খুররম সহসা টের পায় যে খসরুর কিছু যোদ্ধা পালাতে শুরু করেছে, তাকে অনুসরণ করে গ্রামের ভিতরে প্রবেশ করা তার লোকেরা তাঁদের একেবারে কাছে অবস্থান করে পিছু ধাওয়া করছে। সে দম ফিরে পাবার মাঝেই কামরান ইকবালের লোকেরা শক্ত অবস্থানের সামনে যেখানে আক্রমণ করেছিল সেখান থেকে ভেসে আসা প্রচণ্ড লড়াইয়ের আওয়াজ শুনতে পায়। তার চোখ চারপাশে ঘুরতে থাকা ঝাঁঝাল থোয়ায় জ্বালা করতে থাকে। কয়েকটা বাড়ির তালপাতার ছাদে কামান কিংবা গাদাবন্দুকের স্ফুলিঙ্গের কারণেই নিশ্চয়ই আগুন ধরে গিয়েছে। আর এখন প্রবল বাতাসের ঝাপটা জ্বলন্ত পাতার টুকরো এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। পুরো গ্রামটা অচিরেই দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করবে।
‘খসরুর সৈন্যদের এবার পেছন থেকে আক্রমণ করা যাক- খুররম তাঁর চারপাশে সমবেত হতে শুরু করা লোকদের উদ্দেশ্যে বলে কিন্তু সে আর কিছু বলার আগেই যুদ্ধস্থলের দিক থেকে গ্রামের প্রধান সড়কের মাঝামাঝি বরাবর একটা ছোট গলি থেকে একদল অশ্বারোহী ছিটকে বের হয়ে আসে। খুররমের অশ্বারোহী যোদ্ধাদের দেখতে পেয়ে দলটার নেতা সরাসরি তাদের দিকে তরবারি উঁচু করে ধেয়ে আসে। শত্রুর দলটা তাঁদের দিকে ধেয়ে আসার মাঝেই খুররম ধোয়ার মাঝেই লক্ষ্য করে দলটার মাঝে একজন অশ্বারোহী রয়েছে যার ঘোড়ার দ্বিতীয় আরেকপ্রস্থ লাগাম রয়েছে। যা সামনে অবস্থিত একজন অশ্বারোহী ধরে রেখেছে। তাঁর আংশিক দৃষ্টিশক্তি সৎ-ভাই ছাড়া লোকটা আর কেউ হতে পারে না।
খুররম প্রধান লাগাম ধরে থাকা অশ্বারোহীর দিকে এগিয়ে যাবার জন্য তাঁর খয়েরী ঘোড়াটার পাঁজরে গুঁতো দেয়। লোকটা নিজের খালি হাতে ধরে থাকা তরবারি উঁচু করে এবং খুররমের প্রথম আঘাতটা ফিরিয়ে দেয় কিন্তু দ্বিতীয় আঘাতটা এড়িয়ে যেতে পারে না যা তাঁর কব্জির ঠিক উপর থেকে তার হাত প্রায় দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করলে সে তার হাতে ধরা লাগাম ফেলে দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে। খুররম সহজাত প্রবৃত্তির বশে দ্রুত নিচু হয়ে লাগামটা মাটিতে পড়ার আগেই ধরে ফেলে।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খসরুর ঘোড়াটাকে–ধুসর রঙের একটা মাদি ঘোড়া–হেঁচকা টানে সরিয়ে নিয়ে আসার মাঝেই খুররম চিৎকার করে বলে, ‘আমি, খুররম। খুসরু তুমি এবার আত্মসমর্পণ করো। আমি তোমায় বন্দি করেছি। তার সৎ-ভাই কোনো কথা বলে না। তোমার জন্য কি অনেক লোক মারা যায় নি, কেবল এখন না তোমার অন্যান্য বিদ্রোহ প্রচেষ্টার সময়? কথা বলো, খুররম আবার চিৎকার করে বলে, যদি কোনো কারণে যুদ্ধের হট্টগোলের আর আগুনে জ্বলতে থাকা ছাদের পটপট শব্দের মাঝে তার আগের কথাগুলো চাপা পড়ে গিয়ে থাকে সেজন্য এবার আগের চেয়ে জোরে। খুসরুর মুখাবয়ব প্রায় আবেগহীন দেখায়। কেবল তাঁর একটা মাত্র চোখই মনে হয় কিছুটা ভাব ফুটে রয়েছে। আপাতভাবে দৃষ্টিহীন বাকি চোখটায় ফাঁকা দৃষ্টি। তালপাতার ছাদ থেকে একটা জ্বলন্ত পাতা বাতাসে উড়ে তার পাশে আসতে তার ঘোড়াটা ঝাঁকি দিয়ে নিজের মাথা সরিয়ে নিতে, খসরু কথা বলে।
