‘ফুলদানিটা আমার পছন্দ হয়েছে। তুমি এর দাম কত চাও?
‘আপনি কত দিতে চান? মেয়েটা নিজের মাথা একপাশে কাত করে।
‘তুমি যা চাইবে।
‘আপনি তাহলে একজন ধনবান ব্যক্তি?
খুররমের সবুজ চোখে বিস্ময় ঝলসে উঠে। মেয়েটা কি তাকে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে এবং তার আব্বাজান যখন কথা বলছিলেন তখন বেদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি? যদি নাও দেখে থাকে, তারপরেও সবাই নিশ্চিতভাবেই যুবরাজদের চেনে… ‘ঠিকই বলেছো আমি যথেষ্ট ধনী।
‘বেশ।
‘দরবারে তুমি কতদিন ধরে রয়েছে?
‘চার সপ্তাহ।’
‘তুমি এর আগে তাহলে কোথায় ছিলে?
‘সম্রাটের সেনাবাহিনীকে আমার আব্বাজান আসফ খান একজন সেনাপতি। সম্রাট তাকে আগ্রা সেনানিবাসের অধিনায়কত্ব দেয়ার পূর্বে তিনি দাক্ষিণাত্যে কর্মরত ছিলেন।
‘আরজুমান্দ… আমি তোমাকে এতক্ষণ একা রাখতে চাইনি…’ মধু-রঙা আলখাল্লায় মার্জিতভাবে সজ্জিত একজন মহিলা দ্রুত এগিয়ে আসে যার কাটা কাটা চেহারার সাথে মেয়েটার মুখের স্পষ্ট মিল রয়েছে। বয়স্ক মহিলাটা সামান্য হাপাচ্ছে কিন্তু খুররমকে দেখার সাথে সাথে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং মাথা সামান্য নত করেন এবং মৃদু কণ্ঠে বলেন, ‘মহামান্য যুবরাজকে ধন্যবাদ আমাদের দোকানে পদধুলি দেয়ার জন্য। আমাদের পসরাগুলো মামুলি হলেও আমার নাতি সবগুলো নিজের হাতে তৈরি করেছে।
‘সবগুলো জিনিষই দারুণ সুন্দর। আমি সবগুলোই কিনতে চাই। তুমি কেবল দামটা আমায় বলো।’
‘আরজুমান্দ, তোমার কাছে উনি জানতে চাইছেন?
আরজুমান্দকে, যে এতক্ষণ আন্তরিকতার সাথে খুররমকে পর্যবেক্ষণ করছিল, অনিশ্চিত দেখায়, তারপরে সে বলে, একটা সোনার মোহর।
‘আমি তোমায় দশটা দেবো। কর্চি আমার এখনই দশটা মোহর দরকার, খুররম তার কয়েক পা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সহকারীকে ডেকে বলে। কর্চি সামনে এগিয়ে আসে এবং আরজুমান্দের দিকে স্বর্ণমুদ্রাগুলো এগিয়ে ধরে। না, ওগুলো আমাকে দাও।’ তার সহকারী তার ডান হাতের তালুতে স্বর্ণমুদ্রার একটা স্রোত অর্পণ করে। খুররম ধীরে হাত তুলে ধরে এবং মেয়েটার দিকে মোহরগুলো বাড়িয়ে দেয়। বাতাসের বেগ বেড়েছে এবং
আরজুমান্দকে দেখে মনে হয় চারপাশে আন্দোলিত কাঁচের গোলক থেকে রংধনুর প্রতিটা রং বিচ্ছুরিত যেন তাকে জারিত করেছে। সে তার হাতের তালু থেকে স্বর্ণমুদ্রাগুলো একটা একটা করে তুলে নেয়। তার হাতের তালুর ত্বকে মেয়েটার আঙুলের স্পর্শ তাঁর এযাবতকালের অভিজ্ঞতার মাঝে সবচেয়ে ইন্দ্রিয়গ্রাহী অনুভূতি। চমকে উঠে, সে মেয়েটার মুখের দিকে তাকায় এবং মেয়েটার কালো চোখের তারায় তাকিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ দেখে যে সেও একই অনুভূতিতে দগ্ধ। শেষ মুদ্রাটা তুলে নেয়া হতে সে পুনরায় হাত নামিয়ে নেয়। তাঁর কেবলই মনে হয় মেয়েটার ত্বক তাকে স্পর্শ করার যে অনুভূতি তার স্থায়িত্ব যেন অনন্তকালব্যাপী হয়… সহসা তাঁর এই অনুভূতির কারণে সে অনিশ্চিত, বিভ্রান্তবোধ করে।
