সে তাঁর আবেগহীন সৎ-ভাইয়ের দিকে, এইসব দুর্ভোগের কারণ, তাকিয়ে থাকার সময় তার ভিতরে ক্রোধ পুঞ্জীভূত হতে থাকে, এবং সে তাকে চড় মারার জন্য হাত তুলে। কিন্তু তারপরে কি মনে হতে সে নিজেকে নিরস্ত করে। কি লাভ হবে? সে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কিছু করবে না। তোমায় বুরহানপুরের ভূগর্ভস্থ কারাপ্রকোষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে তুমি আমার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবে। আমাদের আব্বাজান যেমন একবার করেছিলেন তেমনি ক্রোধের বশবর্তী হয়ে আমি তোমার বা তোমার সৈন্যদের শাস্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না।
‘তোমার জন্য কোনো ধরনের হুমকি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি আমি দিতে পারবো না। আমি নিজেকে চিনি। আমার মাঝে যতক্ষণ প্রাণ থাকবে ততক্ষণ উচ্চাকাঙ্খও থাকবে… আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত, খসরু উত্তর দেয়, তার মুখ এখনও ভাবলেশহীন কিন্তু কিছুক্ষণ পরে সামান্য নমনীয় কণ্ঠে সে জানতে চায়, জানি হয়তো আমার সাথে বুরহানপুরে যেতে পারে?
খুররম অনুরোধটা নাকচ করতে যাবে এমন সময় আরজুমান্দ এবং তার জন্য নিজের অনুভূতির কথা তার মনে পড়ে। তার নিজের স্ত্রীর জন্য তাঁর ভালোবাসার মানে সে তার সৎ-ভাইয়ের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। হ্যাঁ। তুমি যতই তার অনুপযুক্ত হও, আমি তোমার অনুরোধ কেবল তাঁর কথা ভেবেই, তোমার কথা নয়, মঞ্জুর করছি।’
২.১০ পিতার যত অনৈতিকতা
লাহোর, জানুয়ারি ১৬২৮
মেহেরুন্নিসা রাভি নদীর তীর দেখতে পাওয়া যায় প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় নিজের আবাসন কক্ষে মখমল মোড়া নিচু একটা ডিভানে বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন। তার তলবে সাড়া দিয়ে লাহোরের দিকে নিজেদের বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসা অনুগত রাজাদের কাছ থেকে আগত সর্বশেষ প্রতিবেদন পড়ে রয়েছে। শাহরিয়ারের নাম উল্লেখ করেই যদিও তলব পাঠানো হয়েছে, যাকে চারমাস আগে লাহোরের মসজিদে শুক্রবারের জুম্মার নামাজের সময় সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে, এবং সঙ্গত কারণেই একইভাবে তাকে সম্বোধন করেই উত্তরগুলো এসেছে কিন্তু তার আব্বাজান যতটা আগ্রহ প্রদর্শন করতে সে সেগুলোর প্রতি তাঁর কিয়দংশ আগ্রহও দেখায় না। জাহাঙ্গীরের কথা স্মরণ করতে মেহেরুন্নিসা শোক আর দুঃখ অনুভব করে যা তাঁর মৃত্যুর পরে তাকে কখনও পুরোপুরি ছেড়ে যায় নি আবার বাড়তে শুরু করে। এই আবেগের গভীরতা আর অটলতা তাকে বিস্মিত করেছিল যতক্ষণ না সে বুঝতে পারে তার জন্য জাহাঙ্গীরের ভালোবাসা কতটা ব্যাপক ছিল। নিজের স্বাধীনতার প্রতি তাঁর গর্ব সত্ত্বেও সে তাঁর প্রতি নির্ভরশীল ছিল ঠিক যেমন তিনি তার উপরে নির্ভরশীল ছিলেন। সে তাকে এই কারণেই তার ক্ষমতার সাথে তাকেও এজন্য ভালোবাসতো।
