এক ঘন্টা পরে, তাঁর আধিকারিকেরা নিজেদের আসন গ্রহণ করতে, তূর্যধ্বনির সাথে সাথে রাজকীয় তাবুর কানাত পুনরায় উঠে যায় এবং ভেতর থেকে চারটা পালকি বের হয়ে আসে প্রতিটাই চারজন করে বেহারা বহন করছে। প্রথম পালকি দুটো তাবুর সামনের মঞ্চের কাছে থামে। পরের পালকি দুটো, যেগুলোয় পর্দা দেয়া, পেছনে নিয়ে যাওয়া হয় যাতে মেহেরুন্নিসা আর লাডলি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি এড়িয়ে পর্দা ঘেরা এলাকায় প্রবেশ করতে পারে। শেষবারের মত তূর্যধ্বনির গগনবিদারী একটা আওয়াজের সাথে সাথে জাহাঙ্গীর ধীরে ধীরে নিজের পালকি থেকে নিচে নামতে দ্বিতীয় পালকি থেকে হালকাঁপাতলা অবয়বের শাহরিয়ার নেমে আসে তাঁর সাথে যোগ দিতে। যুবরাজ মঞ্চে আরোহণ করে সিংহাসনের দিকে এগিয়ে যাবার সময় সম্রাটকে সাহায্য করে।
জাহাঙ্গীর সিংহাসনে উপবিষ্ট হবার আগে এক মুহূর্তের জন্য মাথার উপরে কালো মখমলের মত আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারকারাজির দিকে তাকায়। তিনি কি অলীক কল্পনা করছেন নাকি সত্যিই আজ রাতে তারকারা উজ্জ্বলভাবে দীপ্তি ছড়াচ্ছে, তার সাফল্যের উদ্যাপনকে নিজেদের রূপালি প্রভা দিয়ে সম্মান জানাচ্ছে? তিনি তাঁর পরে ইঙ্গিতে সবাইকে চুপ করতে বলেন এবং কথা শুরু করেন, তাঁর কণ্ঠস্বর কঠোর। আমরা আজ রাতে এখানে আমার প্রিয় পুত্র শাহরিয়ারের আগমন আর কুটিল মহবত খানের আধিপত্য থেকে আমাদের পরিত্রাণ উদ্যাপন করতে সমবেত হয়েছি। তার অপরাধ ক্ষমা করা হয়নি কিংবা কেউই তার কথা ভুলে যায়নি। তার শাস্তি কেবল স্থগিত রয়েছে।’ তিনি কথা থামিয়ে নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখার সময় মোগলদের সবুজ রঙের পোষাক পরিহিত রাজেশকে উৎকণ্ঠিত দেখেন, তাঁর খালি অক্ষিকোটরের উপরে সবুজ রঙেরই একটা পট্টি রয়েছে। তাঁর এক চোখের দৃষ্টি তাঁর সামনে রক্ষিত রূপার থালার উপর নিবদ্ধ এবং সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নিজের পোষাকের একটা বোম অনবরত মোচড়াচ্ছে।
‘কিন্তু এটা অতীতের ঘটনাবলী এবং তাদের পরিণতি রোমন্থনের সময় না। সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জাহাঙ্গীর কথা বলার সময় লক্ষ্য করেন শাহরিয়ার নিজের তেপায়ার উপরে একটু নড়ে বসে, কিন্তু রাজকীয় তাবু ত্যাগ করার সময় মেহেরুন্নিসার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে শাহরিয়ার তার উত্তরাধিকারী এই বিষয়টার পুনরাবৃত্তি করবেন না। আজ রাতে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই–বিশেষ করে তার কাশির প্রকোপ যখন কমে এসেছে এবং তিনি নিজের মাঝে অনেকবেশি প্রাণশক্তি অনুভব করছেন। শাহরিয়ার সম্বন্ধে মেহেরুন্নিসার ক্রমাগত আর মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা সত্ত্বেও জাহাঙ্গীর তাকে যেসব দায়িত্ব দিয়েছিলেন সুচারুভাবে সেগুলো সম্পাদনে তাঁর পারঙ্গমতা মাঝে মাঝে তার পিতাকে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে যে তাকে যদি সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা হয় তাহলে সে সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধির পথে নেতৃত্ব দেয়ার মত যথেষ্ট যোগ্যতা বা বুদ্ধির অধিকারী। তার সদ্য আগত অমাত্যদের কেউ কেউ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে, কাশ্মীরে তাঁর বন্দিত্বকালীন সময়ে শাহরিয়ারের সিদ্ধান্তহীনতা আর নিষ্ক্রিয়তার খবর জানানোয় সেই ধারণা আরও প্রবল হয়েছে।
