মেহেরুন্নিসা তাকে কৌশলে পরাস্ত করেছে। সে এতটা নির্বুদ্ধিতার পরিচয় কীভাবে দিলো? সহসা দিবালোলাকের মত বিষয়টা তার কাছে পরিষ্কার হয় যে ফুল আর কীটপতঙ্গের জন্য তিনি যখন পরিচারকদের তদানুসারে প্রেরণ করতেন তারা তখন আসলে সমর্থকদের কাছ থেকে চিঠি বা বার্তা আদান প্রদান করছিলো। সে এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারে যে রাজদম্পতির অনুরোধে জাহাঙ্গীরের অবশিষ্ট রাজকীয় দেহরক্ষীদের কোনো ধরনের ভাবনা চিন্তা না করে বহাল রাখার মূল্য এখন তাকে দিতে হচ্ছে। রাজেশ তার সাথে কীভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলো? মেহেরুন্নিসা তাকে কীভাবে বশ করলেন? সম্রাটইবা কীভাবে তার অধীনস্ত যোদ্ধাকে নিজের পক্ষে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করলেন?
মহবত খান ক্রোধে অন্ধ হয়ে থাকলেরও অচিরেই এসব প্রশ্নের উত্তর বেশ ভালো করেই অনুধাবন করতে পারে। অর্ধগৃধনু রাজেশের কাছে ক্ষমার প্রতিশ্রুতি আর সে নিজে নিজের জন্য যা অর্জন করেছে তার চেয়ে বেশি পদোন্নতি ছিল যথেষ্ট। তার লোকেরা, যারা বেশির ভাগই একটা দরিদ্র রাজপুত রাজ্যের অধিবাসী রাজেশের পিতা যেখানের রাজা। রাজেশের প্রতিই তাঁরা মূলত অনুগত। বিশ্বাসঘাতকতার কারণ যাই হোক সেটা নিয়ে বিষণ্ণ হবার সময় এখন না। তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আর সেটা কার্যকর করতে হবে। বোধোদয় হবার সাথে সাথে তার মাঝে নতুন উদ্যমের সূচনা হয়। সেতু পুড়িয়ে দাও, সে চিৎকার করে অশোককে আদেশ দেয়, রাজেশ আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। দুপুরের রান্নার জন্য জ্বালান চুল্লি থেকে প্রজ্জ্বলিত কাঠের টুকরো নিয়ে এসো। আমি নিজে প্রথমে আগুন দেব।
বিমূঢ় অশোক ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আদেশ পালন করতে গেলে, মহবত খান অন্য আরেকটা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ক্রোধ আর প্রতিশোধের অদম্য আকাঙ্খ সত্ত্বেও সে সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীকে পুনরায় বন্দি করার আর কোনো চেষ্টা করবে না। সে সেখানেই কেবল যুদ্ধ করতে শিখেছে যেখানে শত্রু আর মিত্রের মধ্যে পরিষ্কার ভেদ রেখা বর্তমান আর প্রতিটা আঘাতের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া রয়েছে, দরবারের সতত পরিবর্তশীল আর অনিশ্চিত প্রেক্ষাপটে সে লড়াইয়ের উপযুক্ত নয়। জাহাঙ্গীর ঠিকই বলেছিলেন। সর্বোময় ক্ষমতার জন্য আকাঙ্খর সফলতা আপন শাস্তির উল্টো পিঠ। সে আর তার সাথের অবশিষ্ট লোকেরা, এখন যখন তারা সংখ্যা অল্প, পাহাড়ের ভিতরে পশ্চাদপসারণ করবে। সে সেখানে একবার পৌঁছাবার পরেই কেবল নিজের ভবিষ্যত সম্বন্ধে চিন্তা করবে… সিদ্ধান্ত নেবে কার প্রতি সে নিজের আনুগত্যের প্রস্তাব দেবে, কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সর্বোময় নেতার দায়িত্ব যার কাছে অর্পণ করবে।
