তার ভাবনার জাল ছিন্ন করে তাকে বহনকারী বহরের পেছন থেকে বিপদসঙ্কেতজ্ঞাপক সনির্বন্ধ চিৎকার আর গাদা বন্দুকের গুলির শব্দ ভেসে আসে। তার বেহারারা গান গাওয়া বন্ধ করে তাঁদের অগ্রসর হবার গতি বৃদ্ধি করতে পালকিটা ভীষণভাবে দুলতে আরম্ভ করে। একহাতে লাডলিকে অভয়দানের ভঙ্গিতে জড়িয়ে ধরে সে পর্দার একটা ধার উঁচু করে বাইরে উঁকি দেয় কিন্তু ধুসর নুড়ি আর পাথর ছাড়া সে কিছুই দেখতে পায় না। পুরোটা সময় গাদা বন্দুকের শব্দ আর চিৎকার আরো প্রবল হয় এবং কাছে এগিয়ে আসতে থাকে। তারপরে বহরের পেছন থেকে একজন অশ্বারোহী তীব্রবেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে পালকির পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, এতই কাছ দিয়ে যে সে লোকটার ঘোড়ার ঘামের গন্ধ পায় এবং প্রাণীটার খুরের আঘাতে ছিটকে উঠা ধুলো তাঁর চোখে এসে পড়ে এবং সে কাশতে শুরু করে। লোকটা চিৎকার করছে, মালবাহী বহরে ডাকাতেরা হামলা করেছে। তিনজন মানুষ আর দুটো মালবাহী উট ভূপাতিত হয়েছে। সেখানে দ্রুত আরো সৈন্য প্রেরণ করো!’
মেহেরুন্নিসা তার চোখ থেকে ধুলো ঘষে ফেলে পিছনের দিকে তাকায় কিন্তু তার দৃষ্টি থেকে মালবাহী বহরটা ফেলে আসা পথের একটা তীক্ষ্ণ বাকের আড়ালে অদৃশ্য হয়েছে। এই গিরিপথগুলো বর্বর আফ্রিদি উপজাতির কারণে কুখ্যাত যারা পর্যটকদের ছোট ছোট বহর লুণ্ঠন করে থাকে কিন্তু রাজকীয় সৈন্যবাহিনীর প্রহরায় সুরক্ষিত একটা বহরে হামলা করাটা নিঃসন্দেহে হঠকারী। তারা জানে না তারা কাদের উপরে হামলা করতে এসেছে… বা হয়তো তারা জানে। কাবুলের ধনী কোষাধ্যক্ষের ভ্রমণের সংবাদ সম্ভবত তাঁদের হামলায় প্ররোচিত করেছে। ছায়াগুলো দীর্ঘতর হতে শুরু করেছে। সূর্য আর এক কি দুই ঘন্টার ভিতরে চারপাশের পাহাড়ের চূড়ার নিচে হারিয়ে যাবে। তাদের বহরের পেছনে অবস্থিত মালবাহী শকটগুলোকে হয়ত আক্রমণ করা হয়েছে তাদের তাড়াহুড়ো করে সংকীর্ণ খুদ গিরিপথের আরো গভীরে নিয়ে যাবার অভিপ্রায়ে যেখানে অন্ধকারের ভিতরে হামলাকারীদের আরেকটা বিশাল দল ওত পেতে রয়েছে? লাডলী আর তাঁর নিজের এবং বহরের সাথে তাঁর সামনে ভ্রমণরত তাঁর পিতামাতার–বিপদের ভাবনা তাকে কিছুক্ষণের জন্য নিথর করে দেয় এবং তারপরে সে দ্রুত চিন্তা করতে শুরু করে। সে কীভাবে নিজেকে আর নিজের কন্যাকে রক্ষা করবে? তার সাথে কোনো অস্ত্র নেই। লাডলী ঘুম থেকে জেগে উঠলে সে মেয়েকে নিজের কাছে টেনে নেয়। লাডলী বিপদের সম্ভাবনায় কাঁটা হয়ে থাকা মায়ের উৎকণ্ঠা টের পাওয়া মাত্র ফোঁপাতে আরম্ভ করে। শান্ত হও, মেহেরুন্নিসা তার কণ্ঠে একটা উৎফুল্লভাব ফুটিয়ে বলে। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আর তাছাড়া, কান্নায় কখনও কারো উপকার হয় নি।
