‘আসফ খান আপনার সাথে দেখা হয়েও খুব ভালো লাগছে। আমিও যখন শেষবার আপনাকে দেখেছিলাম তখন আপনি কৃশকায় লম্বা পা আর মুখে ফুস্কুড়িবিশিষ্ট একজন তরুন যোদ্ধা, সেও পাল্টা খোঁচা দেয়। আর এখন আপনি আগ্রা সেনানিবাসের দায়িত্বে রয়েছেন।
আসফ খান কাঁধ ঝাঁকায়। সম্রাট আমার প্রতি সদয়। আমি আশা করি আমার ভাইও আমার মতই ভাগ্যবান হবে। আমি যদি পারতাম তাহলে মীর খানকে গোয়ালিওর থেকে এখানে বদলি করে আনতাম তাহলে আমাদের পরিবার সত্যিই আবার একত্রিত হতে পারতো। আমাদের অভিভাবকদের, বিশেষ করে আম্মিজান এতে খুবই খুশি হতেন… কিন্তু আরো খবর রয়েছে। সম্রাট সামনের মাসে আগ্রা দূর্গে আয়োজিত রাজকীয় মিনা বাজারে অংশ নিতে আমাদের পরিবারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।’
‘সেটা আবার কি? আরজুমান্দ বিভ্রান্ত চোখে তার আব্বাজানের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু মেহেরুন্নিসা তাঁর কৌতূহল নিবৃত্ত করতে উত্তর দেয়।
‘বাজারটা হলো নওরোজেরই একটা অংশ–রাশিচক্রের প্রথম রাশি মেষে সূর্যের প্রবেশ করা উপলক্ষ্যে সম্রাট আকবরের প্রবর্তন করা আঠারো দিনব্যাপী নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান। ফাতিমা বেগম সবসময়ে অভিযোগ করেন যে উৎসব শুরু হবার দুই সপ্তাহ আগে থেকে মিস্ত্রিরা দূর্গের উদ্যানে সুসজ্জিত শিবির স্থাপন করা আরম্ভ করলে হারেমে তখন কেবল তাদের হাতুড়ির আওয়াজ শোনা যায়।’
‘আর রাজকীয় মিনা বাজার?
‘অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটা অনেকটা সত্যিকারের বাজারের মতই পার্থক্য হল এখানে রাজপরিবারের সদস্য আর অভিজাতেরা কেবল ক্রেতা। দূর্গের উদ্যানে রাতের বেলা এটা আয়োজন করা হয়। অমাত্যদের –স্ত্রী আর কন্যারা–আমাদের মত মেয়েরা–টেবিলের উপরে পট্টি করে বাঁধা রেশম আর তুচ্ছ অলংকারের পসরা সাজিয়ে বসে এবং বিক্রেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তাঁদের সম্ভাব্য ক্রেতাদের রাজকুমারী আর রাজপরিবারের প্রবীণাদের আর সেই সঙ্গে সম্রাট আর তাঁর যুবরাজদের সাথে দর কষাকষি আর হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠে। অনুষ্ঠানটা এতটাই ঘরোয়া যে সব মেয়েরা এদিন নেকাব ছাড়াই চলাফেরা করে।
‘আব্বাজান, আমি যেতে পারবো, আমি পারবো না?’ আরজুমান্দকে সহসা উদ্বিগ্ন দেখায়।
‘অবশ্যই। আমাকে এখন আবার তোমাদের ছেড়ে যেতে হচ্ছে। আমাকে আরো কিছু সামরিক সমস্যার তদারকি করতে হবে কিন্তু আমি শীঘ্রই ফিরে আসবো।’
আসফ খান চলে যেতে, মেহেরুন্নিসা আরজুমান্দ বানুর সাথে বসে তার উৎসুক সব প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু তার মনটা অন্য কোথায় পড়ে থাকে। ফাতিমা বেগম তাকে বাজারের সব কথাই বলেছেন কিন্তু সবকিছু তার পছন্দ হয়নি এবং এমন কিছু তিনি বলেছেন মেহেরুন্নিসা অবশ্যই যা তার ভাস্তির সামনে বলতে পারবে না। মিনা বাজার আসলে একটা মাংসের বাজার–এর বেশি কিছু না। আকবর এটা শুরু করেছিলেন কারণ তিনি নতুন শয্যাসঙ্গিনী পছন্দ করার একটা সুযোগ চেয়েছিলেন। কোনো কুমারী মেয়ে যদি তার চোখে ধরতো তাহলে তাঁর মনোরঞ্জনের জন্য মেয়েটাকে প্রস্তুত করতে তিনি খাজাসারাকে আদেশ দিতেন। বৃদ্ধার আপাত সহানুভূতিশীল চেহারায় ভ্রুকুটি দেখে মেহেরুন্নিসা আঁচ করে যে বহু দিন আগে বাজারে এমন কিছু একটা হয়েছিল যাতে তিনি আহত হয়েছেন। তিনি সম্ভবত আকবরের বাছবিচারহীন যৌন সংসর্গ অপছন্দ করেন। আরজুমান্দের মতই মেহেরুন্নিসাও অন্তরের গভীরে উত্তেজনা অনুভব করে–বাজারই একমাত্র স্থান যেখানে সে নিশ্চিতভাবেই সম্রাটকে দেখতে পাবে। কিন্তু ফাতিমা বেগম কি তাকে অংশগ্রহণের অনুমতি দেবেন?
