মেহেরুন্নিসা, তাঁর দীর্ঘ যাত্রা পথে, প্রায়শই তাঁর আব্বাজানের কথাগুলো নিয়ে চিন্তা করেছে। তাঁদের পরিবারের প্রতি সম্রাটের এই উদারতার উৎস সম্ভবত কাবুলে বর্তমান সম্রাটের, তখন তিনি যুবরাজ, অতিবাহিত সেই মাসগুলোতে নিহিত যখন তার আব্বাজান সম্রাট আকবর-তাকে সেখানে নির্বাসিত করেছিলেন। যুবরাজের আগমনের বহু পূর্বেই গুজব ছড়িয়ে গিয়েছিল, আকবরকে ভীষণভাবে ক্রুদ্ধ করেছিলেন জাহাঙ্গীর। কাবুলের শাসনকর্তা, সাইফ খানের স্ত্রী মেহেরুন্নিসার আম্মিজানকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে ছিল যে আসলেই কি ঘটেছিল–যুবরাজ তার আব্বাজানের একজন উপপত্নীর সাথে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়েছিলেন। তাকে নির্বাসিত করে শাস্তি দেয়া হলেও মেয়েটার কপালে জুটেছিল মৃত্যুদণ্ড…
তার আব্বাজানের বাড়ির নিয়মিত অতিথিতে পরিণত হয়েছিলেন যুবরাজ। শহরের দূর্গপ্রাসাদ থেকে যুবরাজের রওয়ানা হবার সংবাদ নিয়ে বার্তাবাহক যখন উপস্থিত হতো তখন তাঁদের প্রস্তুতির কথা এখনও তাঁর দিব্যি মনে আছে–কীভাবে তাঁর আম্মিজান ধূপদানিতে মূল্যবান ধূপ জ্বালাতে আদেশ দিতেন, কীভাবে তাঁর আব্বাজান নিজের দামী আলখাল্লাগুলোর একটা পরিধান করতেন এবং তাকে অভ্যর্থনা জানাতে দ্রুত প্রবেশ পথের দিকে এগিয়ে যেতেন। একটা রাতের কথা তাঁর বিশেষভাবে মনে আছে তার আব্বাজান–যিনি তাকে কোনো আভাসই দেননি তিনি কি চান সে সম্বন্ধে–তাদের সম্মানিত অতিথির জন্য পারস্যের ধ্রুপদী নাচের একটা প্রদর্শনের জন্য তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর পরিচারিকার দল তার চুল ভালো করে বেঁধে আর সুগন্ধি ধোয়া দিয়ে সুরভিত করলে সে বিচলিত বোধ করার সাথে সাথে উত্তেজিতও হয়েছিল। সে সোনালী বৃক্ষের নৃত্য প্রদর্শন করেছিল, তার দু’হাতে বাঁধা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সোনালী ঘন্টা, শরতে গাছ থেকে বনের মাটিতে ঝরে পড়া সোনালী পাতায় আসন্ন শীতের হিমশীতল বাতাসের দ্বারা সৃষ্ট আলোড়ন প্রতীকায়িত করেছিল।
সে নাচের মুদ্রা ঠিক করতে এতই মগ্ন ছিল–ভীষণ জটিল একটা নাচ যা নিখুঁত করতে সে তাঁর ওস্তাদজির কাছে ঘন্টার পর ঘন্টা অভ্যেস করেছে–যে নাচের শুরুতে সে সরাসরি যুবরাজের দিকে তাকায়নি। তারপরে যখন, নাচের আবেশ তাকে আচ্ছন্ন করতে আরম্ভ করে, সে যুবরাজের চোখের দিকে নিজের চোখ তুলে তাকায়, মেহেরুন্নিসা তার দৃষ্টির ঐকান্তিকতা অনুভব করতে পারে। সেই সময়ে সে কোনো কারণে বুঝতে পারে নি এবং এখন, এত বছর পরেও, ব্যাপারটা বোধগম্যতার বাইরেই রয়েছে, সে তার নেকাব ইচ্ছে করেই ফেলে দিয়েছিল। তিন বা চারবারের জন্য এর বেশি নয়–সে যুবরাজকে নিজের মুখ দেখতে দিয়েছিল এবং সে জানে তিনি এতে খুশিই হয়েছিলেন।
