জাহাঙ্গীরের ঘোড়াটা যন্ত্রণায় চিহি শব্দ করে একপাশে সরে যেতে, সে ভারসাম্য হারায় কিন্তু দ্রুত সামলে নিয়ে, নিজের বাহনকে শান্ত করে এবং রেকাবে পুনরায় পা রাখতে সক্ষম হয়। অন্য লোকটা ততক্ষণে পুনরায় তাকে আবার আক্রমণ করতে এগিয়ে এসেছে। জাহাঙ্গীর তার কালো ঘোড়ার ঘামে ভেজা গলার কাছে নুয়ে আসতে তার প্রতিপক্ষের তরবারির ফলা বাতাসে ফণা তোলার মত শব্দ করে ঠিক তার শিরোস্ত্রাণের পালক স্পর্শ করে বের হয়ে যায়। জাহাঙ্গীর তার ঘোড়াটা বৃত্তাকালে ঘুরিয়ে নিয়ে পুনরায় শত্রুর মুখোমুখি হবার ফাঁকে চিন্তা করার খানিকটা অবসর পেতে ভাবে, রাজা বিদ্রোহী হলেও একজন সত্যিকারের যোদ্ধা যে হামলার সময় তাঁর মুখোমুখি হবার সাহস দেখিয়েছে। উভয় যোদ্ধাই নিজেদের বাহনের পাঁজরে তাদের গোড়ালি দিয়ে গুঁতো দেয় এবং একই সাথে সামনে এগিয়ে আসে আক্রমণ করতে। জাহাঙ্গীর এবার তার প্রতিপক্ষের গলা লক্ষ্য করে নিজের তরবারি হাঁকায়। আঘাতটা প্রথমে ইস্পাতের বক্ষাবরণীর প্রান্তে আটকে যায় কিন্তু তারপরে মাংসে এবং পেশীতন্তুতে কামড় বসায়। রাজার বাঁকানো তরবারির ফলা তার তরবারি ধরা হাতের লম্বা চামড়ার দাস্তানা চিরে ভেতরে ঢুকতে জাহাঙ্গীরও একই সময়ে হুল ফোঁটানর মত যন্ত্রণা অনুভব করে এবং সাথে সাথে তাঁর হাত বেয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। ঘোড়ার মুখ দ্রুত ঘুরিয়ে নিয়ে সে দেখে তার প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে নিজের পর্যাণ থেকে একপাশে কাত হয়ে যাচ্ছে এবং তারপরে ভোতা একটা শব্দ করে ধুলি আচ্ছাদিত মাটিতে আছড়ে পড়তে তার হাত থেকে তরবারির বাট ছিটকে যায়।
জাহাঙ্গীর নিজের পর্যাণ থেকে লাফিয়ে নিচে নামে এবং পায়ের আঘাতপ্রাপ্ত গুলের কারণে খানিকটা দৌড়ে, খানিকটা খুড়িয়ে ভূপাতিত লোকটার দিকে নিজেকে ধাবিত করে। তার ঘাড়ের ক্ষতস্থান থেকে যদিও টকটকে লাল রক্ত স্রোতের মত বের হয়ে তার ঘন, কালো কোঁকড়ানো দাড়ি এবং বুকের বর্ম সিক্ত করছে, সে তখনও নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে।
‘আত্মসমর্পণ করো, জাহাঙ্গীর আদেশের সুরে বলে।
‘আর তোমার প্রাসাদের ভূগর্ভস্থ কুঠুরিতে নিজের জানটা খোয়াই? কখনও না। আমি এই লাল মাটির বুকেই মৃত্যুবরণ করবো বহু পুরুষ ধরে যা আমার পরিবারের অধিকারে রয়েছে–আমাদের ভূমি দখলকারী তোমাদের লোকের চেয়ে তাদের সংখ্যা অনেক বেশি। শব্দগুলো রক্তের বুদ্বুদের সাথে মিশে তার ঠোঁট দিয়ে বের হতে সে তার দেহের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে তার পায়ের ঘোড়সওয়াড়ীর জুতোর ভিতরে রক্ষিত একটা ময়ান থেকে খাঁজকাটা ফলাযুক্ত লম্বা একটা খঞ্জর টেনে বের করে আনে। সে আঘাত করার জন্য নিজের হাত পিছনে নেয়ার পূর্বেই জাহাঙ্গীরের তরবারি আরো একবার লোকটার গলায় আঘাত হানে, এবার তার কণ্ঠার হাড়ের ঠিক উপরে আঘাত করতে, তার দেহ থেকে তাঁর মাথাটা প্রায় আলাদা হয়ে যায়। লোকটা পিছনে শুয়ে পরলে, তার রক্ত ছিটকে এসে ধুলো লাল করে দিতে থাকে। তার দেহটা একবার কি দুইবার মোচড় খায় এবং তারপরে সে নিথর হয়ে পড়ে থাকে।
