‘অন্তত হেরেমের ভিতরে একটা গুজব রয়েছে যে আনারকলির যন্ত্রণা লাঘব করতে জাহাঙ্গীর তার দাদিজান হামিদাকে রাজি করিয়ে ছিল এবং তাকে জীবন্ত সমাধিস্থ করতে দেয়ালের শেষ ইটটা গাঁথার আগে যেভাবেই হোক হামিদা তাঁর কাছে বিষের একটা শিশি পৌঁছে দেন যাতে করে সে দীর্ঘ আর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর বিভীষিকা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।’
বিকেলের বাতাসের সমস্ত উষ্ণতা সত্ত্বেও মেহেরুন্নিসা কাঁপতে থাকে। প্রথমে কশাঘাত এবং তারপরে এই ভয়ঙ্কর গল্প। আমার ফাতিমা বেগমের কাছে ফিরে যাওয়া উচিত, সে বলে। সে যখন নাদিয়ার সাথে প্রাঙ্গণের উপর দিয়ে হেঁটে যায়, যেখানে স্থাপিত কড়িকাঠটা ততক্ষণে সরিয়ে ফেলে পাথরের উপর থেকে রক্তের চিহ্ন ধুয়ে ফেলা হয়েছে, তার মাথায় তখনও আনারকলির শোকাবহ ঘটনাই ঘুরপাক খায়। আকবর কি এতটাই উদাসীন আর নির্মম লোক ছিলেন? অন্যেরা তার সম্বন্ধে এমন কথা বলে না এবং নিশ্চিতভাবে তাঁর আব্বাজানও তাকে এভাবে মনে রাখেন নি। গিয়াস বেগ সবসময়ে মৃত সম্রাটের প্রশংসা করেন এবং বিশেষ করে শাসনকার্য পরিচালনার সময় তিনি যে ন্যায়পরায়ণতা আর ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। আকবর ক্রোধের বশবর্তী হয়ে সম্ভবত আত্মবিস্মৃত হয়েছিলেন এবং একজন সম্রাট হিসাবে নিজের ভাগ্যের উপরে সামান্য নিয়ন্ত্রণের অধিকারী একজন দুর্বল নারীর উপরে এমন আক্রোশপূর্ণ প্রতিশোধ নেয়া থেকে বিরত থাকার বদলে আতে ঘা লাগা একজন সাধারণ মানুষের মত আচরণ করেছেন।
জাহাঙ্গীর… নিশ্চিতভাবে সেই এখানে সবচেয়ে বেশি দোষী? তাঁর চরিত্র সম্বন্ধে এই গল্পটা থেকে সে কি বুঝতে পারে? এটাই বলে যে সে একাধারে হঠকারী, আবেগপ্রবণ আর স্বার্থপর কিন্তু সেই সাথে সে অমিত সাহসী এবং শক্তিমান প্রেমিক। সে পুরো দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে আনারকলিকে রক্ষা করতে চেষ্টা করেছিল। সে যখন সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে তখন তাকে আরও কষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে তাঁর পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল সে তাই করেছে। মেহেরুন্নিসা তাঁর চমৎকার দৈহসৌষ্ঠব তাঁর চোখের সেই আবেগঘন চাহনি যা তাঁর সামনে নাচার সময় তাকে বাধ্য করেছিল মুখের নেকাব ফেলে দিতে। পুরো ব্যাপারটাই অদ্ভূত, কিন্তু আনারকলির প্রতি তাঁর অভিশপ্ত ভালোবাসার গল্প কোনোভাবে তাকে তার দৃষ্টি ছোট করে না–বরং প্রায় উল্টো হয়। পৌরুষদীপ্ত শক্তিতে ভরপুর আর এত অমিত ক্ষমতার অধিকারী এমন একটা মানুষের সাথে জীবন কাটান কতটা রোমাঞ্চকর হতে পারে।
একান্ত অনাহূতভাবে অন্যান্য আরো সংযত ভাবনাগুলো প্রায় একই সাথে উঁকি দিতে শুরু করে। আনারকলির গল্প আর তাঁর নিজের ভিতরে কি মনোযোগ নষ্টকারী সাদৃশ্য নেই? জাহাঙ্গীর আনারকলিকে মাত্র একবার দেখেছিলেন এবং সেটাই আনারকলিকে নিজের করে পাবার জন্য তাকে মরীয়া করে ভোলার জন্য যথেষ্ট ছিল এবং তাকে পাবার জন্য তার প্রয়াস ছিল নির্মম। মেহেরুন্নিসাকেও তিনি কেবলই একবারই দেখেছিলেন এবং সেটা আনারকলির মৃত্যুর খুব বেশি দিন পরে নয় এবং তিনি তাকেও পেতে চেয়েছিলেন। সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে দুটো ব্যাপার এক নয়। জাহাঙ্গীর প্রকাশ্যে এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক তাঁর আব্বাজানের কাছে তার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। তাঁর আব্বাজান যখন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল তিনি সেটা মেনেও নিয়েছিলেন। তিনি কি আসলেই মেনে নিয়েছিলেন?
