কক্ষের বাইরে থেকে বেশ কয়েকটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে–শবাধারের নির্মাতারা সম্ভবত শবদেহের মাপ নিতে এসেছে–মেহেরুন্নিসা জোর করে এসব ভাবনা থেকে নিজেকে সরিয়ে আনে। আগামী দিনগুলোতে সে অবশ্যই তার নিজের এবং তাঁর মেয়ের প্রতি কোনো ধরনের হুমকির বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে একজন শোকাতুর বিধবার ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে। তার পরিবারের সম্মানের বিষয়টা এর সাথে জড়িয়ে আছে। সে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কৃত্যানুষ্ঠান একজন বিবেকবান স্ত্রীর মতই পালন করবে এবং তাকে দেখে কারো মনে কোনো ধরনের সন্দেহের উদ্রেক হবে না যে নিজের অন্তরে সে মুক্তির আনন্দ ছাড়া কোনো রকমের দুঃখ অনুভব করছে না।
*
জাহাঙ্গীরের নিভৃত কক্ষে ধুলিতে আচ্ছাদিত চুল নিয়ে ভ্রমণজীর্ণ বার্থোলোমিউ হকিন্স উপস্থিত হয়। যদিও মাঝরাত অতিক্রান্ত হতে চলেছে, ফিরিঙ্গি লোকটার আগমনের সংবাদ শুনে জাহাঙ্গীর তার খবরের জন্য অস্থির হয়ে রয়েছে।
‘বেশ, কি অবস্থা বলো?
‘সুলতান, কাজটা সম্পূর্ণ হয়েছে। আমি নিজ হাতে তার কণ্ঠনালী চিরে দিয়েছি।’
‘কেউ তোমাকে দেখে ফেলেনি তো?
‘তাঁর শয্যাসঙ্গী এক রমণী ছাড়া আর কেউ দেখতে পায়নি।’
জাহাঙ্গীর পলকহীন চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, মুখে সহসা ভীতিবিহ্বল অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। তুমি তার কোনো ক্ষতি করোনি?
না, সুলতান।
‘তুমি পুরোপুরি নিশ্চিত?
‘আমি আমার জীবনের দিব্য করে বলতে পারি।’
বার্থোলোমিউর চেহারায় ফুটে উঠা বিমূঢ়তা জাহাঙ্গীরের দৃষ্টি এড়ায় না। স্পষ্টতই বোঝা যায় লোকটা সত্যি কথাই বলছে। সে ক্রমশ স্বস্তির সাথে শ্বাস নিতে আরম্ভ করে। তুমি তোমার দায়িত্ব ভালোমতই পালন করেছে। আগামীকাল সকালে আমার কচিদের একজন তোমাকে তোমার অর্থ পৌঁছে দেবে…’ তাঁর মনে সহসা অন্য একটা ভাবনা খেলা করতে সে কথা শেষ করে না। তুমি এখন কি করবে বলে ঠিক করেছো? নিজের দেশে ফিরে যাবে?
‘সুলতান, আমি ঠিক নিশ্চিত নই।’
‘তুমি যদি আমার দরবারে অবস্থান করো তাহলে আমি তোমাকে আরও অনেক কাজ দিতে পারি। তুমি যদি আমার অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমত পালন করো যা তুমি ইতিমধ্যেই একবার করেছো, তুমি নিজের জাহাজ কিনে দেশে ফিরে যাবার মত ধনী আমি তোমায় করে দিতে পারি।’ বার্থোলোমিউ হকিন্সের রোদে পোড়া মুখ থেকে তার সমস্ত ক্লান্তি মুছে গিয়ে সহসা তাঁর চোখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। জাহাঙ্গীর মনে মনে ভাবে, সে একসময় যেমন বিশ্বাস করতো মানুষকে বুঝতে পারাটা আসলে ততটা কঠিন নয়।
*
শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক গালিচা আর পশমের কম্বল থাকা সত্ত্বেও, মেহেরুন্নিসাকে খাইবার গিরিপথের ভিতর দিয়ে কাবুল অভিমুখে বহনকারী গরুর গাড়িটা মোটেই আরামদায়ক ছিল না। সে বাংলা থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যাত্রাটা কখন শেষ হবে সেই অপেক্ষা করছে। তাঁর মেয়ে লাডলী বেগম, ফারিশার কোলে মাথা রেখে, মেয়ের লালনপালনের জন্য নিয়োজিত পার্সী মহিলা, যে জন্মের সময় থেকে তাঁর তত্ত্বাবধায়নের দায়িত্বে রয়েছে, অঘোরে ঘুমিয়ে আছে। বাচ্চা মেয়েটা নদীপথে নৌকায় গঙ্গার উপর দিয়ে পশ্চিমমুখী এবং তারপরে যমুনা নদীর উপর দিয়ে উত্তরমুখী যাত্রা খুবই উপভোগ করেছিল, কিন্তু শেষ ছয়শ মাইল স্থলপথে ভ্রমণের জন্য তাঁরা দিল্লির কাছে নৌকা থেকে অবতরণের পর থেকেই মেয়েটা ক্রমশ খিটখিটে হয়ে উঠেছে। গরুর গাড়ির ছইয়ের অভ্যন্তরে চতুর্দিক মোটা পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকায়, ভিতরটা শ্বাসরুদ্ধকর আর অন্ধকার। ছয় বছরের লাডলী বেগমের এখনও বোঝার বয়স হয়নি যে তাঁদের সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে অবশ্যই পর্দা টানা থাকতে হবে। দিনের শেষে যাত্রা বিরতি করতে যখন অস্থায়ী ছাউনি স্থাপন করা হয় মেয়েটা কেবল সেই সময়টুকু খানিকটা উপভোগ করে এবং কাঠের উঁচু অস্থায়ী কাঠামো দিয়ে মেয়েদের জন্য পৃথক করা স্থানে সে তখন কিছুক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করতে পারে।
কিন্তু তারা অন্ততপক্ষে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। তারা মওসুমের প্রথম তুষারপাতের পূর্বেই গিরিপথ অতিক্রম করবে। শীতের প্রকোপ কাবুলে ভীষণ তীব্র। মেহেরুন্নিসার তাঁর বাবার বাড়ির ছাদের প্রান্তদেশে মানুষের হাতের মত মোটা ঝুলন্ত তুষারিকার কথা এখনও মনে আছে এবং শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের বাইরে তুষার শুভ্র বিস্তৃর্ণ অঞ্চলে মাঝে মাঝে খাবারের সন্ধানে ক্ষুধার্ত নেকড়ে ছাড়া আর বেশি কিছু চলাফেরা করতো না। যদিও বাংলার উষ্ণ আর স্যাঁতসেঁতে বাতাসের মাঝে গালে কনকনে শীতল বাতাসের স্পর্শ পেতে এবং শ্বাস নেয়ার সময় হিমশীতল বাতাসের কুণ্ডলী দেখতে তার বহুবার ইচ্ছে হয়েছে।
সে যখন গৌড় ত্যাগ করে রওয়ানা হয়েছিল তখনও শের আফগানের হত্যাকারীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নি এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের অভিপ্রায় সম্বন্ধেও কোনো কিছু জানা যায় নি। পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ থাকায় সে স্বস্তি পেয়েছিল এবং একই সাথে গৌড় এখন তাদের থেকে বহুদূরে থাকায় সে খুশি। তাঁর দীর্ঘ যাত্রার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি তাঁর আব্বাজানই গ্রহণ করবেন বলে সে আশা করেছিল এবং সে কারণেই তিনি যখন তাকে চিঠি লিখে জানান যে গৌড়ের পশ্চিমে গঙ্গার তীরে মুঙ্গের দূর্গ থেকে রাজকীয় সৈন্যের একটা বহর কাবুল পর্যন্ত পুরোটা পথ তার সাথে অবস্থান করবে সে তখন সত্যিই বিস্মিত হয়েছিল। মহামান্য সম্রাট তোমার দুঃখ ভারাক্রান্ত পরিস্থিতিতে তোমার জন্য শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁর ইচ্ছা তুমি দ্রুত আর নিরাপদে তোমার পরিবারের কাছে ফিরে আসো, তার আব্বাজান চিঠিতে লিখেছিলেন। সম্রাট আমাকে আমার প্রত্যাশার অতীত অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। তোমার জন্য আমার আশীর্বাদ রইল। চিঠিতে গিয়াস বেগের দস্ত খত আর কাবুলের কোষাধ্যক্ষের বিশাল সীলমোহর দিয়ে সেটা বাঁধা ছিল।