সে যতটা আন্দাজ করেছিল শাহরিয়ার শাসক হিসাবে তারচেয়েও দুর্বল হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করে, বাহ্যিক আড়ম্বর আর অহমিকার কাছে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করেছে। সে দিনের বেশিরভাগ সময় নিজের আপাতস্বীকৃত সুদর্শন দেহসৌষ্ঠবে ধারণের জন্য পোষাক আর অলঙ্কার নির্বাচনে ব্যয় করে অথবা তারই মত নির্বোধ সঙ্গীদের নিয়ে চটুল আমোদপ্রমোদ আর শিকারে ব্যস্ত থাকে। সাম্রাজ্যের কোনো বিষয় তাকে একেবারেই বিব্রত করে না। মেহেরুন্নিসার এজন্য আনন্দিত হওয়া উচিত ছিল কিন্তু বস্তুতপক্ষে এটা সন্তুষ্টিরও অযোগ্য। সে যখন তাঁর পরামর্শদাতাদের নিয়ে বৈঠকে বসে তখন সরকারি আর সামরিক উভয় বিষয়ে তাঁর অজ্ঞতা এত নগ্ন আর শোচনীয়ভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে এর ফলে তার উপরে অনুগামীদের আস্থা আর বিশ্বাস চোট খায়। মেহেরুন্নিসা লাডলির সাহায্যে যতটা সহজভাবে সম্ভব করে তাকে যে সারসংক্ষেপ আর পরামর্শ সরবরাহ আর সেগুলো পুনরাবৃত্তি করে সে হয় সেগুলোর প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেয় না অথবা পরামর্শদাতাদের সামনে স্নায়বিক চাপের কারণে সামান্য তাঁর যতটুকু বুদ্ধি রয়েছে সেটুকুও তাকে একলা ফেলে ঘুরতে বের হয়।
মেহেরুন্নিসা আরো একবার নারী হবার কারণে তার ওপরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার জন্য গভীরভাবে আক্ষেপ প্রকাশ করে। সে যদি কেবল পরামর্শদাতাদের বৈঠকে অংশ নিতে পারতো… কিন্তু সে জানে সে সেটা পারবে না, উচিতও হবে না, অনর্থক আক্ষেপ বা হতাশায় কালক্ষেপণ। খুররম যদিও খসরুকে পরাজিত করেছে আর লাহোরের উদ্দেশ্যে আপাত অনুকম্পাহীনভাবে এগিয়ে আসছে তারপরেও করদ রাজ্যের রাজা আর অগ্রগণ্য অভিজাতদের অনেকেই উত্তরাধিকারজনিত বিরোধের ফলাফল সম্বন্ধে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা তারপক্ষে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। বস্তুতপক্ষে, যদি তার সমর্থকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত চিঠির বক্তব্য বিশ্বাস করতে হয়, আরো অনেক সশস্ত্র যোদ্ধার দল লাহোরে এসে তার বাহিনীর সাথে অচিরেই যোগ দেবে। তার সাথে যারা ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছে তাদের সাথে সাথে আর বেশ ভালো পরিমাণ অর্থপ্রদানের জন্য সে লাহোরের বিশাল কোষাগারের সম্পদ নিয়োগ করেছে, সেই সাথে খুররম পরাজিত হবার পরে আরও দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। লাহোরের চারপাশে যদিও কোনো নিরাপত্তা প্রাচীর নেই, শাহরিয়ারের আধিকারিকেরা তাঁর নির্দেশনায় নদীর তীরে অবস্থিত প্রাসাদকে সুরক্ষিত দুর্ভেদ্য করার কাজে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে, প্রাসাদের চারপাশে মাটি আর কাঠের শক্ত চোখা খুঁটার সাহায্যে শক্তিশালী বেড়া নির্মিত হয়েছে এবং তাদের কাছে লভ্য সবধরনের কামানের জন্য সেখানে বিপুল সংখ্যক কামানের মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য শস্যের সাথে বারুদ আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণও বিপুল পরিমাণে মজুদ করা হয়েছে। সে যদি উন্মুক্ত প্রান্তরে খুররমকে মোকাবেলা করতে শাহরিয়ার আর তাঁর সেনাপতিদের আকস্মিক নিষ্ক্রমণ থেকে বিরত রাখতে পারে তাহলে খুররমের বাহিনী যখন প্রথম আক্রমণ করবে তখন তাকে প্রতিরোধ এবং সেই সাথে নিজেদের নিশ্চায়ক আক্রমণ সূচনা করার পূর্বে তার বাহিনীকে হীনবল করার একটা ভালো সম্ভাবনা তাদের রয়েছে। শাহরিয়ারের মাঝে এবং তার মাধ্যমে তাঁর সেনাপতিদের মাঝে অবরোধ মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট সংকল্প আর আস্থা সঞ্চারিত করাই এখন তার মূল কাজ যাতে তারা বিশ্বাস করে যে তারাই শেষে বিজয়ী হবে। সৌভাগ্যবশত সে সেনাবাহিনীর জন্য অনুকূল সামরিক সত্ত্বা আর আস্থা যথেষ্টই ধারণ করে।