‘আমি আত্মসমর্পণ করছি।’
*
‘আমি মধ্য এশিয়ার তৃণভূমি থেকে আগত আমার পূর্বপুরুষদের প্রাচীন রীতি অনুসারে জীবনযাপণ করেছিঃ “সিংহাসন কিংবা শবাধার”। আমি এবার তৃতীয়বারের মত সিংহাসন দখলের চেষ্টা করেছি এবং ব্যর্থ হয়েছি। আমি দু’বার শবাধারের নিয়তি এড়িয়ে যেতে পেরেছি কিন্তু আমার সাহসী সহযোদ্ধারা যা পারে নি। আমি দ্বিতীয় প্রয়াসের পরে নিজের দৃষ্টিশক্তি বিসর্জন দিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী জানির ভালোবাসা না পেলে আমি হতাশার মাঝে পথভ্রষ্ট হতাম। আমি এখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। আমায় কেবল তাকে শেষবারের মত একটা চিঠি লেখার অনুমতি দাও।’
খুররমের সামনে, মাত্র বিশ মিনিট পরে, খসরু দাঁড়িয়ে থেকে দু’পাশ থেকে দু’জন প্রহরী আলতো করে তার হাত ধরে রেখেছে, সে একঘেয়ে সুরে কথা বলতে থাকে। তার সৈন্যরা তাঁর আত্মসমর্পণের আদেশ পালন করেছে এবং এখনও তাদের খোঁজা হচ্ছে আর তাঁদের পরিত্যক্ত অস্ত্রের স্তূপ জমে উঠেছে। খুররম যখন–তার মুখে এখনও ধোয়ার কালি লেগে রয়েছে এবং পরনের কাপড় আর দেহ এখনও যুদ্ধের ঘামে সিক্ত–তাঁর সৎ-ভাইয়ের দিকে তাকায় তাঁর কাছে এটা মনে হয় যে খসরু ইচ্ছাশক্তির চূড়ান্ত প্রয়োগ করে নিজেকে তার চারপাশে ঘটমান সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে, হাল ছেড়ে দিয়ে নিয়তি তার ভাগ্যে যা রেখেছে সেটা বরণ করার জন্য সে প্রস্তুত।
এই মুহূর্তে, খসরুর মত না, সে কোনোভাবেই এতটা নিস্পৃহ থাকতে পারে না। নিজের বিজয়ে উল্লসিত এবং সিংহাসনের জন্য তার আকাঙ্খা পূরণে এটা যা কিছু অর্থ বহন করে সব কিছুর সাথে তাঁর এত বিপুল সংখ্যক লোকের নিহত হবার দুঃখ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আহতদের ভিতরে কামরান ইকবালও রয়েছেন। গ্রামে তাঁদের সামনাসামনি হামলার প্রথম বিপর্যয়ের মুখে তিনি খুররমের লোকদের নতুনভাবে উজ্জীবিত করার সময় গাদাবন্দুকের সীসায় তাঁর বামহাত এমন জঘন্যভাবে গুঁড়িয়ে গিয়েছে যে হেকিম খুররমকে বলেছে অবিলম্বে কনুইয়ের নিচ থেকে তাঁর হাত কেটে বাদ দিলেই কেবল তাকে প্রাণে বাঁচান সম্ভব। তাঁরা ইতিমধ্যে নিজেদের শল্যচিকিৎসার শস্ত্রে শান দিতে আর রক্তপাত বন্ধ করার জন্য লোহা গরম করতে শুরু করেছেন। তার অল্পবয়সী এক কর্চির অবস্থা এরচেয়েও খারাপ। পাঁজরে তরবারির আঘাত নিয়ে মাটিতে পড়ে থাকার সময় একটা প্রায় আস্ত জ্বলন্ত তালপাতার ছাদ তার উপরে উড়ে এসে পড়েছে। খুররম যখন তাকে দেখতে গিয়েছিল তখন যন্ত্রণায় তার আর্তনাদ মানুষের চেয়ে বেশি পাশবিক মনে হয়, সে নিজেকে জোর করে বাধ্য করে তাঁর পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকাতে যেখানে চামড়া ফালিফালি হয়ে ঝুলে রয়েছে। হেকিম তাকে বলেছে তারা কেবল তাঁর ফোস্কা পড়া মুখে ফোঁটা ফোঁটা আফিম মিশ্রিত পানি দিয়ে বেহেশতের উদ্দেশ্যে তার যাত্রাকে কিছুটা সহনীয় করতে পারে। খুররম ভাবে, আল্লাহর কাছে দোয়া করি সেটা যেন তাড়াতাড়ি হয়।
