‘হ্যাঁ।
‘আমি তোমায় তখন পুরো বিষয়টা খুলে বলিনি…সম্রাটের সম্ভাব্য অভিপ্রায় কি হতে পারে সে সম্বন্ধে আমার একটা ধারণা ছিল।
‘আপনি কি বলতে চাইছেন?
‘এই কাবুল শহরে কয়েকবছর আগে একটা ঘটনা ঘটেছিল–যার সাথে তোমার একটা সম্পর্ক রয়েছে। আমি বিষয়টা তোমাকে কখনও বলিনি কারণ আমার মনে হয়েছিল বিষয়টা না জানাই তোমার জন্য উত্তম। ঘটনাপ্রবাহ যদি ভিন্ন হতো তাহলে আমি একাই বিষয়টা সম্বন্ধে অবহিত থাকার ব্যাপারটা আমার মৃত্যুর সাথে সাথে করে নিয়ে যেতাম… আমাদের বর্তমান সম্রাট তখনও কেবল একজন যুবরাজ, আমাদের এই কাবুলে নির্বাসিত, সে সময়ে আমি আর তিনি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম। আমি যদিও ছিলাম তাঁর আব্বাজানের একজন মামুলি কোষাধ্যক্ষ, আমার মনে হয়েছিল একজন শিক্ষিত ব্যক্তি হিসাবে তিনি আমার সঙ্গ উপভোগ করেন–আমাকে একজন বন্ধু হিসাবেও হয়ত বিবেচনা করেন। সেজন্যই একরাতে আমি তোমায়, আমার একমাত্র মেয়ে হিসাবে, তাঁর মনোরঞ্জনের জন্য নাচতে বলেছিলাম। আমার একমাত্র অভিপ্রায় ছিল আমার সাধ্যের শেষপ্রান্তে গিয়ে তাকে শুভেচ্ছাজ্ঞাপন করা। কিন্তু অচিরেই–খুব সম্ভবত পরের দিনই, আমি ঠিক নিশ্চিত নই–তিনি আমার সাথে দেখা করতে আসেন… তিনি কি দাবি করেছিলেন তুমি কি ধারণা করতে পারো? গিয়াস বেগের দৃষ্টিতে ক্ষুরধার তীক্ষ্ণতা।
না।
তিনি তাঁর স্ত্রী হিসাবে তোমায় পেতে চেয়েছিলেন।’
মেহেরুন্নিসা এত দ্রুত উঠে দাঁড়ায় যে তার তেপায়া একপাশে উল্টে যায়। তিনি আমায় বিয়ে করতে চেয়েছিলেন…?
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি তাকে বলেছিলাম তোমার সাথে ইতিমধ্যে শের আফগানের বাগদান সম্পন্ন হয়েছে–যে আমার পক্ষে কোনোমতেই এই অঙ্গীকারের অবমাননা করা অসম্ভব…’
মেহেরুন্নিসা দু’হাত আঁকড়ে ধরে, বাড়ির ভিতরের আঙিনায় অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করতে থাকে। তার আব্বাজান জাহাঙ্গীরকে মুখের উপর না বলেছিলেন… বাংলার পূতিগন্ধময় উষ্ণ আবহাওয়ায় অনুভূতিহীন, নিষ্ঠুর শের আফগানের স্ত্রী হবার বদলে সে মোগল রাজদরবারের, সবকিছু যা গুরুত্বপূর্ণ তাঁর কেন্দ্রের কাছাকাছি, এক যুবরাজের স্ত্রী হতে পারতো। কেন? তিনি এটা কীভাবে করতে পারলেন? তাকে এমন নির্মমভাবে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করার পেছনে তার কি অভিপ্রায় কাজ করেছিল? সমস্ত পরিবারের সাথে সাথে তিনি নিজেও এই সম্বন্ধের ফলে উপকৃত হতেন… ‘আমার উপরে তুমি রাগ করেছে এবং সম্ভবত তোমার রাগ করাটা সঙ্গত। আমি জানি শের আফগানের সাথে তোমার বিয়েতে তুমি সুখী হওনি, কিন্তু আমার পক্ষে সেটা আগে থেকে বোঝা সম্ভব ছিল না। আমার মনে হয়েছিল আমি যা করেছি সেটা করা ব্যতীত আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। আর তাছাড়া, যুবরাজ নিজেও তখন তাঁর আব্বাজানের নির্দেশে নির্বাসিত। তোমায় বিয়ে করার জন্য তাকে তার আব্বাজানের অনুমতি নিতে হতো এবং তাঁর পক্ষে তখন অনুমতি লাভ করাটা অসম্ভব ছিল। সেই সময়ে ম্রাট হিসাবে অভিষিক্ত হবার বদলে তাঁর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবারই সমূহ সম্ভাবনা ছিল। সম্রাটের কাছে তার সাথে আত্মীয়তা করার বিষয়টা আমাদের পরিবারের জন্য সুখকর নাও হতে পারতো। গিয়াস বেগ দম নেয়ার জন্য থামেন।
