শহরের রাস্তায় পৌঁছাবার পরে সে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায়। সে শের আফগানের জমাট রক্ত রঞ্জিত নিজের তূর্কী খঞ্জরটা তুলে নিয়ে সেটায় আলতো করে চুমু দেয়। সে এখন সহস্র মোহরের অধিকারী।
১.০৩ এক বিধবা নারী
‘আপনার স্বামীর মৃতদেহ গোসল করিয়ে আমরা তাকে দাফনের জন্য প্রস্তুত করেছি, হেকিম এসে বলেন। আমি ভেবেছিলাম যে আমরা তাকে কফিনে শোয়াবার পূর্বে আপনার আদেশ অনুযায়ী সবকিছু যে ঠিকমত পালিত হয়েছে আপনি সে বিষয়ে নিজেকে নিশ্চিত করতে চাইবেন।’
‘ধন্যবাদ।’ মেহেরুন্নিসা সামনে এগিয়ে আসেন এবং তাঁর স্বামীর মৃতদেহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। অনুগ্রহ করে আমাকে একটু একা থাকতে দিন…’ তাকে যখন সবাই একা রেখে যায় সে মৃতদেহের উপর ঝুঁকে আসে এবং শের আফগানের মুখটা খুটিয়ে দেখে, যা এমন নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করা একজন লোকের তুলনায় বেশ প্রশান্ত দেখায়। হেকিম আর তার সহকারীরা মৃতদেহ পরিষ্কার করার সময় কর্পূর দেয়া যে পানি ব্যবহার করেছে মেহেরুন্নিসা তাঁর রুক্ষ গন্ধ টের পায়।
‘আপনাকে এভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে বলে আমি সত্যিই দুঃখিত, সে ফিসফিস করে আপন মনে বলে, কিন্তু আমি মোটেই দুঃখিত নই আপনার কবল থেকে আমি মুক্তি পেয়েছি। আততায়ী যদি আপনার বদলে আমায় হত্যা করতো আপনি হয়তো ব্যাপারটা পরোয়া করতেন না। সে এক মুহূর্তের জন্য তার স্বামীর গালে আঙুলের অগ্রভাগ দিয়ে স্পর্শ করে। ‘আপনার ত্বক এখন শীতল কিন্তু আপনি সবসময়ে আমার এবং আমার কন্যার প্রতি শীতল অভিব্যক্তি প্রদর্শন করেছেন, ছেলে না হয়ে জন্মাবার জন্য আপনার কাছে যার কোনো গুরুত্বই ছিল না…’
মেহেরুন্নিসা চোখের কোনে কান্নার রেশ অনুভব করে, কিন্তু এই কান্না শের আফগানের জন্য নয়। সে যদিও আত্ম-করুণা অপছন্দ করে তবুও অক্ষর উপস্থিতি তাঁর নিজের জন্য এবং এমন একজন লোকের সাথে অতিবাহিত জীবনের নষ্ট সময়ের জন্য যে তার দেয়া যৌতুক কুক্ষিগত করার পরে তাকে নিজের বাসনা আর ক্ষমতা প্রদর্শন করার একটা বস্তুতে পরিণত করেছিল। লোকটার সাথে যখন তাঁর বিয়ে হয়েছিল তখন তার বয়স মাত্র সতের বছর। তাঁর প্রতি বিয়ের পরে লোকটার নিশ্চেতন উদাসীনতা বা–সে যদি কখনও অভিযোগ করার স্পর্ধা দেখাত–তাঁর রীতিবিবর্জিত আর দুর্বিনীত নিষ্ঠুরতার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে এবং সে অসুস্থবোধ করে। আততায়ীর হামলার পরে ছয় ঘন্টাও এখনও অতিবাহিত হয়নি। তাঁর মানসপটে পুরো দৃশ্যটা এখনও দগদগে আর প্রাণবন্ত হত্যাকারীর চোখ-পারস্যের মার্জারের মত ধুসর নীল রং–সে যখন তাঁর শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তার খঞ্জরের ফলার রূপালী ঝিলিক, শের