এবং সে কি কখনও সত্যিই হুসটা বুঝতে পারবে? সে যদি তার বড়ভাই আসফ খানের মত, এখন শাহী সেনাবাহিনীতে একজন সেনাপতি এবং এখান থেকে হাজার মাইল দক্ষিণে দাক্ষিণাত্যে একটা অভিযানের দায়িত্ব পালন করছেন, বা তার ছোটভাই মীর খানের মত, গোয়ালিওরের শাহী সেনানিবাস যেখানে সম্রাটের সন্তান খসরুকে অন্তরীণ রাখা হয়েছে সেখানে দায়িত্ব পালন করছে, একজন পুরুষ হিসাবে জন্ম গ্রহণ করতো, সে তাহলে হয়তো পৃথিবীর আরো অনেক কিছু দেখতে পেতো, আরো অনেক বেশি কিছু বুঝতে পারতো… তার আব্বাজানও তাহলে সম্ভবত পারস্য থেকে আগ্রা অভিমুখে বিপদসঙ্কুল যাত্রাপথে জন্মের সাথে সাথে তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাতে পথের মাঝে পরিত্যাগ করতো না, কাজটা করতে তাঁর যতই অনিচ্ছা থাকুক, এবং ভাগ্য আর একজন বন্ধুবৎসল বণিক তাকে উদ্ধারের সুযোগ দিলে তিনি তখন যতই আনন্দিত হোন। তাঁর প্রতি আব্বাজানের ভালোবাসার চেয়ে তিনি সেই মুহূর্তে নিজের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন এই ভাবনাটা–এবং সে ভালো করেই জানে বাবা-মা দুজনেই তাকে ভীষণ ভালোবাসে–এমন একটা ব্যাপার যা সবসময়েই তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে। বাংলায় তার তিক্ত অভিজ্ঞতা এর সাথে যুক্ত হতে, সে জানে, মানুষ আর তাঁদের অভিপ্রায়ের বিষয়ে তাঁর মাঝে নৈরাশ্যবাদী একটা মনোভাবের জন্ম দিয়েছে। সঙ্কটকালে খুব কম মানুষই নিজেকে ছাড়া অন্য আর কিছু ভাববার সামর্থ্য রাখে।
আর তাছাড়া, একজন রমণীর জীবন, তাঁর নিজের জীবন, এখানে তাঁর আব্বাজানের বাসায় কিংবা পরবর্তীতে গৌড়ে অবস্থান কালে শের আফগানের হেরেমে, যেখানেই হোক ভীষণ সীমাবদ্ধ। সে যখন থেকে বুঝতে শিখেছে তখন থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে তার দারুণ কৌতূহল… পশ্চিমে তাঁদের পরিবারের আদি বাসস্থান পারস্য সম্বন্ধে আর কীভাবে শাহ্ সেই সাম্রাজ্য শাসন করেন; উত্তর-পূর্বদিকে সমরকন্দের গম্বুজ আর মিনারগুলোয় আসলেই কি সে গল্পগাথায় যেমন শুনেছে নীল, সবুজ আর সোনালী রঙ ঝিলিক দেয়। তাঁর আব্বাজান–সে যখন তাকে জোর করে তার নথিপত্রের সামনে থেকে তুলে আনতে পারতো–তার প্রশ্নের যথাসাধ্য উত্তর দিতে চেষ্টা করতেন কিন্তু সে আরো অনেক বেশি কিছু জানতে চায়। পাঠাভ্যাস তার হতাশা প্রশমিত করতে সাহায্য করেছে। গৌড়ে স্বপ্নভঙ্গের প্রথম ধাক্কা সামলে নেয়ার পরে শের আফগানের সাথে জীবন অনেক সহনীয় করে তুলেছিল তাঁর সংগৃহীত পাণ্ডুলিপিগুলো। কিন্তু পাণ্ডুলিপিগুলো সেই সাথে তাঁর অস্থিরতা, তাঁর অসন্তোষও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার পঠিত সবকিছু–পর্যটকের রোজনামচা, এমনকি কবিতা–তার আগে থেকেই প্রাঞ্জল কল্পনাকে আরো উদ্দীপিত করে, ইঙ্গিত দেয় জীবন গৌড়ে সেনাপতির হারেমে ভালোবাসাহীন সহবাস কিংবা তার পৈতৃক বাড়িতে ঘরোয়া আনন্দফুর্তির চেয়েও অনেক বেশি সম্ভাবনায় উদ্বেল।
