চিঠিতে আরও কিছু লেখা রয়েছে, কিন্তু মেহেরুন্নিসা ইতিমধ্যে যতটুকু পড়েছে সেটুকুই সে টায়টোয় কোনোমতে আত্মীভূত করে। তার আব্বাজান গিয়াস বেগ, যিনি প্রথমে আকবর আর পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরের অধীনে দুই দশকের বেশি সময়কালব্যাপী এমন বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছেন, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে সম্রাটকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করার কারণে… এটা একেবারেই অসম্ভব। তাঁর মুহূর্তের জন্য মনে হয় সে এখনও বোধহয় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রয়েছে এবং পুরো ব্যাপারটাই একটা অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন, কিন্তু মুশকিল হল আশেপাশেই কোথাও একটা মশা উচ্চ স্বরগ্রামে ক্লান্তিকরভাবে গুনগুন করছে আর নাদিয়া সবসময়ে যে সুগন্ধি ব্যবহার করে থাকে সেটার তীব্র কস্তুরি গন্ধ, সন্দেহাতীতভাবে বাস্তব।
‘এটা কি? আশা করি কোনো দুঃসংবাদ নেই? নাদিয়া জানতে চায়, তার চোখ উত্তেজনায় চক চক করছে।
‘আমাদের পারিবারিক একটা ব্যাপার। তুমি এখন যেতে পারো, কিন্তু প্রদীপটা রেখে যাও আমি যেন পড়ার জন্য আলো পেতে পারি।’
মেহেরুন্নিসা যখন নিশ্চিত হয় যে পরিচারিকা বাস্তবিকই চলে গিয়েছে সে তার মুখের উপর থেকে নিজের লম্বা কালো চুলের গোছা সরিয়ে নিয়ে পুনরায় আরজুমান্দের লেখা চিঠিটার দিকে তাকায়, ধীরে ধীরে চিঠিটার পুরো বিষয়বস্তু আত্মস্থ হতে আরম্ভ করতে তাঁর হাত পায়ের রক্ত নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে। তাঁর আব্বাজানের জীবন হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে আর তাঁদের পুরো পরিবার ধ্বংস কিংবা আরো মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি এসে উপনীত হয়েছে। যুবরাজ খুররমের সাথে আরজুমান্দের বিয়ের ধারণাই এখন হাস্যকর হয়ে পড়েছে, এবং তাঁর নিজের আশা আকাঙ্খও… সে এক মুহূর্তের জন্য তখনও আন্দোলিত হতে থাকা জরির কারুকাজ করা পর্দার দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে না, প্রতি মুহূর্তে তার কেবলই মনে হতে থাকে যেকোনো মুহূর্তে পর্দার নাজুক কাপড় একপাশে সরিয়ে হেরেমের প্রহরী আর খোঁজার দল ঝড়ের বেগে ভেতরে প্রবেশ করবে তাকেও গ্রেফতার করতে।
তাকে এখন অবশ্যই মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। আরজুমান্দের চিঠিখানা শক্ত করে ধরে সে পড়তে থাকে। আমার দাদাজানকে তাঁরা নিয়ে যাবার সময় সেখানে আগত প্রহরীদের একজন তাকে বলেছিল, আপনার ছোট ছেলে মীর খানকে দুই দিন পূর্বে একই অভিযোগে গোয়ালিওরে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় আগ্রায় নিয়ে আসা হয়েছে। দুশ্চিন্তায় আমার দাদাজান প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ফুপুজান দয়া করে আমাদের সাহায্য করেন। আমাদের কর্তব্য করণীয় সম্পর্কে সত্ত্বর আমাদের অবহিত করবেন। চিঠিটার শেষে দ্রুত টানে আরজুমান্দ লেখা।
