‘খুররম। তোমার বয়স এখনও অনেক কম কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি মনস্থির করে ফেলেছে। তোমার হৃদয় যদি এই মেয়েটাকে পাবার জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়, আমি তাহলে আপত্তি করবো না এবং তার পরিবার আর আমাদের পরিবারের ভিতরে বৈবাহিকসূত্রে মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হবার ইঙ্গিত দিতে আমি নিজে তাঁর আঙুলে বাগদানের অঙ্গুরীয় পরিয়ে দেবো। আমি তোমায় কেবল একটা অনুরোধই করবো যে বিয়ে করার পূর্বে তুমি কিছুদিন একটু অপেক্ষা করো।
জাহাঙ্গীর নিজ সন্তানের চোখে বিস্ময় দেখতে পায়–স্পষ্টতই সে এত সহজে উদ্দেশ্য সাধনের ব্যাপারটা আশা করে নি–কিন্তু তারপরেই সেটা মিলিয়ে গিয়ে আনন্দের হাসিতে পরিণত হয় এবং খুররম তাকে আলিঙ্গণ করে। আমি অপেক্ষা করবো এবং আপনি আর যা কিছু বলবেন সব করবো…’
‘আমি আসফ খানকে ডেকে পাঠাবো। আমাকে তার সাথে অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত বিষয়টা গোপন রাখবে। তোমার আম্মিজানকেও এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
খুররম বিদায় নিতে জাহাঙ্গীর যখন কক্ষে আবার একা হয়, সে নিজের মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। খুররমের সাথে তার কথোপকথন অনেক ভাবনার স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছে। খুররম মোটেই খসরুর মত না, যার বিশ্বাসঘাতকতা সে এখনও ক্ষমা করতে পারে নি, সে সবসময়েই একজন অনুগত সন্তান যাকে নিয়ে যেকোনো লোক গর্ববোধ করতে পারে। তার ইচ্ছে করে যে খুররমের বয়সে সে যদি এমন আত্মবিশ্বাসী হতে পারতো এবং সেই সাথে নিজের সন্তানকে সে ভালো করে চিনতো, কিন্তু নিজের প্রিয় নাতির জন্য আকবরের চরম পক্ষপাতিত্ব পুরো ব্যাপারটাকে কঠিন করে তুলেছে। আকবরের সংসারে খুররম প্রতিপালিত হয়েছিল। তাঁর দাদাজানই ছিলেন সেই ব্যক্তি–তাঁর নিজের আব্বাজান নয়–যিনি প্রথমবারের মত যুবরাজকে পাঠশালায় নিয়ে যাবার মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু সেসবই এখন অতীতের কথা, এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পিতা আর পুত্র একত্রে প্রচুর সময় অতিবাহিত করার সুযোগ পেয়েছে।
সে যাই হোক, খুররমের অনুরোধে নির্দ্বিধায় রাজি হয়ে সে নিজেই নিজেকে বিস্মিত করেছে। মোগল সাম্রাজ্যের একজন যুবরাজ নিজেই তার স্ত্রী নির্বাচন করতে পারে। আরজুমান্দ যদিও অভিজাত এক পার্সী পরিবারের সন্তান কিন্তু তারপরেও তাঁর নিজের মনে এমন একটা সম্বন্ধের কথার কখনও উদয় হতো না। কিন্তু সে নিজেই খুব ভালো করেই জানে যে, পছন্দ এখানে সবসময়ে পরিণতি লাভ করে না। হুমায়ুন আর হামিদার ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। মেহেরুন্নিসার প্রতি সে যেমন অনুভব করে সেজন্য কেউ তাকে বাধ্য করে নি এজন্যই নিজের সন্তান এভাবে অতিক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে প্রেমে পড়ায় সে তাকে কোনোভাবেই অভিযুক্ত করতে পারে না। গিয়াস বেগের পরিবারের মেয়েরা মনে হয় তাঁর মত লোকদের সম্মোহিত করার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু খুররমের মত তাকেও অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে…
১.০৬ নিহন্তার খড়গ
মালকিন, উঠুন।’ কেউ একজন যেন তাঁর কাঁধ ধরে প্রবল ভাবে ঝাঁকাতে থাকে এবং মেহেরুন্নিসার মনে হয় সে কি স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু ঘুম ঘুম চোখ খুলে সে নাদিয়াকে তাঁর উপর ঝুঁকে থাকতে দেখে।
‘কি হয়েছে? কেন তুমি আমার ঘুম ভাঙালে?’ পরিচারিকাটা তাঁর শয্যার পাশে রাখা মার্বেলের তেপায়ার উপরে একটা জ্বলন্ত তেলের প্রদীপ রেখেছে এবং কক্ষের আওয়াজির ভিতর দিয়ে প্রবাহিত উষ্ণ বাতাসে এটা কম্পমান একটা কমলা রঙের আভার জন্ম দিয়েছে।
আপনার কাছে একটা চিঠি এসেছে। হেরেমের প্রবেশ দ্বারে যে বার্তাবাহক এটা পৌঁছে দিয়েছে সে বলেছে এটা যেন অবিলম্বে আপনাকে দেয়া হয়। মেহেরুন্নিসা খেয়াল করে পরিচারিকা কথাগুলো বলার সময় কৌতূহলের কারণে প্রায় থরথর করে কাঁপছে। সে বিছানায় উঠে বসে, তাঁর হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন সহসাই বেড়ে গিয়েছে এবং নাদিয়ার হাত থেকে তার জন্য ধরে রাখা সীলমোহর করা কাগজটা নেয়। রাতের অন্ধকারে যে সংবাদ আসে সেটা কেবল দুঃসংবাদই হতে পারে। সে যখন চিঠিটার ভাঁজ খুলছে তখন তাঁর আঙুল মৃদু কাঁপে এবং সে তার ভাইঝির ঝরঝরে হস্তাক্ষর দেখা মাত্র চিনতে পারে। চিঠিটা খুব ব্যস্ততার মাঝে লেখা হয়েছে। পুরো চিঠিটা বেমানান কালির দাগ আর বেশ কয়েকটা শব্দ কেটে দেয়া হয়েছে।
ফুপিজান, ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটেছে। আমার আব্বাজান সামরিক প্রয়োজনে দিল্লি গিয়েছেন এবং আমার আর আমার দাদিজানের পক্ষে আর কারো মুখাপেক্ষী হওয়া সম্ভব নয়। আজ রাতের বেলা আমি যখন দূর্গে আমার পিতামহের আবাসস্থলে অবস্থান করছিলাম তখন প্রহরীরা আমার দাদাজানকে গ্রেফতার করতে এসেছিল। তারা দাবি করে গোয়ালিওরে নিজের কারাপ্রকোষ্ঠ থেকে সম্রাটকে হত্যা করার অভিপ্রায়ে যুবরাজ খসরু দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটা ষড়যন্ত্রে তাঁর ভূমিকা রয়েছে এবং রাজকীয় কোষাগার দখল করতে তাঁর সাহায্যের জন্য খসরু তাকে তাঁর উজির হিসাবে নিয়োগ করে তাকে পুরস্কৃত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুমি ভালো করেই জানো আমার দাদাজান কেমন মানুষ–সবসময়েই ভীষণ শান্ত, ভীষণ সম্মানিত। তিনি আমাদের দুশ্চিন্তা করতে নিষেধ করে নিরবে তাঁদের সাথে গিয়েছেন কিন্তু আমি ঠিকই দেখেছি তিনি কতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন এবং সেইসাথে তিনি ভয়ও পেয়েছেন।