সে সহসা নিচের আঙিনায় একটা হৈচৈ এর শব্দ শুনতে পায়। মেহেরুন্নিসা ছাদের উপর দিয়ে লাল আর কমলা রঙের পর্দার দিকে দ্রুত হেঁটে গিয়ে যা পথচারীদের দৃষ্টি থেকে আঙিনা সংলগ্ন ছাদের অংশটা ঘিরে রেখেছে, উঁকি দিয়ে নিচে তাকায়। একজন সেনাপতি আর নিশানা-বাহকের নেতৃত্বে রাজকীয় অশ্বারোহীদের একটা বহর নিচের আঙিনায় প্রবেশ করছে। অশ্বারূঢ় সৈন্যরা ঘোড়া থেকে নামতেই তাঁর আব্বাজানের সহিসেরা বাড়ির ভেতর থেকে দ্রুত বের হয়ে এসে লাগামগুলো ধরে এবং কিছুক্ষণ পরেই স্বয়ং গিয়াস বেগের কৃশকায় দীর্ঘদেহী অবয়ব সেখানে উপস্থিত হয়। চকিতে মাথা নত করে এবং ডানহাতে নিজের বুক স্পর্শ করে সে সেনাপতিকে বাড়ির ভেতর নিয়ে যায়। লোকগুলো কেন এসেছে? সে মনে মনে ভাবে।
আগত অন্য সৈন্যরা আঙিনার চারপাশে হাঁটাহাঁটি শুরু করে, গল্পগুজব আর হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠে আর বৃদ্ধ ফল বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা আখরোট–তাঁর মুখের বলিরেখার মতই তাঁর বিক্রীত বাদামগুলো কোঁচকানো–ভেঙে খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে, যে সচরাচর সেখানেই নিজের পসরা সাজিয়ে বসে। কিন্তু সে যতই কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করুক তাদের কোনো কথাই বুঝতে পারে না। সময় অতিবাহিত হতে থাকায় এবং রাজকীয় সেনাপতি তাঁর আব্বাজানের সাথেই অবস্থান করায়, মেহেরুন্নিসা পুনরায় মেয়েদের আঙিনায় নেমে আসে এবং তাঁর তেপায়ার উপরে বসে পড়ার জন্য আরো একবার পাণ্ডুলিপিটা হাতে তুলে নেয়। আঙিনায় ছায়া ক্রমশ দীর্ঘ হতে শুরু করতে এবং দু’জন পরিচারিকা তেলের প্রদীপের সলতেয় আগুন জ্বালাতে শুরু করছে তখন মেহেরুন্নিসা তাঁর আব্বাজানের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। মুখ তুলে তাকাতে, সে দেখে তাকে ক্রুদ্ধ দেখাচ্ছে।
‘আব্বাজান, কি ব্যাপার?
তিনি পরিচারিকাদের চলে যাবার ইঙ্গিত করেন তারপরে লম্বা আঙুলগুলো দিয়ে নীলা বসান সোনার আঙুরীয়টি অস্থির ভঙ্গিতে ঘোরাবার মাঝে, তাঁর পাশে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে পড়েন, সে তার জন্মের পর থেকেই তাকে বাম হাতের তৃতীয় আঙুলে অঙ্গুরীয়টি পরিধান করতে দেখে আসছে। সে পূর্বে কখনও তাঁর আব্বাজানকে–সাধারণত শান্ত আর সংযত–এমন অবস্থায় দেখেনি। তিনি কথা শুরু করার আগে কিছুক্ষণ ইতস্তত করেন, তারপরে এমন একটা স্বরে কথা বলতে শুরু করেন যা মোটেই তাঁর স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর নয়। আমি তোমায় গৌড়ে যে চিঠিটা পাঠিয়েছিলাম তোমার কি সেটার কথা স্মরণ আছে? তোমায় বাসায় পৌঁছে দিতে নিরাপত্তা সহচর হিসাবে রাজকীয় সৈন্য প্রেরণ করায় সম্রাটের উদারতায় আমি যে বিস্মিত হয়েছিলাম…?
