‘মহবত খান কি আমাদের শত্রু ছিল? দারা শুকোহকে বিস্মিত দেখায়।
‘হ্যাঁ, জাহাঙ্গীর উত্তর দেয়। সে আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাদের বন্দি রেখেছিল এবং আমার পরামর্শদাতা হিসাবে কাকে আমার মনোনীত করা উচিত আর সেই সাথে কীভাবে আমার সাম্রাজ্য পরিচালনা করা উচিত সেই নির্দেশ সে আমায় দিতে চেয়েছিল।
কিন্তু আমি ভেবেছিলাম… মানে আমি বলতে চাইছি আপনি যেভাবে তাঁর সাথে কথা বলতেন… আপনারা পরস্পরের বন্ধু হয়ে উঠেছেন।
জাহাঙ্গীর মুচকি হাসে। না। সেটা ছিল ভান। একজন শাসককে তিনি যা চান সেটা অর্জন করতে অনেক সময় ছলনার আশ্রয় নিতে হয়। তোমরা। আরো বড় হলে এটা বুঝতে পারবে। এখন, এসো একটু মিষ্টি মুখ করবে–আওরঙ্গজেব তুমিও এসো।
তিনি বাদামের গুড়ো দেয়া কেকের পুর দেয়া শুকনো খুবানি ভর্তি একটা রূপার তশতরি তাঁদের দিকে এগিয়ে দিতে, আওরঙ্গজেব যদিও একমুঠো খুবানি নেয় কিন্তু দারা শুকোহ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে তখনও চিন্তিত দেখায়, সে তারপরে বলে, আমার আব্বাজান আপনার কাছে আমাদের প্রেরণ করার আগে আপনার সম্বন্ধে অনেক কিছু বলেছেন।
জাহাঙ্গীর আড়ষ্ট হয়ে যায়। কি বিষয়ে?
‘আপনি আমাদের দাদাজান আর সম্রাটই কেবল না আপনি একজন মহান মানুষ। আমরা তাই সবসময়ে আপনাকে যেন সম্মান প্রদর্শন করি। মহবত খান কি সেটাই করতে ভুল করেছিল? সে কি আপনাকে সম্মান প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছিল?
জাহাঙ্গীর মাথা নাড়ে, কিন্তু তার মন তখন অন্য কোথাও পড়ে রয়েছে। খুররম কি আসলেই তাঁর সম্বন্ধে এসব বলেছে? যদি তাই হয়, সেটা কি তাঁর ছেলেরা যেন তাকে বিরক্ত না করে সেজন্যই সে কেবল বলেছে নাকি কথাগুলো সে সত্যিই বিশ্বাস করে?
*
ভীমবর শহরের কাছে উত্তরপশ্চিমের সমভূমির উপর স্থাপিত তাঁর অস্থায়ী শিবিরের উপরের আকাশ আতশবাজিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে জাহাঙ্গীর সেদিকে তাকিয়ে থাকে। শাহরিয়ার আর লাডলি তাদের শিশু কন্যা–জাহাঙ্গীর কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ভূমিষ্ট–এবং লাহোর পর্যন্ত বাকি পথটা তাকে পাহারা দেয়ার জন্য দশ হাজার সৈন্যের শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে দু’দিন আগে তাদের সাথে এসে যোগ দিয়েছে। তাঁর সবচেয়ে বয়য়াজ্যেষ্ঠ বেশ কয়েকজন অমাত্য আর আধিকারিকও তাঁদের সাথে রয়েছে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টা এখন যখন সন্দেহের উর্ধ্বে, মেহেরুন্নিসা পরামর্শ দেয় তাদের আগমন আর মহবত খানের কাছ থেকে পরিত্রাণ দুটো ঘটনা উদ্যাপনু করতে একটা ভোজসভার আয়োজন করতে এবং তিনি সাথে সাথে সম্মতি দেন। সবশেষে সবচেয়ে বড় আতশবাজিটা বিস্ফোরিত হয়ে রাতের আকাশে লাল আর বেগুনী আলোক বিন্দু ছড়িয়ে দিতে জাহাঙ্গীর পরিতৃপ্ত বোধ করেন। মহবত খানের বিশ্বাসঘাতকতা সত্ত্বেও, নিজের