*
এক সপ্তাহ পরের কথা ফাতিমা বেগমের দমবন্ধ করা আবাসস্থলে সন্ধ্যার মোমবাতি জ্বালানো হতে মেহেরুন্নিসা তাঁর প্রশ্নের উত্তর পায়। যেদিন থেকে সে বৃদ্ধাকে তার আমন্ত্রণের কথা বলেছে তিনি বাকচাতুরীর আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। মেহেরুন্নিসা এখন যদিও নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর পোষাকে এবং মূল্যবান অলঙ্কারে সজ্জিত করেছে, তিনি তাঁর মুখাবয়বে একটা একগুয়ে অভিব্যক্তি ফুটিয়ে রাখেন মেহেরুন্নিসা যার অর্থ ভালোই বুঝে।
‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তুমি একজন বিধবা। বাজারে অংশগ্রহণ করাটা আপাত দৃষ্টিতে তোমার জন্য সমীচিত হবে না। আর এসব হাঙ্গামায় যাবার জন্য আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তুমি বরং আমাকে পার্সী কোনো কবিতা পড়ে শোনাও। আমাদের দুজনের জন্যই সেটা বাজারের হট্টগোল আর অশিষ্টতার চেয়ে আনন্দদায়ক হবে।
মেহেরুন্নিসা দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে কবিতার একটা খণ্ড তুলে নেয় এবং হতাশায় কম্পিত আঙুলি দিয়ে লাল রঙের সুগন্ধি কাঠের মলাটের রূপার বাকল ধীরে ধীরে খুলে।
*
আগ্রা দূর্গের বিশাল দূর্গপ্রাঙ্গন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে, খুররম ভাবে যখন সে, তিনবার তূর্যবাদনের সাথে, তাঁর বড় ভাই পারভেজের সাথে তাদের আব্বাজান জাহাঙ্গীরকে অনুসরণ করে সেখানে প্রবেশ করে, তাদের তিনজনেরই পরনে আজ সোনার জরির কারুকাজ করা পোষাক। গাছের ডাল আর ঝোঁপঝাড় থেকে ঝুলন্ত কাঁচের রঙিন গোলাকার পাত্রে মোমবাতি জ্বলছে এবং সোনা আর রূপার তৈরি কৃত্রিম গাছে রত্ন-উজ্জ্বল ছায়া–লাল, নীল, হলুদ, সবুজ-মৃদু বাতাসে আন্দোলিত হয়। দেয়ালের চারপাশে সে মখমল দিয়ে মোড়া ছোট ছোট উন্মুক্ত দোকানে পলকা অলঙ্কারের পসরা। সাজিয়ে মেয়েদের সেখানে অপেক্ষমান দেখে। তাঁর দাদাজানের সময়ের মতই পুরো ব্যাপারটা জমকালো দেখায়। সমস্ত নওরোজ উৎসবকালীন সময়ে আকবরের আনন্দ সে এখনও প্রাঞ্জলভাবে মনে করতে পারে। ‘সম্পদশালী হওয়াটা ভালো–বস্তুতপক্ষে এটা আবশ্যিক। কিন্তু একজন সম্রাটের জন্য সেটা প্রদর্শন করা যে তুমি সম্পদশালী সেটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
