কয়েক মিনিট পরে তার সংজ্ঞা ফিরে আসতে সে মাটিতে বিছানো একটা কম্বলের উপর নিজেকে শায়িত দেখতে পায় যখন দু’জন হেকিম উদ্বিগ্ন মুখে মরুভূমির সূর্যের নিচে তার ক্ষতস্থানের রক্তপাত বন্ধ আর সেলাই করছে। সংজ্ঞা ফিরে আসবার সাথে সাথে একটা আকষ্মিক ভাবনা তাকে পেয়ে বসে। রাজা এখন মৃত এবং অভিযান শেষ হওয়ায় সে এখন সহজেই নববর্ষ উদ্যাপনের জন্য আগ্রায় যথাসময়ে ফিরে যেতে পারবে। মেহেরুন্নিসার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সুফি বাবার কঠোর নির্দেশ ভঙ্গ না করেই উৎসবের আয়োজন তাকে নিশ্চিতভাবেই তার সাথে আবারও অন্তত দেখা করার সুযোগ দেবে। হেকিমদের একজনের হাতে ধরা সুই তাঁর ঊর্ধ্ববাহুর ত্বক ভেদ করতে লোকটা তার উন্মুক্ত ক্ষতস্থানের দুই পাশ সেলাই করতে শুরু করায় যন্ত্রণার তীক্ষ্ণ খোঁচা সত্ত্বেও জাহাঙ্গীর হাসি চেপে রাখতে পারে না।
*
‘আচ্ছা, আগ্রা দূর্গ সম্বন্ধে তোমার কি ধারণা?’ মেহেরুন্নিসা গিয়াস বেগের আবাসস্থলে বসে থাকার সময় তার ভ্রাতুস্পুত্রীকে জিজ্ঞেস করে। সে মনে মনে ভাবে, আরজুমান্দ বানু দেখতে কি রূপসী হয়েছে। কাবুলে খুব ছোটবেলায় দেখার পরে মেয়েটাকে সে আর দেখেনি। আরজুমান্দের বয়স এখন চৌদ্দ বছর কিন্তু তাঁর বয়সের অনেক মেয়ের মত কোনো বেমানান আনাড়িপনা তার ভিতরে নেই। তাঁর মুখটা কোমল ডিম্বাকৃতি, ভ্রু যুগল নিখুঁতভাবে বাঁকানো, এবং মাথার ঘন কালো চুল প্রায় তার কোমর ছুঁয়েছে। তার চেহারায় তার পার্সী মায়ের আদল স্পষ্ট যিনি তাঁর যখন মাত্র চার বছর বয়স তখন মারা গিয়েছেন কিন্তু তার চোখ আবার তাঁর বাবা, আসফ খানের মত, কালো রঙের।
‘আমি কখনও এরকম কিছু দেখিনি–এতো অসংখ্য পরিচারিকা, এত অগণিত আঙিনা, এতগুলো ঝর্ণা, এত এত রত্নপাথর। আমরা যখন দূর্গে প্রবেশ করছিলাম তারা আমার আব্বাজানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে তোরণদ্বারে দামামা বাজিয়েছিল।’ সবকিছুর অভিনবত্ব দেখে উত্তেজনায় আরজুমান্দের চোখ মুখ জ্বলজ্বল করতে থাকে।
মেহেরুন্নিসা স্মিত হাসে। তার কেবল মনে হয় সে যদি আবার এই বয়সে যেতে পারতো… ‘আকবরের রাজত্বকালের সময় থেকে, বিজয়ী সেনাপতির আগমনকে সম্মান প্রদর্শন করতে দামামা বাজাবার রীতির প্রচলন হয়েছে। বাজনা শুনে আমিও যারপরনাই গর্বিত হয়েছি।’
মেহেরুন্নিসার আব্বাজান কয়েক সপ্তাহ পূর্বে তাকে পত্র মারফত জানিয়েছিলেন যে তাঁর বড় ভাই আসফ খান দক্ষিণে দাক্ষিণাত্যে লড়াইয়ের সময় নিজেকে এতটাই স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করেছেন যে সম্রাট তাকে আগ্রায় ডেকে পাঠিয়েছেন এখানের সেনানিবাসের দায়িত্ব গ্রহণ করতে। দুই সপ্তাহ পূর্বে আসফ খান আগ্রা এসে পৌঁছেছেন। মেহেরুন্নিসার প্রথমে ফাতিমা বেগম এবং পরে কর্তৃত্বপরায়ণ খাজাসারার কাছ থেকে গিয়াস বেগের আবাসস্থলে আসবার জন্য ছুটি পেতেই এতদিন সময় লেগেছে এবং সে তার ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছে।
