শবানুগমনের এই কূটচাল এখন পর্যন্ত সাফল্যের সাথেই উতরে এসেছে। তাকে মাত্র দু’বার কেবল শবাধারের আড়াল ব্যবহার করতে হয়েছে, এবং উভয়ক্ষেত্রেই শবাধার বহনকারী দলটার গম্ভীর প্রকৃতি লক্ষ্য করা মাত্র এগিয়ে আসা দলটা দিক পরিবর্তন করেছিল। খুররম সহসা হাঁচির প্রচণ্ড একটা প্রণোদনা প্রাণপণে দমন করার চেষ্টা করতে গিয়ে ভাবে যে যদিও ওয়াসিম গুলের এই আধিকারিক মনে হচ্ছে ভিন্ন প্রকৃতির। সে শবাধারের ভেতর থেকে ইতিমধ্যেই তাকে কয়েকটা মালবাহী শকট পরীক্ষা করে দেখার জন্য নিজের লোকদের আদেশ দিতে শুনেছে। তার সাথের অতিরিক্ত গাদাবন্দুক আর বারুদ হয় পশুখাবারের অনেক গভীরে বা কয়েকটা শকটের গোপন তলদেশে লুকিয়ে রাখায় দারুণ বুদ্ধির পরিচয় দেয়া হয়েছে। তন্ন তন্ন করে তল্লাশি করলে অবশ্য সেগুলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব এই ভাবনাটা তার মাথায় উঁকি দেয়া মাত্র তার হৃৎপিণ্ড আগের চেয়ে দ্রুত গতিতে স্পন্দিত হতে শুরু করে।
হাসান খানের–যুবরাজ খুররমের বাহিনীর একজন সেনাপতি আর মূলতানের সুবেদারের আত্মীয় সম্পর্কিত ভাই–শবদেহ যা আমরা তাঁর অনুগত সমর্থকেরা পেশোয়ারে তার জন্মস্থানে সমাধিস্থ করার জন্য ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। খুররম শুনতে পায় তার একজন লোক নবাগতদের প্রশ্নের উত্তর দেয়। “গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করার সময় নিজের তাবুতে ঘামে প্রায় গোসল করার মত অবস্থায় বলা তাঁর শেষ অর্থবহ কথার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে আমরা তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে যাচ্ছি। খুররম অনুসন্ধিৎসু আধিকারিককে আঁতকে উঠে শ্বাস নিতে শুনে। গুটিবসন্তের কথা উল্লেখ করাটা অনুপ্রাণিত অভিব্যক্তি। রোগটা এত মারাত্মক এবং এত দ্রুত ছড়ায় যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি বা মৃতদেহের কাছে কখনও অবস্থান করতে চাইবে না। সে কয়েক মুহূর্ত পরে ওয়াসিম গুলের আধিকারিকের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, ইতিমধ্যেই খানিকটা দূরে সরে গিয়েছে, বলছে, সে যদিও একজন বিশ্বাসঘাতককে সমর্থন করেছিল, তারপরেও তাঁর বেহেশত নসীব হোক। তোমরা যেতে পারো।
*
খুররম সন্তুষ্টির সাথে হাসে যখন দুই সপ্তাহ পরে আগ্রা থেকে পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণপূর্বে নিজের টকটকে লাল নিয়ন্ত্রক তাবুতে যখন সে নিজের চারপাশে ক্রমশ বাড়তে থাকা পরামর্শদাতাদের দিকে তাকায়। ওয়াসিম গুলের ভূখণ্ড অতিক্রম করার প্রায় সাথে সাথে তাঁর ক্ষুদ্র সৈন্যবাহিনী যে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার শবানুগমনকারী একটা দল সেই ছদ্মবেশ সে পরিত্যাগ করে। তিন দিন আগে তার বাহিনীর বিশাল একটা বহর এসে যোগ দিয়েছে, যাদের