জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীর অর্থ আকবর ভালোই বুঝতেন। খুররমের ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি রয়েছে যেখানে সে ঝলমলে হাওদার নিচে আকবরের পাশে বসে রয়েছে আর তারা আগ্রার সড়ক দিয়ে হাতির পিঠে চড়ে চলেছে। নিজের প্রজাদের কাছে নিজেকে দর্শন দেয়ার বিষয়ে বরাবরই আকবরের দুর্বলতা ছিল এবং তাঁরাও এজন্য তাকে ভালোবাসতো। আকবর ছিলেন সূর্যের মত এবং তার খানিকটা প্রভা খুররম ভাবে তাঁর নিজের উপরেও পড়েছে। তাঁর আব্বাজান জাহাঙ্গীর অবশ্য এই মুহূর্তে, যিনি হীরকসজ্জিত অবস্থায় জ্বলজ্বল করছেন, তাঁর অমাত্যদের পরিবেষ্টিত অবস্থায় এগিয়ে চলেছেন সবসময়ে ছায়াতেই অবস্থান করেছেন। খুররম যখন ছোট ছিল তখনও তার চারপাশে উৎকণ্ঠা আঁচ করতে পারতো–তার আব্বাজান আর দাদাজানের মাঝে, তার আব্বাজান আর তার সৎ-ভাইদের ভিতরে বড় যে সেই খসরুর মাঝে, যে তাঁদের আব্বাজানের রাজত্বকালে আয়োজিত প্রথম নওরোজের আনন্দ এখানে ভাগাভাগি করার বদলে গোয়ালিয়রে অজ্ঞাত কোনো ভূগর্ভস্থ কুঠরিতে বন্দি রয়েছে। খুররম প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে রূপার কারুকাজ করা চাঁদোয়ার নিচে একই কাপড় দিয়ে মোড়ানো বেদীর দিকে তাঁর আব্বাজানকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাবার সময় ভাবে, খসরু অবাধ্য আর সেই সঙ্গে আহাম্মক, বেদীস্থলটা দুপাশে প্রজ্জ্বলিত মশালের আলোয় আলোকিত।
জাহাঙ্গীর বেদীতে আরোহণ করে এবং বক্তৃতা আরম্ভ করে। আজ রাতে আমাদের নওয়োজ উৎসবের যবনিকাপাত হবে যখন আমরা নতুন চন্দ্র বৎসরকে স্বাগত জানাব। আমার জ্যোতিষীরা আমাকে বলেছে যে আমাদের সাম্রাজ্যের জন্য আগামী বছরটা আরো সমৃদ্ধি বয়ে আনবে। আমার দরবারের মেয়েদের সম্মান জানাবার এখন সময় হয়েছে। রাতের তারা যতক্ষণ না আকাশ থেকে মিলিয়ে যায় তারাই, আমরা নই, এখানের। অধীশ্বর। তারা তাদের দ্রব্যের জন্য যা দাম চাইবে আমরা অবশ্যই সেটাই দিতে বাধ্য থাকবো যদি না আমরা তাঁদের অন্যভাবে ভুলাতে পারি। রাজকীয় মিনা বাজার শুরু হোক।’
জাহাঙ্গীর বেদী থেকে নেমে আসে। খুররমের কাছে মনে হয় যে তার আব্বাজান নামার সময় এম মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে তার চারপাশে তাকিয়ে দেখেন যেন নির্দিষ্ট কাউকে তিনি খুঁজছেন, এবং তারপরে তাঁর মুখাবয়বে হতাশার একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠে। কিন্তু জাহাঙ্গীর সাথে সাথে নিজেকে সংযত করে নেন এবং হাসিমুখে মেরুন রঙের মখমল বিছানো একটা টেবিলের দিকে এগিয়ে যান খুররম চিনতে পারে পারভেজের দুধ-মায়ের একজন সেখানে বিক্রেতা সেজে স্মিত মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। পারভেজ আব্বাজানের