মেহেরুন্নিসাকে যদিও তিনি কিছুই জানাননি, কিন্তু তিনি মনে মনে চিন্তা করতে শুরু করেছেন নিজের আব্বাজানের বিরুদ্ধে তাঁর নিজের বিদ্রোহের পরে তিনি যেমন তার সাথে সব বিরোধের মীমাংসা করেছিল সেভাবে কি তার আর খুররমের মাঝে একদিন সবকিছু আবার আগের মত হতে পারে না। দারা শুকোহর কথা তাকে ভাবতে বাধ্য করেছে… হৃদয়ঙ্গম করতে যে সম্ভবত উভয় পক্ষেরই ভুল হয়েছে। খুররমের প্রতি এক সময় তার মনে যে ভালোবাসা ছিল সেটা আবার জাগ্রহ হতে শুরু করেছে, তাকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে তাঁর জন্ম কত মঙ্গলময় ছিল… সে কেমন সাহসী যোদ্ধা আর নেতা ছিল… সে নিজেকে আজ্ঞানুবর্তী কিন্তু মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষমতাহীন শাহরিয়ারের চেয়ে বাবরের প্রতিষ্ঠিত বংশের ধারা এগিয়ে নেয়ার জন্য অনেক বেশি যোগ্য হিসাবে প্রমাণ করতে পারতো। তিনি নিজেকে হয়ত ঠাকাচ্ছেন কিনা, সেটা সময়ই বলে দেবে…
নিজের দিবাস্বপ্নে বিভোর জাহাঙ্গীরকে একজন আধিকারিকের ইঙ্গিতপূর্ণ কাশি বর্তমানে এবং তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন সেই মুহর্তে ফিরিয়ে আনে। আমার বিশ্বাস আমরা একটা স্বর্ণযুগের সূচনা দেখতে যাচ্ছি। আমাদের ভেতরের শত্রুরা পরাস্ত হয়েছে আর আমাদের বহিশত্রুরা আমাদের সীমান্তে আক্রমণ করতে ভীত। আমাদের মহান সাম্রাজ্যের প্রজাদের জন্য শান্তি আর সমৃদ্ধি অপেক্ষা করছে। আজ রাতে আমি তোমাদের এটাই বলতে চেয়েছি। কিন্তু সেই সাথে আরও কিছু আছে…তোমাদের সবার সামনে আমি আমার সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নিসাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই যিনি আমাদের সৌভাগ্যকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসতে আমায় দারুণ সাহায্য করেছেন। পারিবারিক জীবনের বাইরে মেয়েরা সাধারণত এমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়না কিন্তু তিনি আমায় জীবনের সবক্ষেত্রে সাহায্য করেছেন এবং আমি সেজন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই।’
জাহাঙ্গীর তারপরে নিজের দু’হাত শূন্যে তুলে চিৎকার করে উঠে, ‘মোগলদের জিন্দাবাদ! মোগল সামাজ্য জিন্দাবাদ!’ মোগল সাম্রাজ্য দীর্ঘজীবি হোক! সমবেত জনতার মাঝ থেকে সাথে সাথে ভেসে আসে, ‘পাদিশাহ জাহাঙ্গীর জিন্দাবাদ। সম্রাট জাহাঙ্গীর দীর্ঘজীবি হোন! জাহাঙ্গীর নিজের সিংহাসনে আসন গ্রহণ করতে উদ্দাম চিৎকারে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠে। বহু বছর আগে আগ্রা দূর্গের ঝরোকা বারান্দায় সম্রাট হিসাবে নিজের প্রথম উপস্থিতির ক্ষণটার কথা তার আবার মনে পড়ে যায়। কতটা পথ তিনি অতিক্রম করে এসেছেন। ভালো আর মন্দ কত অভিজ্ঞতাই না তার হয়েছে। তাঁর আব্বাজান আকবরের যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করার যে শপথ সে নিয়েছিল সেটা পুরোপুরি সম্পূর্ণ করতে তিনি আর কত কিছু অর্জন করতে চান। ঠিক তখনই ঝলসানো মাংসের সুগন্ধ তাঁর নাকে ভেসে আসে। একজন পরিচারক চুনিলাল ডালিমের কোয়া দিয়ে সাজান হরিণের মাংসের একটা পাত্র তার সামনে নামিয়ে রাখে। আজই অনেকমাসের ভিতরে প্রথমবারের মত তিনি খাবারের জন্য জোরালো রুচি অনুভব করেন। অনভ্যস্ত অভিরতি নিয়ে তিনি খেতে শুরু করেন।
