*
তিনঘন্টা পরে মেহেরুন্নিসা যখন, জাহাঙ্গীরের শারীরিক দুর্বলতাকে বিব্রত না করতে, শয্যা থেকে ধীরে আর ধৈর্যসহকারে উঠে বসে যেখানে অনেকদিন পরে তারা পরস্পরের সঙ্গসুখ উপভোগ করেছে তখনও তাবুর বাইরে থেকে ভোজসভার আনন্দ মুখরিত শব্দ ভেসে আসে। তিনি এরপরে, রাতের বেলা সচরাচর তিনি যা করে থাকেন, তার জন্য গোলাপজলের সাথে আফিম মিশ্রিত করেন এবং গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে তিনি মিশ্রণটা ধীরে ধীরে পান করেন, মেহেরুন্নিসা আবারও যখন তাঁর পাশে এসে শয্যা গ্রহণ করে তখন তার মুখে প্রশান্তির একটা হাসি ফুটে থাকতে দেখে। এখন, নিজের রেশমের আলখাল্লাটা ভালো করে শরীরে জড়িয়ে নিয়ে মেহেরুন্নিসা তাঁর স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। তাঁর কৃতজ্ঞতা–তার বেশিরভাগ বক্তৃতার মত, তাঁর সামনে আগে অনুশীলন করেন নি–মেহেরুন্নিসাকে গভীরভাবে আপুত করেছে। তাদের সামনে এখনও অনেকগুলো বছর রয়েছে এবং তার সাহায্যে সেগুলো হবে তাঁর জীবনের মহোত্তম। তারপরে… বেশ, সিংহাসনে অধিষ্ঠিত শাহরিয়ারকে নিয়ে–সে যেন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয় সেটা তিনি নিশ্চিত করবেন–তখনও তিনি সাম্রাজ্যের সবচেয়ের ক্ষমতাবান মানুষ হিসাবে বিদ্যমান থাকবেন। শাহরিয়ারের বোধশক্তি খুব একটা প্রখর না এবং লাডলির সাহায্যে তিনি সহজেই তাকে নিজের মত করে গড়ে নিতে পারবেন। খুররম আর মিষ্টি আরজুমান্দ এবং তাঁদের দুই সন্তানের ভাগ্যের ব্যাপারে যারা এই মুহূর্তে তাবুর অন্য আরেকটা অংশে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তিনি পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। সুখকর ভাবনায় মশগুল হয়ে তিনি ঘুরে দাঁড়ান এবং নিজের পর্দা ঘেরা শয়ন এলাকার দিকে হেঁটে যান।
*
‘হেকিমকে ডেকে নিয়ে এসো।
চিৎকারটা ছড়িয়ে যেতে মেহেরুন্নিসা নিজের বিছানায় উঠে বসেন। তিনি উঠে বসতে পরিচারিকাদের একজন তার বিছানার চারপাশের বৃত্তাকার পর্দা সরিয়ে দেয় এবং উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, ‘সম্রাজ্ঞী, জলদি আসেন। আমাদের সম্রাট। তিনি অসুস্থ।’
মেহেরুন্নিসা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায় এবং তাঁর ঘুমের সময়ে পরিহিত কামিজের উপরে সবুজ রেশমের আলখাল্লাটা জড়িয়ে নিয়ে, দ্রুত পায়ে তারপরে জাহাঙ্গীরের শয়ন কক্ষের দিকে এগিয়ে যায়। তিনি চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন, ঠোঁটের কোনো দিয়ে বমির একটা পাতলা রেখা গড়িয়ে পড়ছে। হেকিম ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছে এবং জাহাঙ্গীরের একান্ত পরিচারক যে শয্যার কাছেই শুয়ে থাকে বলছে, আমি একটু আগে তাকে কাশতে শুনেছি কিন্তু তারপরে সবকিছু শান্ত। আমি প্রতি ঘন্টায় যেমন তাকে এসে দেখে যাই সেরকম একটু আগে এসে তাকে এভাবে দেখতে পাই।’