‘তোমার আব্বাজান কোথায়? আমি এখানে কেবল সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকতে পারব।’
“তিনি সম্রাটের সাথে নতুন পরিখাপ্রাচীরাদিনির্মাউ বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছেন কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যত শীঘ্র সম্ভব তিনি আপনার সাথে দেখা করতে আসবেন।’
মেহেরুন্নিসা শুনতে পায় তার আম্মিজান লাডলিকে আঙিনার পাশেই একটা কামরায় গান গেয়ে শোনাচ্ছে। মেয়েটা খুব দ্রুত তার অনুপস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং সে জানে যে তার ব্যাপারটা সম্বন্ধে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যদিও সেটা তাকে খানিকটা আহত করে যে তাঁর মেয়ে সত্যিই তার অনুপস্থিতি তেমনভাবে উপলব্ধি করে না। তার পরিবার শনৈ শনৈ উন্নতি লাভ করছে। সম্রাটের কোষাগারের দায়িত্ব নিয়ে গিয়াস বেগকে সবসময়ে ব্যস্ত থাকতে হয়, তাঁর আম্মিজান অন্তত তাকে তাই বলেছেন, তাছাড়া আসফ খানও স্পষ্টতই জাহাঙ্গীরের অনুগ্রহভাজনদের তালিকায় শীর্ষেই রয়েছে। সেই কেবল, মেহেরুন্নিসা, যে ব্যর্থ হয়েছে। সম্রাটের কাছ থেকে সে এখনও কোনো ইঙ্গিত পায় নি এবং ফাতিমা বেগমকে খিদমত করার একঘেয়েমি প্রতিদিনই আরো বিরক্তিকর হয়ে উঠছে।
‘ফুফুজান, কি ব্যাপার? আপনাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।
নাই কিছু না। আমি ভাবছিলাম কতদিন পরে আমরা সবাই আবার একত্রিত হয়েছি।’
‘আর সম্রাটের মহিষীদের কথা বলেন? তাঁর স্ত্রী, রক্ষিতা, তাঁরা সবাই কেমন দেখতে? আরজুমান্দ নাছোড়বান্দার মত জিজ্ঞেস করে।
মেহেরুন্নিসা তাঁর মাথা নাড়ে। আমি তাঁদের কখনও দেখিনি। তাঁরা হেরেমের একটা পৃথক অংশে বাস করে যেখানে সম্রাট আহার করেন আর নিদ্রা যান। আমি যেখানে বাস করি সেখানে প্রায় সব মহিলাই, আমার গৃহকত্রীর মত, বয়স্ক।
আরজুমান্দকে হতাশ দেখায়। রাজকীয় হেরেম আমি অন্যরকম ভেবেছিলাম।’
‘আমিও সেটাই ভেবেছিলাম-’ মেহেরুন্নিসা সেই সময়েই বাইরের করিডোরে পায়ের শব্দ শুনতে পায়, এবং প্রায় সাথে সাথেই আসফ খান ভেতরে প্রবেশ করেন।
‘আমার প্রিয় বোন! পরিচারিকাদের কাছে শুনলাম তোমাকে এখানেই পাওয়া যাবে। মেহেরুন্নিসা তাঁর আসন ছেড়ে পুরোপুরি উঠে দাঁড়াবার আগেই সে তাকে তার বাহুর মাঝে জাপটে ধরে মেঝে থেকে প্রায় শূন্যে তুলে নেয়। ভাইজান তাঁদের আব্বাজানের মতই লম্বা কিন্তু আরো চওড়া আর থুতনি চৌকা। সে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তুমি বদলে গিয়েছে। আমি তোমায় শেষবার যখন দেখেছিলাম তখন তুমি নিতান্তই একজন বালিকা–আরজুমান্দের চেয়ে বেশি বয়স হবে না, এবং অনেকবেশি লাজুক। কিন্তু এখন তোমায় দেখে…’