সাম্রাজ্যের উপরে তার নিয়ন্ত্রণ এখনও অটুট রয়েছে। মহবত খান এক মাস আগে দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় পালিয়ে যাবার পর সেখান থেকে আর প্রকাশ্যে বের না হওয়ার বিষয়টা তার গুপ্তদূতেরা এসে নিশ্চিত করার ব্যাপারটাই কেবল না সেই সাথে তার আধিকারিকেরাও সংবাদ নিয়ে এসেছে যে খুররম দক্ষিণের প্রদেশে শান্তই রয়েছে, তারা সেই সাথে আরো জানিয়েছে যে গুজরাতের মোগল সুবেদার সেখানের একটা বিদ্রোহ প্রচেষ্ট কঠোর হস্তে দমন করেছে এবং সাম্রাজ্যের অন্যত্র শান্তি বিরাজ করছে।
আতশবাজি–উত্তরে পেশোয়ার আর খাইবার গিরিপথ অভিমুখে ভ্রমণকারী চিনা বণিকদের একটা কাফেলার কাছ থেকে আজ রাতের ফুর্তির উপক্রম হিসাবে যা কেনা হয়েছে–পোড়ান শেষ হতে জাহাঙ্গীর ভোজের আয়োজন নিজে তদারক করে। সে বিশাল শিবিরের একেবারে মধ্যখানে, তাঁর টকটকে লাল তাবু থেকে পঞ্চাশ গজ সামনে, রাজকীয় মঞ্চ স্থাপনের আদেশ দিয়েছে এবং সোনালী কাপড় দিয়ে পুরো মঞ্চটা মুড়ে দিতে বলেছে। নিচু রাজসিংহাসন আর তার পাশে শাহরিয়ারের জন্য সূক্ষ কারুকাজ করা একটা তেপায়া ইতিমধ্যেই সেখানে রাখা হয়েছে। একপাশে কিছুটা দূরে, মেহেরুন্নিসা আর তার মেয়ে লাডলীর আহারের জন্য সোনালী জরির কারুকাজ করা সবুজ রেশমের পর্দা দিয়ে একটা এলাকা ঘিরে দেয়া হয়েছে। পরিচারকেরা এখনও ব্যস্ত ভঙ্গিতে মঞ্চের সামনে জাহাঙ্গীরের বয়য়াজ্যেষ্ঠ সেনাপতি আর উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের জন্য রূপার থালা আর পানপাত্র সজ্জিত একটা লম্বা নিচু টেবিলের চারপাশে সোনালী জরির কারুকাজ করা লাল মখমলের তাকিয়া বিন্যস্ত করছে। নিম্নপদস্থ আধিকারিক আর অমাত্যদের জন্য আরেকটু পেছনে পাতা টেবিলগুলোর সজ্জায় আড়ম্বর একটু কম আর তাঁর বাকি লোকদের জন্য অন্য ভৃত্যরা শিবিরের অন্যত্র খাবারের বন্দোবস্ত করছে।
মাংস ঝলসানোর গন্ধ–হরিণ, ভেড়া, হাস, মোরগ আর ময়ূরী–ইতিমধ্যেই শতাধিক ভোলা উনুনের উপর স্থাপিত মাংসভর্তি শিক থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। বহনযোগ্য তন্দুরী উনুনের ভেতর টক দই আর মশলা দিয়ে মাখান মাংস দেয়া হয়েছে আরও রসনাতৃপ্তভাবে প্রস্তুত করতে। বিশাল সব হাড়িতে শুকনো কাশ্মীরী ফলের–খুবানি, চেরী আর সুলতানা–সাথে মশলার গন্ধযুক্ত বিভিন্ন পদ ইতিমধ্যেই টগবগ করে ফুটছে। ময়দা মাখিয়ে তাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করে গরম গরম অবস্থায় রুটি টেবিলে নিয়ে আসা যায়। চাল আর গোলাপজল আর গুড়ো করা কাঠবাদাম আর দুধ দিয়ে তৈরি ক্ষীরের পাত্র, কোনো কোনোটার উপরে সোনার তবক দেয়া কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে। হা, সবকিছু যেমনটা হওয়া উচিত তেমনই হয়েছে। জাহাঙ্গীর সন্তুষ্টির শব্দ করে সম্মতি জানায় এবং নিজের তাবুতে ফিরে যায় যেখানে ভোজসভার জন্য তাকে সজ্জিত করতে তাঁর কর্মিরা অপেক্ষা করছে।
