সে আরো অনুধাবন করেছে যে দারা শুকোহ আর আওরঙ্গজেব তাঁর কাছে থাকায় এটা তাকে একটা বাড়তি সুবিধা দান করেছে। কামরান তাঁর সৎ-ভাই সম্রাট হুমায়ুনের বিরুদ্ধে নিজের অসংখ্য বিদ্রোহের মাঝে একবার হুমায়ুনের শিশু সন্তান, ভবিষ্যত সম্রাট আকবরকে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একবার কাবুলের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের উপর প্রদর্শন করেছিল হুমায়ুনকে শহর আক্রমণ করা থেকে নিরস্ত করতে যা আরেকটু হলেই সফল হতে চলেছিল। সে অবশ্যই এতদূর যাবে না–অন্ততপক্ষে যতক্ষণ না মারাত্মক জরুরি অবস্থার সৃষ্টি হয়–কিন্তু আকবরের গল্পটা তার চেয়ে খুররম আরো ভালো করে জানে বিধায়, সে জানে যে সে এমনটা করতে পারে এই ভাবনাটা খুররমের মনে কি ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাচ্চা দুটো অবশ্য ইতিমধ্যে আরেকটা উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে সাহায্য করেছে–সেটা হল শাহরিয়ারকে কাছে রাখা এবং পৃথক শান্তি চুক্তি সম্পাদনে তার সামান্যতম প্রচেষ্টা সম্ভাবনাকেও নাকচ করে দেয়া। লাডলিকে একজন মধ্যস্থতাকারী হিসাবে ব্যবহার করে–যে সৌভাগ্যবশত মায়ের প্রতি তাঁর নিরঙ্কুশ আনুগত্য থেকে এখনও সামান্যতম বিচ্যুতির লক্ষণও প্রকাশ করে নি–সে শাহরিয়ারকে নিশ্চিতভাবে বুঝিয়েছে যে দুই কিশোর যুবরাজ এতটাই আকর্ষণীয় আর অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা তাঁদের এতই বেশি যে দরবারে তাঁদের প্রকাশ্য উপস্থিতি, তাঁদের আব্বাজানের সাথে তাদের চেহারার প্রচুর মিল থাকায় তাঁর অমাত্যদের মাঝে তার স্মৃতি জাগরত করে, তার নিজের অবস্থানের জন্য মানহানিকর হিসাবে প্রতিপন্ন হতে পারে। সে সেই সাথে। তাকে পরামর্শের ছলে বুঝিয়েছে যে তারা হয়ত পালিয়ে যেতে পারে বা তাদের উদ্ধার করার কোনো প্রচেষ্টা হতে পারে। শাহরিয়ার এরফলে অত্যন্ত ব্যগ্র হয়ে উঠে দু’জনকে প্রাসাদের একটা নির্জন অংশে আলোবাতাসহীন দুটো পৃথক কক্ষে দিনের চব্বিশ ঘন্টা প্রহরাধীন অবস্থায় তাদের আটকে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
মেহেরুন্নিসা নিজের অবস্থানের শক্তি সম্পর্কে অবগত থাকায় উৎসাহিত হয়ে মনে মনে ভেবে রাখা কিছু কূটনৈতিক পদক্ষেপ সম্বন্ধে চিন্তা করে। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলো যদি খুররমের বিরুদ্ধে শাহরিয়ারের পক্ষে বিরোধে হস্তক্ষেপ করে তাহলে ভূখণ্ডগত ছাড়ের প্রস্তাব দিয়ে তার নিজের–নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে শাহরিয়ারের উচিত প্রতিনিধি প্রেরণ করা? কান্দাহার আর পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ডের বিনিময়ে পারস্যের শাহ খুশি মনে এটা করবে। দাক্ষিণাত্যের সুলতানদের হয়ত তাদের বাজেয়াপ্ত করা ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেয়ার প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারে–তার অবস্থান একবার সংহত হলে যা তারা পুনরায় দখল করতে পারবে এবং তাদের সেনাপতি মালিক। আম্বারের বয়স হলেও এখনও প্রাণবন্ত রয়েছেন, হয়তো তাদের পক্ষে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দান করতে পারেন। খুররম আর তার ভিতরে অমীমাংসিত বিরোধ রয়েছে। পর্তুগীজ বা ইংরেজরা হয়তো শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে তাদের জাহাজে মারাত্মক আধুনিক কামান সজ্জিত করে তাদের নাবিকদের প্রেরণ করতে পারে। যাচাই করে দেখার জন্য অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। শাহরিয়ারের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, সে তাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রাখতে চায়। আর তাছাড়া, জাহাঙ্গীরের হয়ে এতগুলো বছর সেই শাসন করেছে।
*
খুররম নিজের টকটকে লাল নিয়ন্ত্রক তাবুতে একটা নিচু টেবিলের চারপাশে আসফ খান আর মহবত খানের সাথে বসে রয়েছে। তাবুর পর্দাগুলো যদিও সোনালী দড়ি দিয়ে আটকে আটকানো রয়েছে, সে তারপরেও রাভি নদীর পানি বিকেলের সূর্যের আলোয় ঝলমল করতে দেখে এবং তার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে লাহোর প্রাসাদ যা এখন বৃত্তাকার প্রাচীর আর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্বারা আবৃত। সে টেবিলের উল্টোদিকে নিরুদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে বসে ভেষজ ঔষধিমিশ্রিত পানি সে বলেছে তার মাতৃভূমি পারস্যে বলকারী পানীয় হিসাবে এটা ভীষণ জনপ্রিয় চুমুক দিতে থাকা মহবত খানের দিকে তাকায়। তাঁদের প্রথম সাক্ষাতের সময় তারা দুজনেই আড়ষ্ট আর আনুষ্ঠানিক ছিল, বলার অপেক্ষা রাখে না দু’জনের ভিতরেই পারস্পরিক সন্দেহ কাজ করেছে, যা হয়ত প্রতিদ্বন্দ্বি সেনাপতিদের মাঝে প্রত্যাশিত যারা বহু বছর ধরে বিরুদ্ধ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছে। মহবত খান সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে নিজেকে আড়ালে রেখেছিল এবং পেছনে অবস্থান করেছে যতক্ষণ না আসফ খানের সহজিয়া উপস্থিতির কারণে যিনি খুররমের সাথে নির্দিষ্টস্থানে মিলিত হবার কিছুক্ষণ পূর্বে মহবত খানের সাথে যোগ দিয়েছেন, পুরো পারিপার্শ্বিকতা সহজ হয়ে উঠে। তারা দু’জনে এখন কোনো ধরনের সংবোধ ছাড়াই পেশাগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে সক্ষম হচ্ছে এমনকি কোনো বিশেষ কৌশলের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের সময় নিজেদের বৈরীতার সময়ের উদাহরণও তারা উল্লেখ করছেন। খুররম ভাবে, এটাই ভালো হয়েছে। খসরুর বাহিনীর উপরে তাঁর আক্রমণ একটা হঠকারী পদক্ষেপ ছিল এবং তাঁর লোকদের সাহসিকতার কারণেই সেবার তার পরাজয় এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। লাহোরে মেহেরুন্নিসা আর শাহরিয়ারের মোতায়েন করা বাহিনী অনেকবেশি শক্তিশালী এবং তাঁদের দক্ষতার সাথে নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খসরুর তড়িঘড়ি নির্মিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে অনেক উন্নত। তাকে অবশ্যই নিজের ব্যগ্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং যতটা কম সম্ভব সুযোগের প্রত্যাশা না করে যত্নের সাথে পরিকল্পনা করতে হবে।