সম্রাট আকবর এর কিছু দিন পরেই, নিজের সন্তানকে আগ্রা ফিরে আসবার আদেশ দেন। মেহেরুন্নিসাও ততদিনে শের আফগানের সাথে তাঁর আসন্ন বিয়ের নানা ভাবনায় আপ্লুত হয়ে পড়েছে। মোগল রাজদরবারে কপর্দকশূন্য অবস্থায় আগত এক পার্সী অভিজাত ব্যক্তির মেয়ের জন্য এরচেয়ে উপযুক্ত সম্বন্ধ আর হতে পারে না। সম্রাটের অধীনে চাকরি এবং কাবুলের উপর দিয়ে অতিক্রমকারী বণিকদের সাথে বিভিন্ন ব্যবসায়ী উদ্যোগের কারণে তাঁর আব্বাজান যদিও যথেষ্ট সম্পদ অর্জন করেছিলেন, নিজের মেয়েকে তিনি বিশাল যৌতুক দিতে পারলেও–দশ সহস্র সোনার মোহর–তাঁর নিজের কোনো জমি, কোনো বিশাল মহল ছিল না। শের আফগান অন্য দিকে প্রাচীন এক মোগল অভিজাত বংশের সন্তান, তাঁর প্রপিতামহ বাবরের সাথে, প্রথম মোগল সম্রাট, তার হিন্দুস্তান অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। মেহেরুন্নিসা তাঁর আসন্ন বিয়ের প্রস্তুতির জন্য সে যুবরাজকে–বা সম্রাটকে যা এখন তিনি–জোর করে নিজের মনের এক কোণে সরিয়ে দিয়েছিল: সত্যি হতে পারতো এমন এক মধুর বাঁধনহারা কল্পনা।
গরুর গাড়িটা সহসা সশব্দে কম্পিত হয়। মেহেরুন্নিসা ভাবে, গাড়ির সামনের কোনো একটা চাকা হয়ত বড় কোনো শিলাখণ্ডের সাথে ধাক্কা খেয়েছে। এই যাত্রাটা যখন শেষ হবে সে তখন আন্তরিকভাবেই খুশি হবে।
*
মেহেরুন্নিসা তাঁর আব্বাজান তার জন্য তাবরিজ থেকে সম্প্রতি আগত এক বণিকের কাছ থেকে পার্সী কবি ফেরদৌসের সংগৃহীত কবিতার যে খণ্ডটা ক্রয় করেছেন একপাশে সরিয়ে রাখে, উঠে দাঁড়ায় এবং আড়মোড়া ভাঙে। কোনো একটা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে, সে তার আব্বাজানের বাসার সমতল ছাদে উঠতে শুরু করে, মেহেদী দেয়া নাঙা পায়ের নিচে পাথরের নিচু ধাপের উষ্ণতা সে দারুণ উপভোগ করে। সে ছাদে উঠে প্রথমেই উত্তরের দিকে তাকায়। তুষারাবৃত পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে সেখানে শহরের তত্ত্বাবধায়নে পাহাড়ের রুক্ষ চূড়ায় স্থাপিত ভয়ালদর্শন দূর্গপ্রাসাদ অবস্থিত।
সে গৌড়ে থাকাকালীন সময়ে প্রায়ই এই স্থাপনাটার কথা ভাবতো–এর নিরেট শক্তিশালী দেয়ালের ক্ষুদ্রাকৃতি রন্ধগুলোর কাবুলের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা চোখের সাথে কি ভীষণ মিল। দূর্গপ্রাসাদটা যদিও শাসনকর্তার বাসভূমি, তাঁর আব্বাজান তাকে বলেছে স্থাপনাটার কোথাও বিলাসিতার নামগন্ধও খুঁজে পাওয়া যাবে না–বাবরের আগমনের বহু পূর্বে নির্মিত পাথরের শীতল একটা দূর্গ যেখান থেকে বাবর তাঁর হিন্দুস্তান অভিযান সূচনা করেছিলেন। সে যাই হোক তার ইচ্ছা এমন বিশাল একটা উচ্চাকাঙ্খ যেখানে অঙ্কুরিত হয়েছিল সেই স্থানটার ভেতরটা সে যদি একবার ঘুরে দেখতে পেতো। বিজয়ের অভিপ্রায়ে আয়োজিত যুদ্ধযাত্রায় দূর্গপ্রাসাদের ভিতর থেকে মোগল সৈন্যের স্রোত বের হয়ে আসছে যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বদলে দেবে নিশ্চয়ই সেটা দেখার মতই একটা দৃশ্য ছিল? নিজের উচ্চাকাঙ্খকে বাস্তবে রূপান্তরিত হতে দেখে বাবরের অভিব্যক্তি কেমন হয়েছিল?
