খুররম সাথে সাথে নিজের তরবারি নামিয়ে রাখে এবং, চিঠির সম্ভাব্য বিষয়বস্তু নিয়ে ইতিমধ্যেই তার মনে ঝড়ের বেগে ভাবনা বইতে শুরু করেছে, কামরা ত্যাগ করে এবং নিচের আঙিনার দিকে নেমে যাওয়া সিঁড়ির দুটো ধাপ একেকবারে টপকে নিচে নামতে শুরু করে। আওরঙ্গজেব বা দারা শুকোহর কি কিছু হয়েছে? মেহেরুন্নিসা কি জাহাঙ্গীরকে রাজি করিয়েছেন তাঁদের ভূগর্ভস্থ কোনো কারাপ্রকোষ্ঠে প্রেরণ করতে? নিশ্চয়ই না… কিন্তু যদি তাই হয় তাহলে আরজুমন্দকে তিনি সেকথা কীভাবে বলবেন? কিন্তু চিঠিতে সম্ভবত জাহাঙ্গীরের প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে মহবত খানের নিজেকে বহাল করার উদ্ভট গল্প সম্বন্ধে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলা হয়েছে। মহবত খানের আপোষমূলক কিন্তু অদ্ভুত চিঠিগুলো এবং দূরে থাকার আর শান্ত থাকার জন্য আসফ খানের বারংবার পরামর্শের কারণেই কেবল খুররম হস্তক্ষেপ করতে কোনো ধরনের বাহিনী গঠনের প্রয়াস থেকে বিরত থেকেছে, যদিও সে বালাঘাট থেকে তাঁর পরিবারসহ পশ্চিমে বুরহানপুরে চলে এসেছে উত্তরমুখী প্রধান পথগুলোর কাছাকাছি অবস্থানের অভিপ্রায়ে। সাম্প্রতিক সংবাদ হল মেহেরুন্নিসা পুনরায় নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন এবং মহবত খান দলবল নিয়ে পাহাড়ে পালিয়ে গিয়েছে। সেই সময়ে খুররমের কাছে মহবত খানের মত এমন নেতৃস্থানীয় একজন সেনাপতির লড়াইয়ের কোনো চেষ্টা না করাটা ব্যাপারটা অদ্ভুত মনে হয়েছে। তিনি সম্ভবত আরো বড় কোনো পরিকল্পনার অংশ হিসাবে আপাতত প্রস্থান করেছেন।
দূর্গের মধ্যবর্তী প্রাঙ্গণে নেমে এসে প্রখর সূর্যালোকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে খুররম সাথে সাথে ধূলিধূসরিত পাঁচজন অশ্বারোহীকে দেখতে পায়, প্রত্যেকেই তখনও একটা না বরং দুটো ঘোড়ার লাগাম ধরে রয়েছে। তাঁরা প্রত্যেকে নিশ্চয়ই তাঁদের প্রধান ঘোড়ার সাথে অতিরিক্ত একটা ঘোড়া রেখেছিল যাতে যখনই প্রয়োজন হবে ঘোড়া বদল করে তাঁরা অগ্রসর হবার গতি বৃদ্ধি করতে পারে। খুররমে চোখ আলোয় সয়ে আসতে সে অন্য চারজনের থেকে খানিকটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী তরুণকে চিনতে পারে, আসফ খানের সেরা সেনাপতি আর তাঁর অন্যতম সমর্থকের পুত্র হানিফ। হানিফের নিজে আসার অর্থ একটাই খবরটা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
খুররম কুশল বিনিময়ে সময় নষ্ট না করে সরাসরি দীর্ঘদেহী তরুণের দিকে এগিয়ে যায়। হানিফ, তুমি আমার জন্য একটা চিঠি নিয়ে এসেছে? হানিফ সাথে সাথে তার বুকের উপর আড়াআড়িভাবে ঝুলন্ত চামড়ার থলে থেকে আসফ খানের সিলমোহরযুক্ত একটা চিঠি বের করে খুররমের হাতে তুলে দিতে সে কোনো কথা না বলে সিল ভেঙে চিঠিটা খুলে।
মহামান্য সম্রাট, তোমার আব্বাজান ইন্তেকাল করেছেন। দূর্গের আঙ্গিনায় সে খালি মাথায় দাঁড়িয়ে থাকায় মধ্যাহ্নের সূর্যের খরতাপের চেয়েও অধিক উষ্ণতায় শব্দগুলো খুররমকে দগ্ধ করে। তার আব্বাজানের মৃত্যুর কঠিন সংবাদের সাথে আসফ খান এটাও নিশ্চিত করেছেন যে আওরঙ্গজেব আর দারা শুকোহ ভালো আছে, কিন্তু তাগিদও দিয়েছেন, পদক্ষেপ নেয়ার এখন সময় হয়েছে। অন্যেরা তাঁদের সুযোগ নেয়ার আগেই দ্রুত চলে এসো এবং তোমার যা প্রাপ্য সেটা গ্রহণ করো।
