সোয়া এক ঘন্টা বা তারও পরে, খুররম দেখে তাঁর অশ্বারোহীরা, উঁচু কালো স্ট্যালিয়নে উপবিষ্ট স্থূলকায় কামরান ইকবালের নেতৃত্বে, তার ঠিক পেছনেই চারজন নিশানবাহক রয়েছে, গ্রাম অভিমুখে তাঁদের হামলার গতি বৃদ্ধি করছে। ধূলোয় খুররমের দৃষ্টি অস্পষ্ট হতে শুরু করতে সে নিজে এবার তাঁর প্রিয় খয়েরী রঙের একটা ঘোড়ায় উপবিষ্ট হয়ে তাঁর দু’হাজার সেরা অশ্বারোহীকে নেতৃত্ব দিয়ে দ্রুতবেগে বামদিকে ঘুরে গিয়ে গ্রামটা বৃত্তাকারে বেষ্টন করতে শুরু করে। ছোট কামানের চাপা শব্দ আর গাদাবন্দুকের ক্রমাগত পটপট শব্দ শীঘ্রই বোঝায় সে খসরু তার বাহিনীকে কামরান ইকবালের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ করেছে। ধূলো আর ধোয়ার কুণ্ডলীর মাঝে বিদ্যমান শূন্যস্থানের ভিতর দিয়ে খুররম দেখতে পায় যে তার সৎ-ভাইয়ের তোপচিরা নিশানাভেদে দারুণ পারদর্শী। কামরান ইকবালের সাথের লোকদের বেশ কয়েকজনের ঘোড়া ধরাশায়ী হয়েছে। বাকিগুলো আরোহীবিহীন অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তাঁদের লাগামগুলো ঝুলছে। খুররমের সহসা নিশানাবাহকদের একজনকে মনে হয় ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিতে চেষ্টা করছে; আক্রমণের মূল চালিকা শক্তি কেমন যেন খাপছাড়া প্রতিয়মান হতে শুরু করে। তারপরেই কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়ার মেঘে তাঁর দৃষ্টি পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে যায়।
খুররম সহসা সন্দেহের শরবিদ্ধ হবার যাতনা অনুভব করে। সে কি অতিরিক্ত আগ্রহ প্রদর্শন করে ফেলেছে, হয়তো হঠকারীতা হয়েছে শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে যখন সে তার ক্লান্ত লোকদের বিশ্রাম আর অপেক্ষা করার সুযোগ দিলে বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়া হতো? সে কি নিজের বাহিনীকে দুইবার বিভক্ত করে ভুল করেছে, প্রথমে মালবাহী শকটের বহরকে পাহারা দেয়ার জন্য শক্তিশালী একটা বাহিনী পেছনে রেখে এবং দ্বিতীয়বার দ্বিমুখী সাঁড়াশি আক্রমণের আদেশ দিয়ে? এসব চিন্তা করার জন্য এখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। সে এখন পশ্চাদপসারণ কিংবা পৃথক হবার চেষ্টা করলে আরো বেশি ভুল করবে। তার লোকেরা তাহলে খসরুর বাহিনী পাল্টা আক্রমণের মুখে পড়বে। সে রক্ষণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে। তাকে অবশ্যই বৃত্তাকারে ঘুরে এসে আক্রমণের সাফল্যের উপরে তার ভবিষ্যতকে ঝুঁকির সম্মুখীন করতে হবে। খসরুর লোকেরা যদিও প্রাণপণে লড়াই করছে এবং সামনের আক্রমণকারীদের মাঝে ব্যাপক হতাহতের জন্ম দিয়েছে, তাঁরা পেছন থেকে তার আক্রমণের সামনে অবশ্যই নিজেদের পশ্চাদপসারণের পথ বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়বে। আর তাছাড়া, কামরান ইকবাল আর তার সাথের সৈন্যরা সাহসী আর অভিযোদ্ধা যোদ্ধা। তার যদি সাময়িক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েও থাকে তারা দমে না গিয়ে বরং নতুন উদ্যমে আবার আক্রমণ করবে।