সাথে বেশ কয়েকটা রণহস্তী রয়েছে, যারা বুরহানপুর থেকে কামরান ইকবালের নেতৃত্বে অনেকটা ঘোরা পথ অনুসরণ করে এসেছে ওঁত পেতে থাকা গুপ্তচর বা গুপ্তদূতদের বিভ্রান্ত করতে। অধিকিন্তু, সে যেসব এলাকা দিয়ে অতিক্রম করেছে সেসব এলাকায় মোতায়েন রাজকীয় বাহিনীর অনেক সেনাপতি, সেই সাথে বেশ কয়েকজন অনুগত স্থানীয় শাসক, তাঁর প্রতি বিশ্বস্ততার অঙ্গীকার করেছে এবং তার বাহিনীর সাথে নিজের লোকজন নিয়ে যোগ দিয়েছে। তার বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা এখন প্রায় পনের হাজারের কাছাকাছি এবং সবাই সুসজ্জিত আর পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
‘আমরা মেহেরুন্নিসা, লাডলি আর শাহরিয়ারের সাম্প্রতিক গতিবিধি সম্পর্কে কি জানি?’ সে জিজ্ঞেস করে।
‘আমাদের গুপ্তচরদের ভাষ্য অনুযায়ী, একমাস পূর্বে লাহোরে শাহরিয়ার নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করার পর থেকে সে সেখানেই তাঁর স্ত্রী আর শ্বাশুড়ির সাথে অবস্থান করে মৈত্রীর খোঁজে কেবল দূত প্রেরণ করছে, কামরান ইকবাল জবাব দেয়।
‘আর মহবত খান?
‘মোহন সিংয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ বার্তা অনুসারে আপনার শ্বশুর আসফ খান আর তাঁর দলবলের সাথে যোগ দেয়ার জন্য সে মহবত খান আর তার বাহিনীর সাথে ভ্রমণ করছে। সে জোর দিয়ে বলেছে যে আসফ খানের নিজের আনুগত্যের ন্যায় মহবত খানের আনুগত্যের অঙ্গীকার নিয়ে সন্দেহের আর কোনো কারণ অবশিষ্ট নেই।’
‘ভালো কথা। মোহন সিং ভুল করে নি আমরা এখন সেটাই আশা করতে পারি আর সেই সাথে মহবত খানেরও রাজনীতি নিয়ে অনধিকার চর্চার কারণে যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে। মোগল সাম্রাজ্যে সে যদি নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধারের আশা করলে আমিই তার সেরা ভরসা সে নিশ্চয়ই এটুকু বোঝার মত বিচক্ষণ। মেহেরুন্নিসার সাথে সে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রত্যাশা করতে পারে না।’
‘মোহন সিং নিশ্চিত যে মহবত খান সহজাত ভাবেই অনুগত এবং তাঁর প্রতি মেহেরুন্নিসার উদ্ধত আচরণই তাকে এমন হটকারী করে তুলেছিল। ‘আসফ খানের সাথে সে যখন আমাদের সাথে যোগ দেবে তখন আমরা তাঁর প্রতি নজর রাখবো। কবে নাগাদ আমরা তাদের আশা করতে পারি? ‘তারা অগ্রসর হবার সময় তাদের আরো বেশি সংখ্যক লোক মোতায়েনের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের কথা বিবেচনা করে, সম্ভবত তিন কি চার সপ্তাহ। বিশেষ করে মহবত খান রাজস্থানে নিজের পুরাতন সহযোদ্ধাদের ডেকে পাঠাবার সাথে সাথে যোদ্ধাদের সেই আতুরঘর থেকে নতুন লোক নিয়োগের জন্য বার্তাবাহক প্রেরণ করেছে।’
‘বেশ, আমাদের সামনে এখন তাহলে কেবল খসরুই রয়েছে, তাই না? সিংহাসনের জন্য তাকে কি এখনও পদক্ষেপ গ্রহণে আগ্রহী মনে হয়?