চিঠির বিষয়বস্তুর কারণে স্তম্ভিত, খুররম পাঁচজনকে দ্রুততার সাথে চিঠিটা বয়ে নিয়ে আসবার জন্য সংক্ষেপে ধন্যবাদ জানায় এবং তাদের বিশ্রাম নেয়ার অনুমতি দেয়। নিজের পরিচারকদের হাত নেড়ে দূরে থাকতে বলে চিঠিটা তার হাতে ধরা অবস্থায় সে রৌদ্রস্নাত প্রাঙ্গণে একাকী দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে যা লেখা রয়েছে সেটার অর্থ বুঝতে চেষ্টা করে এবং সেইসাথে যা উহ্য রয়েছে। তার আব্বাজান যার সাথে গত কয়েকবছর তার দেখা হয়নি তিনি মৃত। এতটুকু স্পষ্ট। কিন্তু কীভাবে এবং কেন? মেহেরুন্নিসা কি তাকে বিষ দিয়েছে? তাছাড়া, তিনি তাঁর ভাই আসফ খানের কাছে খোলাখুলি দম্ভোক্তি করেছেন টমাস রো’র খাবারে ক্রমাগতভাবে পচা মাংস মিশিয়ে তিনি তাকে দরবার থেকে তাড়িয়েছেন। কিন্তু তার আব্বাজানের মৃত্যু থেকে তিনি কীভাবে লাভবান হতে পারেন? সম্রাটকে তার ভালবাসার বন্ধনে আটকে রাখার জন্য মেহেরুন্নিসা তাকে আফিম আর সুরার যে মিশ্রণ দিতেন তাঁর মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করার মাধ্যমে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুতে তার কোনো ভূমিকা যদি থাকেও সেটা সম্ভবত আপতিক।
সে তার আব্বাজানের মৃত্যুর প্রকৃতি নিয়ে যখন ভাবতে থাকে তখন জাহাঙ্গীরের জীবনের বিভিন্ন দৃশ্য তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠে–তাঁদের বিচ্ছেদের বছরগুলোর নয় বরং তার যৌবনের, আকবর তাকে উটে চড়ার আর দাবা খেলার জটিল বিষয়ে নির্দেশ দেয়ার সময় তাঁর আব্বাজানের একপাশে আড়ষ্ট আর বিব্রতভাবে দাঁড়িয়ে থাকা; আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সমাপ্তির পরে তার সাথে নিজের সম্পর্ক পুনর্গঠনে জাহাঙ্গীরের বাধাগ্রস্থ প্রয়াস; আকবরের মৃত্যু আর খসরুর বিদ্রোহ এবং তারপরে সুন্দর বছরগুলো যখন আরজুমান্দকে সে প্রথম বিয়ে করেছিল এবং সে ছিল তাঁর আব্বাজানের অগ্রগণ্য সেনাপতি আর বিশ্বস্ত ব্যক্তি।
খুররম এইসব স্মৃতি স্মরণ করতে বুঝতে পারে যে তার আব্বাজান তাকে ভালোবাসতো এবং সে তাকে। তার চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠতে শুরু করে। তাঁর ভাবনায় মেহেরুন্নিসা ফিরে আসতে সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মোছে। জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তাঁর বিচ্ছেদের মূল কারণ এই রমণী। তিনি এখনও জীবিত এবং তার দুই সন্তান মেহেরুন্নিসার কজায় রয়েছে। সম্রাটের মৃত্যুর পরবর্তী তিন সপ্তাহে তিনি নিঃসন্দেহে তিনি নিজের এবং নিজের দুই বশংবদ, শাহরিয়ার আর লাডলির জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে পরিকল্পনা করেছেন। ঠাণ্ডা মাথা, বিচক্ষণ আর স্বার্থসিদ্ধিতে নিপূণা, তিনি নিশ্চয়ই খুব বেশি সময় শোক করেন নি এবং সেও সেটা করবে না। আসফ খান যেমন বিচক্ষণতার সাথে লিখেছেন, তাকে অবশ্যই অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে হবে কিন্তু তার আগে তাকে অবশ্যই আরজুমান্দকে খবরটা জানাতে হবে।