ঠিক সেই মুহূর্তে চিৎকার করে কেউ একজন থামবার নির্দেশ দেয়। তার বেহারারা এত দ্রুত দাঁড়িয়ে পড়ে যে মেহেরুন্নিসা হুমড়ি খেয়ে সামনের দিকে উল্টে পড়ে। তাঁর হাত থেকে লাডলী ছিটকে যায় এবং পালকির কাঠামো গঠনকারী বাঁশের বাঁকানো চক্ৰবলয়ের একটার সাথে তার কপাল গিয়ে এত জোরে ধাক্কা খায় যে কিছুক্ষণের জন্য সে চোখে ঝাপসা দেখে। নিজেকে সুস্থির করে সে লাডলীকে জোর করে পালকির মেঝেতে শুইয়ে দেয়। এখানে চুপ করে শুয়ে থাকো!’ সে এরপরে পর্দার ভেতর থেকে সারসের মত মাথা বের করে বাইরে তাকিয়ে দেখে যে তাঁর সামনে পুরো বহরটা থমকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবকিরা ঘোড়া থেকে মাটিতে নামতে শুরু করেছে এবং বন্দুক পিঠের উপরে আড়াআড়িভাবে ঝুলিয়ে নিয়ে, নুড়িতে আবৃত ঢাল বেয়ে হুড়মুড় করে উপরে উঠার চেষ্টা করে, তাদের পায়ের আঘাতে পাথরের টুকরো আর বালু আলগা হতে থাকে, উপরের দিকে বিক্ষিপ্ত পড়ে থাকা কয়েকটা পাথর তাদের গন্তব্য যেখানে তারা খানিকটা হলেও আড়াল পাবে। রাজকীয় অশ্বারোহী বাহিনীর একটা দল এমন সময় তার পাশ দিয়ে দ্রুতবেগে তাঁদের বহরের পেছনের দিকে ছুটে যায় যেখানে লড়াইয়ের শব্দ প্রতি মুহূর্তে তীব্রতর হচ্ছে। পথটা এখানে এতই সংকীর্ণ যে তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তারা এক সারিতে বিন্যস্ত হতে বাধ্য হয়। বিশাল একটা কালো ঘোড়ায় উপবিষ্ট হাতে ইতিমধ্যেই উদ্যত তরবারি আর উদ্বিগ্ন মুখাবয়বের এক তরুণ অশ্বারোহী দলটার একদম শেষে রয়েছে।
মেহেরুন্নিসা ভাবে, লাডলীকে সাথে নিয়ে পর্দার তোয়াক্কা না করে তাঁর কি। নিজের পিতামাতার গাড়ির দিকে দৌড়ে যাওয়া ঠিক হবে, কিন্তু পরমুহূর্তে সে ধারণাটা নাকচ করে দেয়। তাদের মাথার উপরে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোনো নিশানাবাজের কাছে তারা এর ফলে নিজেদের কেবল অরক্ষিত প্রতিপন্ন করবে। লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নড়াচড়া করার কোনো মানেই হয় না। সে এর বদলে পালকির চারপাশের পর্দা পুনরায় ভালো করে টেনে দেয়। সময় গড়িয়ে ধীরে ধীরে আধো অন্ধকারের আবর্তে এগিয়ে যায়। পুরোটা সময় গাদা বন্দুকের শব্দ–কখনও মনে হয় কাছে এগিয়ে আসছে, কখনও মনে হয় দূরে সরে যাচ্ছে–এবং সৈন্যদের অগ্রসর আর পিছিয়ে আসবার তীক্ষ্ণ আদেশের ব্যাপারে কান খাড়া করে রাখার, সাথে যুক্ত হয় তার কপালের যন্ত্রণা যেখানে ইতিমধ্যে বিশাল মাপের একটা আলুর সৃষ্টি হয়েছে, সে নিজেকে বাধ্য করে লাডলিকে পারস্যের লোকগীতি জোর গেয়ে শোনাতে।
