েছে। ফাতিমা বেগম আজ তাকে ডেকে পাঠান নি। বাস্তবিকপক্ষে কেউই তাঁর কাছেই আসে নি, এমনকি সদা-উৎসুক নাদিয়ারও আজ কোনো পাত্তা নেই। তাদের ভিতরে নিশ্চয়ই গিয়াস বেগের পরিবারের সাথে বেশি খাতিরের ব্যাপারে একটা ভয়ের সংক্রমণ ঘটেছে, তার মানে এই না যে সেও বিষয়টা পাত্তা দেয়। একজন পরিচারিকাকে চিঠির সাথে একটা স্বর্ণমুদ্রা ঘুষ দিয়ে এবং জাহাঙ্গীরের উজির মাজিদ খানের কোনো পরিচারিকার হাতে চিঠিটা পৌঁছে দিতে বলে সাথে এটাও বলবে যে গিয়াস বেগের মেয়ের কাছ থেকে চিঠিটা এসেছে, কিন্তু তারপরেও জাহাঙ্গীরের কাছে চিঠি লেখার পরে প্রায় বারোঘন্টা অতিবাহিত হতে চলেছে। মাজিদ খানের বিষয়ে সে যা কিছু শুনেছে তার মনে হয়েছে যে মাজিদ খান একটা বিবেকসম্পন্ন মানুষ, যিনি গত কয়েকমাস যাবত তাঁর আব্বাজানের বাসার একজন নিয়মিত অতিথি ছিলেন, কিন্তু তিনিও এখন হয়তো গিয়াস বেগের সাথে একটা দূরত্ব বজায় রাখবেন। উজির মহাশয় একটা জ্বলন্ত মোমবাতির শিখায় চিঠিটা ধরে রেখে, তাঁর শেষ আশাটাও ভষ্ম করে দিচ্ছে সে কল্পনা করে।
‘এই মুহূর্তে আমার সাথে চলেন। মেহেরুন্নিসা চমকে ঘুরে তাকায়। খাজাসারাকে প্রবেশ করতে সে শুনেনি এবং মালাকে তাঁর কাছ থেকে মাত্র চার ফুট দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কেঁপে উঠে। সে তার হাতের কর্তৃত্বের নিদর্শনসূচক দণ্ড দিয়ে দরজার দিকে ইঙ্গিত করার সময় তাঁর চোখে মুখে একটা আবেগহীন অভিব্যক্তি ফুটে থাকে। মেহেরুন্নিসার পরনে নীল রেশমের তৈরি তাঁর সবচেয়ে সুন্দর আলখাল্লা রূপার জরি দিয়ে যার উপরে সোলোমী ফুলের নক্সা করা ভাগ্যক্রমে যদি সম্রাট দেখা করার জন্য তাকে ডেকে পাঠান সেই কথা ভেবে, কিন্তু মালার কঠোর মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে তাঁর সন্দেহ হয় যে মালা আদতেই তাকে সেজন্যই ডাকতে এসেছে। রাজকীয় হেরেম থেকে সে সম্ভবত বহিস্কৃত হতে চলেছে, সেক্ষেত্রে সে কোনোভাবেই নিজের প্রিয় জিনিষগুলো যেমন অনিক্সের সবুজ দোয়াতদানি আর বিশেষ করে তাঁর অলঙ্কারগুলো ফেলে যাবে না। সে দামী একটা কাশ্মিরী শাল, আসাফ খান তাকে দিয়েছিলেন, তুলে নিয়ে নিজের অলঙ্কারের বাক্সের দিকে হাত বাড়ালে খাজাসারা তখন অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে বলে, কিছু নিতে হবে না। তুমি যেভাবে রয়েছে ঠিক সেভাবেই আমার সাথে এসো। নিজেকে কেবল অবগুণ্ঠিত করে নাও।
মেহেরুন্নিসা শালটা নামিয়ে রাখে এবং নেকাব বেঁধে নিয়ে নিজের চোখ আজ্ঞানুবর্তীভাবে নত করে রাখে। মালার সবুজ আলখাল্লায় আবৃত লম্বা অবয়বকে অনুসরণ করে নিজের আবাসন কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে, দরদালান দিয়ে এগিয়ে গিয়ে হেরেমের আঙিনা অতিক্রম করার সময়, যেখানে ইতিমধ্যেই সাঁঝের ঝাড়বাতি জ্বালান হয়েছে, সে ভাবে আমার জীবনের তাহলে এভাবেই সমাপ্তি ঘটবে। তীর্যক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে, কটু মন্তব্য শুনে, কান্নায় তাঁর চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে কিন্তু সে সবকিছু ঝেড়ে ফেলে ধীরে সুস্থে গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা তুলে দাঁড়ায়। খাজাসারা যদিও দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে কিন্তু বেত্রাহত কুকুরের মত তাড়াহুড়ো করে সে হেরেম থেকে বের হয়ে যাবে না।