জাহাঙ্গীর প্রাণহীন শবদেহটার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। তার উধ্ববাহুর ক্ষতস্থান থেকে তাঁর নিজের উষ্ণ আর পিচ্ছিল রক্ত এখনও তার হাত বেয়ে গড়িয়ে তার দাস্তানার ভেতরের আঙুলের জমা হচ্ছে। সে গলা থেকে আহত হাত দিয়ে নিজের মুখ মোছার কাপড়টা টেনে নিয়ে পায়ের গুলুইয়ের ক্ষতস্থানে সেটা কোনোমতে হাল্কা করে জড়িয়ে রাখে যেখানে খুরের আঘাতে সেখানের ত্বকের সাথে নিচের চর্বির স্তর ভেদ করে তার পায়ের গোলাপি রঙের মাংসপেশী বের করে ফেলেছে।
সে আজ সহজেই নিহত হয়ে, তার উচ্চাকাঙ্খ পরিপূর্ণ করা শুরু করার আগেই, অনায়াসে প্রাণ হারাতে এবং সিংহাসন হারাতে পারতো। সে কেন। মির্জাপুরের রাজার বিরুদ্ধে অভিযানে যে এই মুহূর্তে তাঁর পায়ের কাছে হাত-পা ছড়িয়ে নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে তার মন্ত্রণাদাতাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজে ব্যক্তিগতভাবে সেতৃত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? খসরুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় সে যেমন করেছিল ঠিক তেমনই রাজার সৈন্যদের বিরুদ্ধে হামলা করার সময় নিজের দেহরক্ষীদের পিছনে ফেলে সে কেন দ্রুত সামনে এগিয়ে গিয়েছিল? মির্জাপুরের রাজা বস্তুতপক্ষে তার সিংহাসনের জন্য তেমন সত্যিকারের হুমকির কারণ ছিল না, সামান্য এক অবাধ্য জায়গীরদার, রাজস্থানের মরুভূমির সীমান্তে অবস্থিত একটা ছোট রাজ্যের শাসক যে রাজকীয় কোষাগারে বাৎসরিক খাজনা পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সে তার মন্ত্রণাদাতাদের যা বলেছিল–সে দেখাতে চায় যে সে তার অধীনস্ত কারো কাছ থেকে কোনো ধরনের অবাধ্যতা সহ্য করবে না তাঁরা যতই ক্ষমতাধর কিংবা তুচ্ছ হোক এবং বিদ্রোহীদের শাস্তি দিতে সে কারো উপরে নির্ভরশীল হতে চায় না–সেটা ছিল আংশিক উত্তর।
অভিযানটায় তাঁর নিজের নেতৃত্ব দেয়ার পিছনে অবশ্য অতিরিক্ত আরো একটা কারণ রয়েছে সেটা সে নিজেই নিজের কাছে স্বীকার করে। অভিযানটা আগ্রা থেকে এবং সুফি বাবার নিষেধ সত্ত্বেও তাকে নিজের কাছে ডেকে পাঠাবার প্রায় অপ্রতিরোধ্য বাসনা থেকে তাকে সরিয়ে রেখে, তাঁর মেহেরুন্নিসার ভাবনায় চিত্তবিক্ষেপ ঘটাবে। রক্তক্ষরণ আর গরমের কারণে সহসা দুর্বলবোধ করায় জাহাঙ্গীর তার লোকদের পানি নিয়ে আসতে বলে। তারপরেই পৃথিবীটা তাঁর সামনে ঘুরতে শুরু করে।