মেহেরুন্নিসার কাছে তাঁর আব্বাজানের মুষলধারে এখনকার এই সাফাই দেয়ার ভিতরে একটা স্ববিরোধিতা চোখে পড়ে। যুবরাজ জাহাঙ্গীরের প্রস্তাব আব্বাজান ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নিজের সম্মান বাঁচাতে নাকি নিজের স্বার্থে? কিন্তু সে বেশিক্ষণ ভাববার সময় পায় না তিনি আবার কথা শুরু করেন।
‘আমার অন্য আরো কিছু বলার আছে সেটা আগে শুনে নাও তারপরে তুমি হয়তো আমার প্রতি এত বিরূপ মনোভাব পোষণ করবে না। সম্রাট আমাকে তাঁর রাজকীয় খাজাঞ্চিখানার নিয়ন্ত্রক হিসাবে নিয়োগ দিয়ে, আগ্রা যাবার আদেশ দিয়েছেন। তাঁর আব্বাজানের চোখ সহসা অশ্রুসজল হয়ে উঠে–মেহেরুন্নিসা আগে কখনও তার আব্বাজানের চোখে অশ্রু দেখেনি। ‘গত বিশটা বছর এবং আরো বেশি সময়–আমরা সপরিবারে প্রথম এখানে আসবার পর থেকেই–আমি সবসময়ে সেই মুহূর্তটার কথা ভাবতাম যখন আমাকে আমার গুণাবলীর জন্য স্বীকৃতি দেয়া হবে এবং আমি গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে মনোনীত হবে। আমি সেই আশা ত্যাগ করেছিলাম এবং পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখেছিলাম… কিন্তু আরো বিষয় আছে। সম্রাট লিখেছেন যে তুমি রাজকীয় হেরেমে সম্রাট আকবরের একজন বিধবা পত্নীর সঙ্গিনী হবে। বাছা আমার, আমার মনে হয় না তোমায় তিনি ভুলতে পেরেছেন। এখন তুমি যখন বিধবা আর তিনি একজন সম্রাট, তিনি এখন সেই পদক্ষেপ নিতে পারেন যেটা তিনি যখন কেবল যুবরাজ আর তুমি অন্য আরেকজন লোকের প্রতি অঙ্গীকারবন্ধ থাকায় তখন করতে পারেন নি।
*
ছয়দিন পরের কথা, মেহেরুন্নিসা তাঁর পালকিতে শুয়ে রয়েছে যখন ভারতবর্ষের সমভূমিতে অবতরণের প্রথম পর্যায়ে সংকীর্ণ পাথুরে খুদ গিরিপথের ভিতর দিয়ে তাকে আর তার ঘুমন্ত মেয়ে লাডলী বেগমকে বহনকারী পালকিটা দ্রুত এগিয়ে চলেছে গিলজাই উপজাতির আটজন শক্তসমর্থ লোকের চওড়া নির্ভরযোগ্য কাঁধে পালকির বাঁশের দণ্ড অবস্থান করছে। তাকে ঘিরে রাখা বুটিদার গোলাপি পর্দা বাতাসে আলোড়িত হতে সে এক ঝলকের জন্য বাইরের খাড়াভাবে নেমে যাওয়া, নুড়িপাথরপূর্ণ ঢালে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত চিরহরিৎ ওকের ঝোঁপঝাড় দেখতে পায়। পালকিবাহকেরা প্রায় দৌড়াবার ভঙ্গিতে চলার সময় গান গাইতে গাইতে, তাঁরা পালকির দুলুনিতে একটা নিয়মিত ছন্দ বজায় রেখেছে। সে আশার করে জাহাঙ্গীরের অভিপ্রায়ের বিষয়ে তাঁর আব্বাজানের ধারণাই যেন সত্যি হয়। তার ধারণা সত্যি হোক সেটা সে নিজেও চায় কিন্তু তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সে শিখেছে যে পুরুষমানুষ পরিবর্তনশীল। শের আফগানও তাঁদের বিয়ের প্রথম কয়েকমাস যতক্ষণ তাঁর প্রতি তার আগ্রহ ছিল একজন মনোযোগী স্বামী, স্নেহপরায়ন প্রেমিক ছিলেন… সে হয়তো জাহাঙ্গীরকেও আর মোহিত করতে পারবে না। পুরুষমানুষেরা অল্পবয়সী নারীদেহ পছন্দ করে। সে তখন ছিল ষোল বছরের এক কিশোরী; এখন চব্বিশ বছরের একজন রমণী।