আফগানের কণ্ঠনালীর ক্ষতস্থান থেকে তার নগ্ন দেহে ছিটকে আসা উষ্ণ লাল রক্ত, তাঁর জীবন প্রদীপ নিভে যাবার ঠিক আগ মুহূর্তে তার স্বামীর মুখে ফুটে উঠা নিখান বিস্ময়। পুরো ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটে গিয়েছিল যে সে তখন ভয় পাবার সময়ই পায়নি, কিন্তু এখন যখন তার মনে হয় যে খুনী ইচ্ছা করলেই নিজের রক্তাক্ত খঞ্জর তার দিকে তাক করতে পারতো সে শিহরিত হয়। তরুণ দ্বাররক্ষীকে হত্যা করার সময় আততায়ী ক্ষনিকেন জন্য দ্বিধা করে নি…
অনুগত সৈন্যরা ইতিমধ্যে শহর তন্ন তন্ন করে হত্যাকারীর সন্ধান করেছে। তাঁর বর্ণনা থেকে একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে হত্যাকারী যেই হোক লোকটা ভিনদেশী। একজন নীল চোখঅলা লোকের সন্ধান ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছে–কারও মতে লোকটা পর্তুগীজ-শহরের সরাইখানায় লোকটা গত বেশ কয়েকদিন ধরেই অবস্থান করছিল কিন্তু এখন একেবারে যেন বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে… গ্রীষ্মের নিদাঘ তপ্ত দিন হওয়া সত্ত্বেও মেহেরুন্নিসা উষ্ণতার জন্য নিজেকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে, সে তাঁর স্বামীর মৃতদেহের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ায় এবং সে যখন কিছু চিন্তা করতে চায় তখন যেভাবে পায়চারি করে সেভাবে হাঁটতে থাকে। তার কাছে হত্যাকারীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার অভিপ্রায়। হত্যাকাণ্ডটা কি বড় কোনো অভ্যুত্থানের পূর্বাভাষ? গৌড় কি অচিরেই আক্রমণের সম্মুখীন হবে? যদি তাই হয়, তাহলে তাঁর নিজের এবং তাঁর কন্যার জীবনও হয়তো হুমকির সম্মুখীন হবে।
বা এমনও হতে পারে শের আফগানের মৃত্যু কারো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার ফসল? তাঁর স্বামী প্রচুর শত্রু তৈরি করেছিলেন। সে প্রায়ই তার কাছে দম্ভোক্তি করতে কীভাবে সে নিজেকে ধনী করতে রাজকীয় অর্থ তছরূপ করার পাশাপাশি প্রজাদের কাছ থেকে নিজের এক্তিয়ারের বেশি খাজনা আদায় করেছে। সে তাকে আরও বলেছিল গৌড়ের উত্তরের ডাকাত সর্দারদের অবাধে ডাকাতির সুযোগ দিয়ে কীভাবে তাঁদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছিল, এবং মেহেরুন্নিসা জানে যে গত বর্ষা মওসুমে বৃষ্টি শুরু হবার ঠিক আগ মুহূর্তে, বেশ কয়েকজন ধনী বণিক আগ্রায় অভিযোগ জানাতে তাঁদের চাপে পড়ে, সে তার কথার বরখেলাপ করে অবিশ্রান্তভাবে ডাকাতদের ধাওয়া করতে শুরু করেছিল এবং সে যাদের হত্যা করেছিল হুশিয়ারী হিসাবে তাদের ছিন্ন মস্তক শহর রক্ষাকারী প্রাচীরের উপরে গেঁথে রেখেছিল। শের আফগান নিহত হওয়ায় অনেক লোকই খুশি হয়েছে, কিন্তু তাকে তার নিজের শয়নকক্ষে হত্যা করার মত সাহস কার হতে পারে?