মেহেরুন্নিসার মস্তিষ্ক এখন ঝড়ের বেগে কাজ করতে শুরু করে। কাবুল থেকে গিরিপথের ভিতর দিয়ে সমভূমিতে নামার সময় তার পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী নীল-চোখের সেই অশ্বারোহীকে অনাদিষ্টভাবে সে তার চোখের সামনে আরো একবার দেখতে পায়। সেই সময়ে, সে লাডলির আয়া ফারিশাকে বলেছিল, একটা ভয়ঙ্কর আর ততদিনে ভুলে যাওয়া একটা গুজব, লোকটা কে খুঁজে বের করতে। মাত্র দুই দিন পরেই মেয়েটা তাকে উৎফুল্ল ভঙ্গিতে জানায় যে নীল চোখের অধিকারী একজন বিদেশী সৈন্য আদতেই দেহরক্ষীদের ভিতরে রয়েছে–একজন ইংরেজ যাকে সম্রাট সম্প্রতি নিয়োগ করেছেন। সেই সময়ে এই সংবাদটা শুনে মেহেরুন্নিসা নিজেকে বুঝিয়ে ছিলেন যে ফারিশার কোথাও ভুল হয়েছে। শের আফগানের কথিত আততায়ী একজন পর্তুগীজ। তাছাড়া, সে নিজেকে আরও বোঝাতে থাকে, এই ফিরিঙ্গিগুলোকে দেখতে প্রায়শই একইরকম লাগে এবং সে আধো আলোকে আর ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কয়েক পলকের জন্য তার স্বামীর আততায়ীকে দেখেছিল। কিন্তু সে এখনও মনে মনে ব্যাপারটা নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তাঁর স্বামীর গলায় খঞ্জর চালাবার সময় ধুসর চোখের সেই দৃষ্টি সে কীভাবে ভুলে যাবে বা সে যখন সেই চোখ আবার দেখবে তখন কীভাবে তার ভুল হবে?
কিন্তু মেহেরুন্নিসা এখন চিন্তা করে সে কি আসলেই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে। আনারকলিকে জাহাঙ্গীর কামনা করতেন এবং তাকে পাবার জন্য তিনি কোনো বাধাই মানেননি। তিনি যদি তাকে, মেহেরুন্নিসাকে, কামনা করে থাকেন, তাহলে তিনি কেন কম নির্দয় হবেন? মেহেরুন্নিসা দ্বিতীয়বারের মত কেঁপে উঠে কিন্তু এবার মৃত রক্ষিতার বদলে তাঁর নিজের কথা চিন্তা করে। জাহাঙ্গীর তাকে এতটাই কামনা করে ভাবতেই ব্যাপারটা তাঁর দেহে শিহরণ তোলে, কিন্তু আনারকলির ভাগ্য দেখে এটাও বুঝতে পারে যে রাজপরিবারের সাথে এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুরষ্কারের পাশাপাশি বিপদও বয়ে আনতে পারে…
১.০৫ মীনা বাজার
জাহাঙ্গীর টের পায় প্রতিপক্ষের তরবারির বাঁকানো ফলা পিছলে গিয়ে তাঁর গিল্টি করা চামড়ার পর্যাণের গভীরে কেটে বসার পূর্বে উরু রক্ষাকারী ধাতব শৃঙ্খল নির্মিত বর্মের ইস্পাতের জালিতে ঘষা খায়। সে তার কালো ঘোড়ার লাগাম শক্ত হাতে টেনে ধরে সে শত্রুর হাত চিরে দেবার অভিপ্রায়ে তরবারি হাঁকায় লোকটা তখন নিজের অস্ত্র দিয়ে আরেকবার আঘাত করতে সেটা সরিয়ে আনতে চেষ্টা করছে। সে অবশ্য, অন্য অশ্বারোহী ভীষণ ভাবে নিজের ধুসর ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরায় জন্তুটা পিছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে, লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়। জটার হাচড়পাঁচড় করতে থাকা সামনের পায়ের খুর তার বাহনের উদরে এসে লাগে। অন্যটা তার পায়ের গুলের উপরের অংশে আঘাত করে। আঘাতটা যদিও পিছলে যায় কিন্তু এটা তাঁর পায়ের নিচের অংশ অবশ করে দেয় এবং তাঁর পা রেকাব থেকে ছিটকে আসে।
