হ্যাঁ। আমাদের তথ্য অনুযায়ী যদিও তাঁর চোখের পাতার সেলাই খুলে তাকে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে তাঁর হাকিমদের প্রচেষ্টা কেবল আংশিক সফল হয়েছে, স্পষ্টতই অন্যদের নিজের পক্ষে টানার ক্ষমতা তার এখনও নষ্ট হয়নি। গোয়ালিওরের সুবেদারকে সে দলে টেনেছে, যেখানে সে দীর্ঘদিন বন্দি অবস্থায় ছিল, এবং সেই সাথে স্থানীয় অনেক সেনাপতিও রয়েছে, এবং সে তৃতীয়বারের মত নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেছে।
‘আর সে তৃতীয়বারের মত ব্যর্থ হবে, খুররম বলে। খসরু নাছোড়বান্দার মতো এমন অসম্ভব উচ্চাশা কেন পোষণ করছে? সে যতটুকু নবায়িত দৃষ্টিশক্তি পেয়েছে সেটা এবং তাঁর বিশ্বস্ত স্ত্রী জানির ভালোবাসা, যে নিজে বহুবছর তার সাথেই বন্দিত্ব বরণ করেছিল, তৃপ্তি নিয়ে উপভোগ করছে না? খুররম ঠোঁট কামড়ে জিজ্ঞেস করার আগে, নিজের মনে ভাবে, আমার বিরোধিতা করার জন্য তাকে কেন অবশ্যই যুদ্ধযাত্রা করতে হবে, সে কতজন লোক নিয়োগ করতে সফল হয়েছে?
দশ হাজার সম্ভবত–যাঁদের অনেকেই আপনার আব্বাজানের বিরুদ্ধে তাঁর পূর্ববর্তী বিদ্রোহের সময় যারা নিহত হয়েছিল তাদের পুত্র আর ভ্রাতা। তারা গোয়ালিওরের অস্ত্রশালা আর কোষাগার লুট করেছে এবং তাই তাদের অস্ত্র কিংবা রসদের কোনো সমস্যা নেই।’
‘তাঁরা কি এখনও আগ্রা অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে?
‘হ্যাঁ। আমাদের গুপ্তদূতেরা জানিয়েছে তারা আমাদের অবস্থান থেকে প্রায় পঁচিশ মাইল পশ্চিমে এবং আগ্রা থেকে চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থান করছে।
‘শাহরিয়ার লাহোর ত্যাগের জন্য কোনো ধরনের উদ্যোগ না নেয়ায় এবং সেখানে তাঁর মোকাবেলা করার পূর্বে মহবত খান আর আসফ খান এবং তাঁদের সাথে আসা অতিরিক্ত বাহিনীর জন্য আমরা অপেক্ষা করলে আমরা বিচক্ষণতার পরিচয় দেব, আমার পরামর্শ হল যে আমরা প্রথমে খসরুর উচ্চাশা চিরতরে মিটিয়ে দেবো। আমরা আমাদের বেশিরভাগ মালবাহী শকট যদি এখানে রেখে যাই, আমরা তাহলে কি তাঁর সামনে যেতে এবং সে আগ্রা পৌঁছাবার আগে তাকে যুদ্ধে করতে বাধ্য করতে পারবো?