হেকিম মুখ তুলে তাকান এবং মেহেরুন্নিসাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বলেন, ‘সম্রাজ্ঞী, সম্রাট ইন্তেকাল করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই কাশির সময় বমি করেছিলেন এবং তারপরে শ্বাসরুদ্ধ হয়েছেন। আমার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না।’
মেহেরুন্নিসার মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীর মৃত… যে মানুষটা তাকে কখনও প্রত্যাখ্যান করে নি, সবসময়ে তাকে কামনা করেছে, তাকে কখনও পরিত্যাগ করার কথা কল্পনাও করে নি এবং সবসময়ে তার ভাবনা আর ইচ্ছার প্রতি মনোযোগী থেকেছে সে আর নেই। তিনি হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে এবং আঙুলের উল্টো দিক দিয়ে তার উষ্ণতা হারাতে থাকা মুখ স্পর্শ করতে তার গাল বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরতে শুরু করে–ভালোবাসার, বিহ্বলতার আর সর্বস্ব হারাবার অশ্রু। তিনি কিছু সময়ের জন্য কান্না আর শোকের মাঝে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন, তারপরে অন্য আরেকটা ভাবনা ধীরে ধীরে তার বিক্ষিপ্ত চেতনায় আকৃতি লাভ করতে শুরু করে। এখন কি হবে? জাহাঙ্গীর ইচ্ছাকৃত ভাবে না হলেও তাকে পরিত্যাগ করেছেন। তাকে আরো একবার অবশ্যই নিজেকে আর নিজের অবস্থানকে সুরক্ষিত করতে হবে। তিনি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখের অশ্রু মুছে ফেলেন, উঠে দাঁড়ান এবং নিজেকে খানিকটা সুস্থির করে নিয়ে তারপরে শান্ত কণ্ঠে বলেন, শাহরিয়ার আর লাডলিকে ডেকে নিয়ে এসো।
এক কি দুই মিনিট পরে তরুণ দম্পতিকে ভেতরে নিয়ে আসা হয়, তাঁদের বিমূঢ় চোখের তারায় বিভ্রান্তি, ঘুম আর আতঙ্ক মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। মেহেরুন্নিসা কালক্ষেপণ না করে কথা বলতে শুরু করে। তোমরা দেখতেই পাচ্ছো, সম্রাট ইন্তেকাল করেছেন। শাহরিয়ার, তুমি যদি তার স্থানে অভিষিক্ত হয়ে শাসন পরিচালনা করতে চাও তাহলে তোমরা দু’জনেই অবশ্যই আমি যা বলছি ঠিক তাই করবে।
২.০৯ সম্রাটের শবাধারের অনুগমনকারী
‘শাহ সুজা, আপনার তরবারি উঁচু রাখেন নতুবা আপনি কখনও একজন দক্ষ অসিবিদ হতে পারবেন না।’ বুরহানপুরের দূর্গ-প্রাসাদের বিশাল কামরাগুলোর একটায় খুররম তার এগার বছরের ছেলেকে হাত থেকে নিজের ভেতা অনুশীলনের অস্ত্র প্রবলভাবে ফেলে দেয়ার চেষ্টা করতে দেখে হাসে। খুররম সহসা সর্তক হয়ে উঠে যে তার পেছনে কামরার ভেতরে অন্য কেউ প্রবেশ করেছে। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁর কচিদের একজনকে প্রবেশ করতে দেখে।
‘যুবরাজ, আমায় মার্জনা করবেন, হতভম্ব তরুণ তোতলাতে তোতলাতে কোনোমতে বলে, কিন্তু এইমাত্র পাঁচজন অশ্বারোহীর একটা দল আস্কন্দিতবেগে অঘোষিতভাবে নিচের আঙ্গিনায় এসে উপস্থিত হয়েছে। তারা দাবি করেছে সম্রাটের অস্থায়ী শিবির থেকে যাত্রা করে গত বিশদিন তাঁরা নাগাড়ে ঘোড়া হাঁকিয়েছে, পথে খাওয়া, ঘুমান আর ঘোড়া বদলাতে সামান্য সময়ের জন্য কেবল যাত্রাবিরতি করেছে। তারা বলছে আসফ খানের কাছ থেকে তাঁরা অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটা চিঠি নিয়ে এসেছে যা আপনার কাছেই কেবল ব্যক্তিগতভাবে দেয়া যায়।