পিছনেই রয়েছে কিন্তু খুররম দাঁড়িয়ে যায়। পারভেজের এই দুধ-মা দারুণ বাঁচাল মহিলা এবং এই মুহূর্তে তার আর পারভেজের ছেলেবেলা সম্বন্ধে লম্বা গল্প শোনার মানসিকতা তার নেই। তার পরনের কোমর পর্যন্ত আঁটসাট কোটটা ভীষণ ভারি আর অস্বস্তিকর। সে শক্ত কাপড়ের নিচে নিজের চওড়া কাঁধ খানিকটা নমনীয় করতে চেষ্টা করলে টের পায় পিঠের চেটালো অস্থির মাঝ দিয়ে ঘামের একটা ধারা নিচের দিকে নামছে।
খুররম তাঁর আব্বাজানকে অনুসরণ করার চেয়ে আঙিনার নির্জন প্রান্তের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে তাঁর ধারণা অপেক্ষাকৃত কমবয়সী মেয়েরা তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসেছে। তাদের মাঝে হয়তো কোনো সুন্দরী রয়েছে যদিও এই মুহূর্তে আগ্রা বাজারের বর্তুলাকার নিতম্ব আর ভরাট বুকের এক নর্তকী তার সমস্ত মনোযোগ দখল করে রেখেছে। খুররম তারপরে খেয়াল করে প্রাঙ্গণের দেয়ালের কাছে সাদা জুই ফুলের একটা সুবিস্তৃত ঝাড়ের কাছে প্রায় অন্ধকারের ভিতরে একটা ছোট দোকানে মাটির কিছু জিনিষপত্র বিক্রির জন্য রাখা আছে। দোকানে দীর্ঘাঙ্গি, হালকা পাতলা দেখতে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে মেয়েটার মুখটা দেখতে পায় না কিন্তু মেয়েটা যখন তার দোকানের পসরাগুলো সাজিয়ে রাখছে তখন সে তার চারপাশে আন্দোলিত লম্বা, ঘন চুলে হীরা আর মুক্তার ঝলক লক্ষ্য করে। খুররম আরো কাছে এগিয়ে যায়। মেয়েটা আপনমনে গান গাইছে এবং খুররম যখন দোকানটা থেকে মাত্র কয়েক কদম দূরে এসে দাঁড়ায় তখনই কেবল সে তার অস্তিত্ব টের পায়। বিস্ময়ে মেয়েটার কালো চোখ বড় দেখায়।
খুররম আগে কখনও এমন নিখুঁত মুখশ্রী দেখেনি। আমি তোমায় চমকে দিতে চাইনি। তুমি কি বিক্রি করছো?
মেয়েটা তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উজ্জ্বল নীল আর সবুজ রঙে চিত্রিত একটা ফুলদানি এগিয়ে দেয়। ফুলদানিটা মামুলি হলেও দেখতে খুবই সুন্দর। অবশ্য তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকা ঘন, দীপ্তিময় পাপড়িযুক্ত লাজুক চোখ দুটিকে কোনোভাবেই সাধারণ বলা যাবে না। খুররমের নিজেকে বেকুব মনে হয় এবং তাঁর কথা জড়িয়ে যায় আর সে ফুলদানির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতে চেষ্টা করে কি বলা যায়।
‘আমি নিজে এটা রং করেছি। আপনার পছন্দ হয়েছে? মেয়েটা জানতে চায়। সে চোখ তুলে মেয়েটার দিকে আবার তাকালে সে দেখে মেয়েটা খানিকটা আমুদে ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে ভাবে, মেয়েটার বয়স কোনোমতেই চৌদ্দ কি পনের বছরের বেশি হবে না। দরবারে আরব বণিকদের আনা মুক্তার মত একটা দীপ্তি মেয়েটার কোমল ত্বকে এবং তাঁর পুরু ঠোঁট গোলাপি রঙের আর কোমল।
