*
না। বহু বছরের ভিতরে এই প্রথমবার আমাদের অবশ্যই পরস্পর থেকে আলাদা হতে হবে, খুররম মুখাবয়বে একগুয়ে অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলা আরজুমান্দকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করে। তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না, আমরা যখন আমার আব্বাজানের জন্য কোনো অভিযানে যেতাম বা তার সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচতে পলায়ন করেছিলাম সেই সময়ের চেয়ে এখনকার বিষয়টা আলাদা? আমরা একটা বিষয় জানতাম যে আমরা যদি মারা যাই তাহলে আমাদের সন্তানদের যত্ন নেয়ার জন্য আমার আব্বাজান আর তোমার আব্বাজান রয়েছেন। আমরা যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম তখন তারা আমাদের সাথে নিরাপদ ছিল। আমি এখন যখন আমাদের বাহিনী বিভক্ত করছি আর মিত্র সন্ধান করছি তখন এটাই ভালো যে তুমি এখানে তাঁদের সাথে অবস্থান করো। তুমি যদি এখানে থাকো এবং আমি যদি ব্যর্থ হই-আল্লাহ্ না করেন আমি ব্যর্থ হই–তারা তোমায় পাবে তাদের রক্ষা করার জন্য অন্যথায় তারা মেহেরুন্নিসার করুণার মুখাপেক্ষী অসহায় এতিমে পরিণত হবে।
আরজুমান্দের কঠোর অভিব্যক্তি খানিকটা নরম হয়। আমি আপনার যুক্তি বুঝতে পেরেছি এবং আমি সেটা মেনেও নিচ্ছি, কিন্তু আপনার অন্য পরিকল্পনাগুলো কি যুক্তিসঙ্গত? আপনি কেন আপনার সামান্য শক্তি বিভক্ত করছেন এবং এত অল্প সংখ্যক লোক নিয়ে উত্তরে যাচ্ছেন?
‘আমি ভেবেছিলাম আমি ব্যাপারটা খুলে বলেছি–কারণ আমি জানি না আর কে সিংহাসনের উপর দাবি জানাতে পারে এবং সেজন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোথা থেকে আসতে পারে। আমাকে বেশ কয়েকটা পদক্ষেপ একই সাথে নিতে হচ্ছে। আমাকে যতজন সম্ভব তোক দ্রুত সংগ্রহ করতে হবে। আর এটা করার জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা হল আমার সমর্থক আর বন্ধুদের কাছে আমার বিশ্বস্ত সেনাপতিদের অধীনে সৈন্যদল প্রেরণ করে সেখান থেকে লোকবল সংগ্রহ করা। তুমি জানো আমি ইতিমধ্যে মোহন সিংকে পাঠিয়েছি মহবত খানের অবস্থান সনাক্ত করতে। পার্সী এই সেনাপতি একজন বিচক্ষণ আর প্রয়োগবাদী লোক। তিনি জানেন যে আমার সাথে নিজেকে মৈত্রীর সম্বন্ধে আবদ্ধ করার মাঝেই তাঁর চোট খাওয়া সৌভাগ্য ফিরে পাবার সবচেয়ে ভালো সুযোগ রয়েছে। আমাকে সেই সাথে গুপ্তচর আর গুপ্তদূতদের শক্তিশালী দলও প্রেরণ করতে হবে। আমি কেবল তোমার আব্বাজানকেই–তিনি যদিও ভালো মানুষ আমাদের একমাত্র চোখ আর কানের ভূমিকা পালনকারীর দায়িত্ব দিতে পারি না। সবশেষে, ঘটনাপ্রবাহের দ্রুততম সুবিধা গ্রহণের নিমিত্তে, আমার মূল বাহিনীতে পর্যাপ্তসংখ্যক লোক সমবেত হবার পরেই কেবল অনুসরণ শুরু করতে পেছনে রেখে, আমাকে দ্রুত আর সবার অগোচরে আগ্রার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হতে হবে।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কীভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকবেন?
‘আমি এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেই নি। ছোট একটা বাহিনীকেও লুকিয়ে রাখা কঠিন এবং আমি নিশ্চিত মেহেরুন্নিসা ইতিমধ্যে গুপ্তচর প্রেরণ করেছে।’
‘তাহলে গোপন না করে ছদ্মবেশ ধারণ করছেন না কেন?
কীভাবে?