খুররম ইতিমধ্যে নহরের প্রান্তদেশের দিকে এগিয়ে চলেছে। অনেক বন্যপ্রাণীর পায়ের চিহ্ন দ্বারা ক্ষতবিক্ষত, নহরে পানির চেয়ে আঠালো খয়েরী কাদাই বেশি, সে ভাবতে ভাবতে হাতের ইশারায় নিজের লোকদের নহর অতিক্রমের ইঙ্গিত দিয়ে নিজের খয়েরী ঘোড়াটাকে সামনের দিকে অগ্রসর হবার জন্য তাড়া দেয়। সে অচিরেই অপর পাড় ধরে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে, পেছনে তার দেহরক্ষী আর বাকি যোদ্ধারা তাকে অনুসরণ করছে। সে অবশ্য ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখে যে বেশ কয়েকটা ঘোড়া কাদায় পড়ে রয়েছে, সম্ভবত তাদের খুর গভীর আঠালো কাদায় আটকে গিয়েছিল যখন তাঁদের অসতর্ক আরোহীরা তাদের অনর্থক চাবুকপেটা করেছিল।
সে মাথা ঘুরিয়ে পুনরায় সামনের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করে যে গ্রামের গরুর গোয়ালের নিচু বেষ্টনী আর মাত্র দুইশ গজ দূরে রয়েছে। দেয়ালের পিছনে লুকিয়ে থাকা তবকীরা উঠে দাঁড়িয়ে গুলি বর্ষণ করতে সে সহসা আগুনের ঝলক দেখতে পায়। গাদাবন্দুকের সীসার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে শিস তুলে তাঁর পাশ দিয়ে চলে যায়। তার আরেকজন অশ্বারোহী, কমলা রঙের পাগড়ি পরিহিত বিশাল দাড়ির অধিকারী এক রাজপুত যোদ্ধার কপালের ঠিক মাঝে একটা গুলি এসে বিদ্ধ হয়ে তাকে ঘোড়া থেকে ছিটকে পেছনের দিকে ফেলে দিলে লোকটা পেছন থেকে আগত ঘোড়ার খুরের নিচে দলিত হবার আগে ধূলোর ভিতরে বেশ কয়েকবার গড়িয়ে যায়। আগুনের ঝলক দেখে খুররম ভাবে দেয়ালের পিছনে কমপক্ষে পঞ্চাশজন তবকি লুকিয়ে আছে। কিন্তু তারপরেও, সে আর তার লোকেরা যদি জোরে ঘোড়া ছোটায় তাহলে তাঁরা দ্বিতীয়বার গুলি করার জন্য প্রস্তুত হবার আগেই তারা তাদের কাছে পৌঁছে যেতে পারবে। কিন্তু তারপরেই তাকে হতাশ করে তীরন্দাজের দল এবার দেয়ালের আড়াল থেকে বের হয়ে আসে এবং দ্রুত তীর নিক্ষেপ করেই আবার দেয়ালের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে ফেলে। একটা তীর যেন সময়কে স্তব্ধ করে দিয়ে প্রায় তাকে লক্ষ্য করেই ছুটে আসছিল। সে নিজের খয়েরী ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরার আগেই তীরটা এসে ঘোড়ার মাথার ছোট ইস্পাতের বর্মে আঘাত করে এবং পিছলে যায়। তীরের ধাক্কা আর আঘাতের কারণে সৃষ্ট অভ্যাঘাত ঘোড়ার অগ্রসর হবার গতিকে ব্যাহত করে এবং জন্তুটা একপাশে পিছলে যেতে শুরু করতে খুররম প্রাণপণে ঘোড়ার উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবার চেষ্টা করতে থাকে এবং গায়ের জোর দিয়ে লাগাম টেনে ধরে আর ঘোড়ার গলার কাছে নুয়ে এসে সে প্রায় ভেঙে পড়া মাটির দেয়াল লাফিয়ে টপকে যেতে সক্ষম হয়, যা সেখানে চারফিটের বেশি উঁচু হবে না। তার বেশির ভাগ লোকই সাফল্যের সাথে দেয়াল টপকে যায় কিন্তু তাদের ভিতরে অন্তত দু’জনের বাহনের সামনের পা দেয়ালের পিছনে রাখা গোবরের স্তূপের উপরে গিয়ে পড়তে সামনের পা ঘোড়ার দেহের নিচ থেকে পিছলে গিয়ে তাঁদের উদরের নিচের অংশ মাটির দেয়ালে আটকে যায় এবং পিঠের আরোহীরা তাঁদের মাথার উপর দিয়ে সামনের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়ে সজোরে মাটিতে আঁছড়ে পড়ে।
