‘শয্যায় ফিরে চলেন। আপনার নিশ্চয়ই কিছু শক্তি এখনও অবশিষ্ট আছে এবং আমিও আপনাকে নতুন কিছু একটা দেখাতে চাই…’ জামিলা’র আদুরে কণ্ঠস্বর তাঁর ভাবনার জাল ছিন্ন করে। সে বিছানায় টানটান হয়ে বসে আছে, তার মেহেদী রাঙান স্তনবৃন্ত উদ্ধত, এবং সেও তার দু’পায়ের সংযোগস্থলে পরিচিত সক্রিয়তা অনুভব করে। কিন্তু এটা পুরোটাই হবে কেবল আরো একবার সহবাসের অভিজ্ঞতা। সে আর জামিলা অনেকটা যেন যৌনক্রিয়ায় মিলিত হওয়া দুটি পশু, শীর্ষ অনুভূতির জন্য ক্ষুধার্ত আর উদ্গ্রীব হলেও পরস্পরের প্রতি কারো কোনো আন্তরিক অনুভূতি কাজ করে না। সে যদি তার কাছে না আসতো মেয়েটা তাহলে অন্য কাউকে খুঁজে নিত, এবং সে আর তার নর্তকীর দল যখন আগ্রা ত্যাগ করবে তখন সে সহজেই তার বদলে অন্য কাউকে পেয়ে যাবে। তাদের এই ক্ষিপ্ত সহবাস, একে অন্যকে নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বে পৌঁছে দেয়া, একটা অস্থির বাসনাকে পরিতৃপ্ত করার আকাঙ্খ ছাড়া আর কিছুই নয়। আরজুমান্দের ভাবনা এখন যখন তার মনে সবসময়ে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন এসব কিছু তার জন্য আর যথেষ্ট নয়।
*
‘আব্বাজান, আমি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই।’
‘কি কথা?’ জাহাঙ্গীর নীলগাইয়ের অণুচিত্রটা সরিয়ে রাখে যা সে নিজের নিভৃত ব্যক্তিগত কক্ষে বসে পর্যবেক্ষণ করছিল। দরবারের পেশাদার শিল্পী প্রতিটা খুঁটিনাটি বিষয় সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে, এমনকি কৃষ্ণসার মৃগের চামড়ার হালকা নীলাভ আভাস, এর চোখের জটিল আকৃতি… খুররম ইতস্তত করে। আমরা কি একা থাকতে পারি…
‘আমাদের একা থাকতে দাও, জাহাঙ্গীর তাঁর পরিচারকদের আদেশ দেয়। শেষ পরিচারকটার বের হয়ে যাবার পর দরজা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হবার আগেই, খুররম অনেকটা বোকার মত কথা শুরু করে। আমি একজনকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে চাই।’
জাহাঙ্গীর স্থির দৃষ্টিতে নিজের ছেলের দিকে তাকায়–তার এখন প্রায় ষোল বছর বয়স এবং ইতিমধ্যেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের মতই লম্বা এবং পেষল দেহের অধিকারী হয়ে উঠেছে। তাঁর আধিকারিকদের ভেতরে খুব জনই তাকে কুস্তি কিংবা তরোয়ালবাজিতে পরাস্ত করার সামর্থ্য রাখে।
‘তুমি ঠিকই বলেছে, জাহাঙ্গীরকে চিন্তাকুল দেখায়। আমার প্রায় তোমার মতই বয়স ছিল যখন আমি আমার প্রথমা স্ত্রীকে গ্রহণ করি কিন্তু আমাদের তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। আমি বিবেচনা করে দেখবো কে তোমার জন্য যোগ্য পাত্রী হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। জয়সলমিরের রাজপুত শাসকের বেশ কয়েকজন বিবাহযোগ্য কন্যা রয়েছে এবং তাঁর পরিবারের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন আমার হিন্দু প্রজাদের প্রীত করবে। অথবা আমি আমাদের সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরেও খুঁজে দেখতে পারি। পারস্যের শাহ পরিবারের কারো সাথে বিয়ে হলে মোগলদের কাছ থেকে কান্দাহার কেড়ে নেয়ার বাসনা ত্যাগ করতে তাকে হয়তো আরো বেশি আগ্রহী করে তুলবে…’ জাহাঙ্গীরের মন দ্রুত ভাবতে শুরু করে। সে তার উজির মাজিদ খানকে ডেকে পাঠাতে পারে এবং তাঁর অন্যান্য কয়েকজন পরামর্শদাতাকেও সম্ভবত ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনার জন্য ডেকে পাঠান যায়। আমি খুব খুশি হয়েছি খুররম, তুমি ব্যাপারটা নিয়ে সরাসরি আমার সাথে আলোচনা করেছো। তোমার প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠার বিষয় এটা দৃশ্যমান করেছে এবং সেই সাথে তুমি আসলেই যে তোমার প্রথম স্ত্রীকে গ্রহণ করার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। আমার আবার এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো যখন আমি বিষয়টা নিয়ে আরো ভালোভাবে চিন্তা করবো–আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সেটা খুব শীঘ্রই হবে।’
‘আমি আমার স্ত্রী হিসাবে আমার পছন্দের মেয়ে ইতিমধ্যে খুঁজে পেয়েছি।’ খুররমের কণ্ঠস্বর জোরালো শোনায় এবং তাঁর সবুজ চোখের মণিতে আন্তরিক অভিব্যক্তি খেলা করে।
বিস্ময়ে জাহাঙ্গীরের চোখের পাতা কেঁপে উঠে। কে সে?
‘আগ্রায় অবস্থিত আপনার সেনানিবাসের সেনাপতির কন্যা।
‘আসফ খানের মেয়ে? তুমি তাকে কোথায় দেখতে পেলে?
‘রাজকীয় মিনা বাজারে আমি তাকে দেখেছি। তার নাম আরজুমান্দ।
‘মেয়েটার বয়স কত হবে? একজন বিবাহযোগ্যা কন্যার পিতা হিসাবে আসফ খানের বয়স কমই বলতে হবে।
‘মেয়েটা আমার চেয়ে সম্ভবত সামান্য কয়েক বছরের ছোট হবে।
জাহাঙ্গীর ভ্রূকুটি করে। তার প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় যে এটা কেবল এক ধরনের তারুণ্যপূর্ণ মোহ–সম্ভবত ব্যাপারটা তাই ছিল–কিন্তু ব্যাপারটা অদ্ভূত। খুররমের নজর কেড়েছে যে কিশোরী সে সম্ভবত মেহেরুন্নিসার ভাস্তি এবং সেই সাথে তাঁর কোষাধ্যক্ষ গিয়াস বেগের নাতনি। বহু বছর আগে গিয়াস বেগ যখন কপর্দকশূন্য অবস্থা আর হতাশা নিয়ে আকবরের দরবারে প্রথমবার আসে তখন তাঁর দাদিজান হামিদা তাকে যা কিছু কথা বলেছিলেন তার মনে পড়ে। কি বলেছিলেন যেন? কথাগুলো অনেকটা এমন ছিল, অনেক ঘটনাই ঘটে যা এলোমেলো মনে হবে, কিন্তু আমি প্রায়শই উপলব্ধি করি আমাদের অস্তিত্বের ভিতর দিয়ে একটা ছক প্রবাহিত হচ্ছে অনেকটা যেন কোনো দিব্য কারিগরের হাত তাঁতে বসে নক্সা বুনছে… একদিন এই গিয়াস বেগ আমাদের সাম্রাজ্যের জন্য হয়ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তার দাদিজান হামিদার ভবিষ্যতের ঘটনাবলি প্রত্যক্ষবৎ দেখার ক্ষমতা ছিল। তার কথাগুলো কেবল একজন নির্বোধই খারিজ করবে।