“তোমাকে ধন্যবাদ।’ সে ঘুরে দাঁড়িয়ে, দ্রুত সেখান থেকে সরে আসে। প্রধান দোকানগুলোর চারপাশে ভিড় করে থাকা কোলাহলরত মানুষের চিৎকার চেঁচামেচির মাঝে ফিরে আসবার পরেই কেবল তার মনে হয় যে সে তার ক্রয় করা দ্রব্য সামগ্রী নিয়ে আসেনি এবং মেয়েটাও তাকে পেছন থেকে ডাকেনি।
*
খুররমের ঘামে ভেজা বুকে জামিলা ঠাট্টাচ্ছলে হাত বুলায়। আমার প্রভু, আজ রাতে আপনার দেহে বাঘের শক্তি ভর করেছিল। সে আলতো করে তার কানে ঠোকর দেয় এবং তার নিঃশ্বাসে সে এলাচের গন্ধ পায় মেয়েটা চিবাতে পছন্দ করে।
‘এসব বন্ধ করো।’ সে খানিকটা জোর করে তার হাত সরিয়ে দেয় এবং আলতো করে নিজেকে তার আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কাঠের নক্সা করা অন্তঃপট দিয়ে যদিও কক্ষটা, পাশের ঘর যেখানে মেয়েটা অন্যান্য নর্তকীদের সাথে আহার করে, আলাদা করে ঘেরা রয়েছে যেখানে সে রাতের বেলা ঘুমায় কিন্তু সে তারপরেও একজন বৃদ্ধাকে মেঝের এবড়োথেবড়ো হয়ে থাকা মাটিতে প্রবলভাবে শুকনো লতাপাতার তৈরি ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করতে দেখে। মেয়েরা তাদের খদ্দেরদের কাছ থেকে যা আদায় করে তাতে তার বেশ ভালোই দিন চলে যায়।
খুররম একটা ধাতব পাদানির উপরে রাখা মাটির পাত্র থেকে নিজের মুখে পানির ঝাপটা দেয়।
“কি ব্যাপার? আমি কি আপনাকে খুশি করতে ব্যর্থ হয়েছি? জামিলা কথাটা বললেও তার মুখের আত্মবিশ্বাসী হাসি বুঝিয়ে দেয় যে নিজের পারঙ্গমতার বিষয়ে তাঁর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
নাহ্। অবশ্যই তুমি ব্যর্থ হওনি।
‘তাহলে কি ব্যাপার? জামিলা তার পার্শ্বদেশ ঘুরিয়ে নিয়ে দাঁড়ায়।
সে তার গোলাকৃতি সুন্দর মুখশ্রী, মেয়েটার নধর, ইন্দ্রিয়পরায়ণতার দিকে চোখ নামিয়ে আনে যে গত ছয়মাস ধরে তার আনন্দসঙ্গী। সে বাজারের পরুষ আবহাওয়া বেশ উপভোগ করে এবং মেয়েরা–এত মুক্ত আর সাবলীল মনে হয় আগ্রা দূর্গে খাজাসারা তার জন্য যেসব রক্ষিতাদের হাজির করতে পারবে তাদের চেয়ে অনেক কম ভীতিকর যেখানে সবসময়ে অসংখ্য চোখ তাকে লক্ষ্য করছে। জামিলা তাকে রতিকর্মের খুটিনাটি শিখিয়েছে। সে আগে ছিল অতিশয়-ব্যগ্র, এক আনাড়ি কিন্তু জামিলা তাকে শিখিয়েছে কীভাবে একজন নারীকে তৃপ্তি দিতে হয় এবং আনন্দদান কীভাবে তার নিজের তৃপ্তি বর্ধিত করতে পারে। মেয়েটার উষ্ণ সুনম্য দেহ, তাঁর উদ্ভাবন কুশলতা তাকে বিমুগ্ধ করতো। কিন্তু এখন সেসব অতীত। সে ভেবেছিল জামিলার সাথে সহবাস করলে হয়তো সে আরজুমান্দের প্রতি নিজের আবিষ্টতা থেকে মুক্তি পাবে কিন্তু সেরকম কিছুই হয়নি। এমনকি সে যখন জামিলার দেহ পরম আবেশে আঁকড়ে ধরেছিল তখনও সে আরজুমারে মুখ দেখতে পেয়েছে। রাজকীয় মিনা বাজার যদিও দুইমাস আগে শেষ হয়েছে, সে আসফ খানের মেয়ের কথা কিছুতেই নিজের মাথা থেকে দূর করতে পারছে না।