মেহেরুন্নিসা শয্যা থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং চিঠিটা যত্নের সাথে ভাঁজ করে তেপায়ার উপরে তেলের প্রদীপের পাশে রাখে। সে তারপরে মন্থর পায়ে হেঁটে বাতায়নের কাছে যায় এবং সূর্যের তাপে তখনও উত্তপ্ত হয়ে থাকা বেলেপাথরের সংকীর্ণ পার্শ্বদেশে হাত রাখে। সে নিচের দিকে তাকিয়ে দু’জন মহিলা প্রহরীকে হেরেমের আঙিনায় পরিক্রমণ করতে দেখে, তাদের আলকাতরায় চোবানো ছেঁড়া কাপড়ের মশালের আলোয় তাদের চারপাশে নৃত্যরত ছায়ারা ছড়িয়ে যায়। দরবারের সময়রক্ষক, ঘড়িয়ালীকে সে কাছাকাছি কোথাও থেকে ঘণ্টার সংকেত ধ্বনি করতে শুনে–একবার, দুইবার, তিনবার… সে আকাশের দিকে তাকালে সেখানে আকাশের মসিকৃষ্ণ গভীরতার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে উজ্জ্বল তারকারাজির অসংখ্য নক্সা ছড়িয়ে থাকতে দেখে। পৃথিবীর সমস্যাবলী থেকে এত দূরবর্তী, তারকারাজির দূরাগত শীতল সৌন্দর্য কীভাবে যেন তাঁর মাঝে শক্তি জোগায়, তাকে শান্ত করে এবং আরো পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে তাকে সাহায্য করে।
তাঁর আব্বাজান গিয়াস বেগ, সম্মান আর অতিমাত্রায় অনুগত, নিরপরাধ, সে নিশ্চিত। তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেটা নিঃসন্দেহে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা ঈর্ষাপ্রসূত। কিন্তু তাঁর ছোট ভাই মীর খানের অভিযোগের বিষয়টার ব্যাখ্যা কি হতে পারে? সে নিশ্চিতভাবে কিছুই বলতে পারে না। কাবুলে তাঁরা একসাথে বড় হয়েছে। সে সবসময়েই জানে যে তার এই ছোটভাইটা তার কিংবা আসফ খানের মত বুদ্ধিমান–কিংবা তাদের মত মানসিক শক্তির অধিকারী হয়নি। মীর খান আত্মাভিমানী এবং নিজের এই সীমাবদ্ধতা সে কখনও স্বীকার করে না। সে খুব ভালো করেই জানে তাকে কত সহজে ভুল পথে পরিচালিত করা সম্ভব। তারা যখন ছোট ছিল তখন কতবার যে সে তাকে তার নিজের নয় বরং তার স্বার্থে তাকে হঠকারী কাজে প্রলুব্ধ করেছে। তার জন্য ফল সংগ্রহ করতে ভাইকে সে একবার খুবানির গাছের পচা ডাল বেয়ে উঠতে প্ররোচিত করেছিল মনে পড়তে সে আপন মনে হেসে উঠে। সেই ডাল তার ভাইকে নিয়ে নিচে ভেঙে পড়েছিল।
অনেকদিন আগের সেসব কথা। মীর খানের এতদিনে বিচক্ষণ আর বিবেচক হবার কথা, কিন্তু আসাফ খান যেমন অল্প বয়সেই উন্নতি করেছিলেন তেমন সাফল্য সে লাভ করে নি। হতাশা, বড় ভাইয়ের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে আর হতাশার কারণেই কি বিশাল পুরষ্কারের মিষ্টি প্রলোভনে ভুলে সে অবাস্তব কোনো ষড়যন্ত্রে সামিল হয়েছিল? তাঁর জানার কোনো উপায় নেই। তাঁর ছোট ভাই তাঁদের আব্বাজান গিয়াস বেগের মতই নিরপরাধও হতে পারে। তাকে বিচার করতে গিয়ে সে কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো করতে চায় না। এখন কি করণীয় সেটাই বরং ঠাণ্ডা মাথায় আর যুক্তি সহকারে ঠিক করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিজের এবং তার পরিবারের ভাগ্য–এমনকি হয়তো তাঁদের জীবন–এখন একটা সরু সুতার মাথায় ঝুলছে। তার এখন কোনোভাবেই হঠকারীতা প্রদর্শন করা চলবে না, কিন্তু হাত পা গুটিয়ে বসে থাকাটা হয়তো প্রাণঘাতি প্রতিপন্ন। হতে পারে…