বণিকের কাফেলা হিসাবে, হতে পারে?
না। বর্তমানের এই উপদ্রুত সময়ে যেকোনো শত্রুই কাফেলা দেখলে অনুসন্ধান করবে, সেটা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখবে আর সম্ভব হলে কাফেলা থেকে চুরি করবে। কিন্তু তুমি ঠিকই বলেছো। ছদ্মবেশ ধারণের প্রস্তাবটা ভালো। আমি কিছু একটা ভেবে বের করবো।’
*
‘এটা কার শবাধার? খুররম ষোলটা সাদা ষাড় দিয়ে টেনে নেয়া শবযানে কালো-রেশমের ব্রোকেড দিয়ে ঢাকা মখমলের আস্তরনযুক্ত রূপার শবাধারে মধ্যাহ্নের শ্বাসরুদ্ধকর উষ্ণতায় শুয়ে থাকার সময় একটা পুরুষ কণ্ঠকে জিজ্ঞেস করতে শুনে। বাম হাতের গাঁটে কয়েকদিনের পুরান মশার কামড় ভালো করে রগড়ে দেয়ার জন্য আর বাম পা সামান্য নাড়াতে, যা ইতিমধ্যে অসাড় হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে, তার ভীষণ ইচ্ছা করে কিন্তু সে ভালো করেই জানে তাঁর এমন কিছু করা উচিত হবে না যার ফলে শবাধারটা নড়ে উঠে ভেতরে অবস্থানকারীকে জীবিত বলে প্রতিপন্ন করবে। তার মুখে যদিও চন্দন সুবাসিত কাপড় জড়ানো রয়েছে এবং মুখকে অভেদ্য করা হয়েছে, পচনক্রিয়ার দুর্গন্ধকে বাস্তবসম্মত করতে দশদিনের পচা বাসী মাংসের যে টুকরোটা তার শবাধারে রাখা হয়েছে সেটা কোনোভাবেই ভুলে থাকা অসম্ভব। কামানের গোলা নিক্ষেপের ছিদ্রযুক্ত বিশাল রোটাগড় দূর্গ থেকে একদল অশ্বারোহীকে লাল ধূলোর একটা ঝড় সৃষ্টি করে এগিয়ে আসতে দেখার সাথে সাথে সে শবাধারের ভিতরে অবস্থান নিয়েছে। দূগটা একটা শৃঙ্গময় উদগ্রভূমিতে অবস্থিত যা আগ্রার উত্তরপশ্চিমে প্রসারিত সড়ক আর চারপাশের অনুর্বর ভূপ্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব বিস্তার করে রয়েছে, এবং ওয়াসিম গুলের শক্ত ঘাঁটি, মেহেরুন্নিসার সবচেয়ে নেতৃস্থানীয় সমর্থক।
আরজুমান্দ বস্তুতপক্ষে, সে নয়, তাঁর বাহিনীর জন্য ছদ্মবেশের প্রস্তাব হিসাবে দাক্ষিণাত্যে মৃত এক তথাকথিত সেনাপতির মৃতদেহ স্বভূমে সমাধিস্থ করার জন্য শবাধারের অনুগমনকারীর ধারণা বের করেছে, বলেছে যে এই সৈন্যসারিকে খুঁটিয়ে আবেক্ষণ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম। আরজুমান্দই আবার পচা মাংসের পরিমার্জন প্রস্তাব করেছিল। সে, অবশ্য, অন্য আরেকটা ভাঁওতার পরিকল্পনা করেছে তার প্রপিতামহী হামিদা যেমন আকবরের পক্ষে সমর্থক সংগ্রহের সময় নিজের স্বামী হুমায়ুনের মৃত্যুর খবর ফাঁস হওয়া রোধ করতে হুমায়ুনের মত একই উচ্চতার আর গড়নের একটা লোককে হুমায়ুন সাজিয়ে ছিলেন, খুররম তেমনি তাঁর একজন বিশ্বস্ত সেনাপতিকে তাঁর পোষাক পরিধান করে বুরহানপুর দূর্গে তাঁর ব্যক্তিগত এলাকায় প্রবেশ আর প্রস্থান করা অবস্থায় দৃশ্যমান হতে বলেছে যাতে বিভ্রম সৃষ্টি হয় যে উত্তরের উদ্দেশ্যে সে এখনও রওয়ানা হয়নি।