*
‘তোমার ষড়যন্ত্র সফল হয়েছে। আমি তোমায় অভিনন্দন জানাই,’ সেই রাতে জাহাঙ্গীর বলেন। মেহেরুন্নিসাকে জয়োল্লসিত দেখায়। তিনি ব্যাঘ্র শিকারের সময় সাফল্যের সাথে শিকার সমাপ্ত করার পরে প্রায়ই তার চোখে মুখে ঠিক এমনই অভিব্যক্তি দেখেছেন। মহবত খান–তাঁর অন্যতম সেরা আর সবচেয়ে বুদ্ধিমান সেনাপতিকে, মেহেরুন্নিসা কীভাবে সহযোগিতার ভান করে কৌশলে পরাস্ত করেছে চিন্তা করে তিনি হাসেন, তাঁর সাফল্য এমনই অনায়াস যে মহবত খানকে মনে হয়েছে সে ঝিলমের পানিতে একটা বেশ বড় ট্রাউট মাছ সম্রাজ্ঞীর মায়ার কাছে পরাভূত।
‘আমি মহবত খানকে এসব কিছু শুরু হবার দিনই সতর্ক করেছিলাম যে তার বিজয় সাময়িক। আমি আশা করি আমার কথা সে মনে রেখেছে।
‘আমি নিশ্চিত সে রেখেছে। তোমার কি মনে হয় সে এখন কি করবে?
‘আমি জানি না। আমার সন্দেহ হয় সে নিজেও সেটা জানে। সে যদি সাম্রাজ্য ত্যাগ করে, তাহলে বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে, সম্ভবত পারস্যেই আবার ফিরে যাবে। সে অবশ্যই জানে যে তাঁর এই অপরাধের জন্য সে কোনোভাবেই শাস্তি এড়াতে পারবে না এবং আপনি লাহোরে নিরাপদে পৌঁছান মাত্রই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনি সৈন্য প্রেরণ করবেন।’
জাহাঙ্গীর মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। মেহেরুন্নিসা ঠিকই বলেছে। মজবত খান একটা সুযোগ দেখতে পেয়ে সেটা গ্রহণ করেছিল। তাকে যদি এর জন্য শাস্তি দেয়া না হয় তাহলে অন্যরা হয়ত বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত হতে পারে। কিন্তু এমন একটা ঘটনা ঘটার সুযোগই তৈরি হবার কথা না। তিনি সম্ভবত বৃদ্ধ হচ্ছেন… ভাবনাটা উঁকি দিতেই তার বিজয়োল্লাস খানিকটা হ্রাস পায়। তিনি যখন তার রাজধানীতে ফিরে যাবেন তখন তাকে অবশ্যই সবাইকে দেখাতে হবে যে নিজের সাম্রাজ্যের উপর এখনও তার অটুট নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেকে আপাতত নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পরামর্শ দেন–আজ রাতে তিনি আর মেহেরুন্নিসা তাঁদের এই নতুন প্রাপ্ত স্বাধীনতা কেবল উপভোগ করবেন এবং তাদের এই সাফল্য উদ্যাপন করার জন্য দারা শুকোহ্ আর আওরঙ্গজেবও তাঁদের সাথে যোগ দেবে।
‘আমার নাতিদের আমার কাছে নিয়ে এসো, তিনি একজন কচিকে ডেকে আদেশ দেন। কয়েক মিনিট পরে ছেলে দুটো তাবুর ভেতর প্রবেশ করে এবং জাহাঙ্গীর পর্যায়ক্রমে তাদের দু’জনকেই আলিঙ্গণ করেন। এটা দারুণ একটা মুহূর্ত, তিনি তাদের বলেন।
‘কেন, দাদাজান?’ দারা শুকোহ জানতে চায়।
জাহাঙ্গীর তার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় মনে মনে ভাবেন যে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যা কিছু ঘটেছে ছেলেদের কাছে সেসব নিশ্চয়ই বিচিত্র বলে প্রতিয়মান হয়েছে, আমরা আমাদের শত্রু মহবত খানকে কৌশলে পরাস্ত করেছি এবং আমাদের স্বাধীনতা পুনরায় অর্জন করেছি।