‘হা। গুপ্তদূতদের ভাষ্য অনুসারে সে সম্ভবত আগ্রা পৌঁছাবার আগে যতবেশী সম্ভব সমর্থক জড়ো করার আশায় দিনে আট মাইলের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে না। তার বাহিনী থেকে আমাদের পৃথক করে রেখেছে যে প্রান্তরটা সেটা মূলত সমভূমি যেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য নদী নেই, অশ্বারোহী তবকি আর তীরন্দাজ আর অশ্বারোহী যোদ্ধার সাথে আমরা যদি রণহস্তীও সাথে নেই তাহলেও আটচল্লিশ ঘন্টার ভিতরে আমরা তাকে পিছু ধাওয়া করে ধরে ফেলতে পারবো।’
‘বেশ তাহলে, আমরা এটাই করবো। আপনি এখানে মালবাহী শকট আর ভারি কামানগুলো পাহারা দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য রেখে যাবার বিষয়টা নিশ্চিত করবেন এবং অবিলম্বে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করেন।
*
খুররম তার ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে যে যুদ্ধ সেটা শুরু করার জন্য ব্যগ্র হয়ে তার বাহিনীর মূল সৈন্যসারি ছেড়ে নিজের কয়েকজন দেহরক্ষী সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায় যখন দুইদিন পরে মধ্যাহ্নের ঠিক আগ মুহূর্তে ঘামে ভেজা ধুসর রঙের একটা ঘোড়া নিয়ে তার গুপ্তদূতদের একজন আস্কন্দিত বেগে তার দিকে এগিয়ে আসে।
‘খসরুর লোকেরা সামনে অবস্থিত একটা গ্রামের চারপাশে নিজেদের জড়ো করছে। আমরা যা ভেবেছিলাম তারা সংখ্যায় তার চেয়েও বেশি–সম্ভবত বার হাজার বা সেরকম কিছু একটা। তারা যখন আমাদের অগ্রসর হবার বিষয়টা টের পায় তারা স্পষ্টতই সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামের খোয়ারের চারপাশের বৃত্তাকার নিচু মাটির দেয়াল এবং এমনকি গ্রামের মামুলি খেজুর-পাতার পর্ণকুটির যতটুকু সুরক্ষা দিতে সক্ষম তার সুবিধা গ্রহণ করবে। তারা কামানগুলো সুবিধাজনক স্থানে টেনে নিয়ে যেতে ব্যস্ত এবং গ্রাম থেকে কয়েকশ গজ সামনে তারা তীরন্দাজ আর তবকিদের ছোট একটা আড়াল স্থাপন করেছে।
খুররম গুপ্তদূতের প্রসারিত হাতের দিক অনুসরণ করে দাবদাহের অস্পষ্টতার মাঝে দেখে যে একটা ছোট নহরের দূরবর্তী তীর বরাবর সমতল ভূমির উপর অবস্থিত গ্রামটা ছোট আকৃতির যা বর্তমান শুকনো মওসুমে মূলত মাটির তৈরি বলে মনে হয়। লোকবলের দিক থেকে খসরুর সামান্য প্রাধান্য রয়েছে কারণ মালবাহী শকট পাহারা দেয়ার জন্য সে তার বাহিনীর উল্লেখযোগ্য একটা অংশ পেছনে রেখে এসেছে। তাঁর লোকেরা যদিও খসরুকে অতিক্রম করার যাত্রার কারণে ক্লান্ত এবং দিনটা চুল্লীর মত উত্তপ্ত, খুররম যুদ্ধের পরামর্শের জন্য বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতিরা এসে তাঁর সাথে মিলিত হবার জন্য অপেক্ষা না করে খসরুর বাহিনী নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ নির্মাণ সমাপ্ত করার আগেই তাদের আক্রমণ আর বিধ্বস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
‘অবিলম্বে আক্রমণ করার জন্য আমাদের অর্ধেক অশ্বারোহীদের বিন্যস্ত করার আদেশ কামরান ইকবালের কাছে পৌঁছে দাও। সে যখন সামনে থেকে গ্রামটা আক্রমণ করবে আমি আমাদের অবশিষ্ট অশ্বারোহীদের নিয়ে ছোট নহরটা অতিক্রম করবো গ্রামের পেছনে পৌঁছাতে এবং গ্রামের প্রতিরক্ষায় যারা নিয়োজিত তাঁদের পেছন থেকে আক্রমণ করবো। রণহস্তীদের তাদের হাওদায় অবস্থিত ছোট কামান নিয়ে অশ্বারোহীদের যুদ্ধক্ষেত্রে যতটা কাছ থেকে অনুসরণ করা সম্ভব করতে আদেশ দাও।’
