মহবত খান সেদিনই সকালের দিকে জাহাঙ্গীরকে জানিয়েছিল যে সন্ধ্যা নামার অনেক আগেই প্রত্যেকে ঝিলমের অন্য তীরে পৌঁছে যাবে, এবং পরের দিন সকালে তারা লাহোরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে পারবে। সে তারপরে অশোককে আর তার বাহিনীর এক তৃতীয়াংশের অগ্রবর্তী একটা বাহিনী নিয়ে সেতু অতিক্রম করে, সে রাজেশকে রেখে যায়–সেদিন যার পেছনের দিকের নেতৃত্ব দেবার প্রস্তাব মহবত খান কৃতজ্ঞতার সাথে আর কোনো রকম চিন্তাভাবনা না করেই গ্রহণ করেছিল–রাজকীয় পরিবার আর তাঁদের প্রতিরক্ষা সহচরদের যখন আদেশ দেয়া হলে ওপারে পাঠবে এবং সেই সাথে সবার শেষে সে অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে নিজে সেতু অতিক্রম করবে।
সেতুর দিকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে জাহাঙ্গীর খয়েরী রঙের একটা বিশাল স্ট্যালিয়নে উপবিষ্ট বেগুনী পাগড়ি পরিহিত দীর্ঘদেহী এক রাজপুতকে লক্ষ্য করে, সেতুটা তাঁর ঘোড়ার খুরের নিচে দুলে উঠতে প্রাণীটা ঘাবড়ে গিয়ে ছটফট করে উঠে, সেতু অতিক্রম করে পুনরায় উত্তর দিকে ফিরে আসছে। সে সম্ভবত রাজপরিবারকে ওপাড়ে নিয়ে যাবার জন্য মহবত খানের কাছ থেকে রাজেশের কাছে আদেশ নিয়ে আগত বার্তাবাহক। রাজপুত অশ্বারোহী বাস্তবিকই জাহাঙ্গীরের হাতির কাছ থেকে কয়েক ফিট দূরে সাদা একটা ঘোড়ায় আড়ষ্ট ভঙ্গিতে উপবিষ্ট রাজেশের দিকে এগিয়ে যায়, এবং সম্রাট অনুভব করেন যৌবনে যুদ্ধ শুরু আগে তাঁর হৃৎপিণ্ড যেভাবে স্পন্দিত হতো ঠিক সেভাবেই একটু দ্রুত যেন স্পন্দিত হচ্ছে।
‘রাজেশ, সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীকে নদীর ওপাড়ে নিয়ে যাবার জন্য মহবত খান তোমায় আদেশ দিয়েছেন।
রাজেশ মনে হয় যেন এক যুগ ধরে ইতস্তত করে। সে তারপরে বলে, তার কণ্ঠস্বর টানটান শোনায় আর আবেগের কারণে উঠানামা করে, মহবত খানকে গিয়ে বলবে আমি পারবো না… আমি বোঝাতে চাইছি আমি করবো না…’ জাহাঙ্গীর নিরুদ্বিগ্ন হয়। মেহেরুন্নিসার পরিকল্পনা কাজ করেছে। মেহেরুন্নিসার তত্ত্বাবধানে তাঁর নিজের রাজেশের সমর্থন লাভের চেষ্টার পাশাপাশি তাকে প্ররোচিত করা আর দীর্ঘসময় ধরে করা ষড়যন্ত্র কাঙ্খিত ফল দিয়েছে। দারুণ একটা মহিলা বটে যাহোক। মেহেরুন্নিসা যদি পুরুষ হতেন তাহলে দারুণ একজন প্রতিপক্ষ হতেন নিঃসন্দেহে।
রাজেশ কথা বলা চালিয়ে যায়, এখন যখন বিরোধের সূচনা হয়েছে অনেক সহজে সে শব্দ চয়ন করতে পারে। মহবত খানকে বলবে যে রাজকীয় দায়িত্বের অধিকারী হবার কারণে, বর্তমানে অশ্বশালার প্রধানের দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ায়, কেবল সম্রাট আর সম্রাজ্ঞীর প্রতিই আমার কর্তব্য রয়েছে। সম্রাট আমায় আর আমার পঞ্চাশজন লোককে ভবিষ্যত পদোন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যদি তাঁর কাছেই আমরা কেবল জবাবদিহি করি। আমি স্থানীয় অনুগত জায়গীরদারদের বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করবো যারা সম্রাটের পক্ষে এমনকি এই মুহূর্তেও সমবেত হচ্ছে। মহবত খানের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত, কিন্তু তার প্রতি অতীত আনুগত্যের খাতিরে আমি তোমাকে নিরাপদে আর কোনো ক্ষতি না করেই ফিরে যেতে দিয়েছি তাকে গিয়ে অবশ্যই বলবে এবং সেই সাথে এটাও বলবে যে তুমি নদী অতিক্রম করার পরে তুমি আর তোমার সাথের অন্য বিদ্রোহীদের প্রতি তার ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতাবলে গুলিবর্ষণের আদেশ দানের পূর্বে আমি সম্রাটকে আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে রাজি করেছি।’
মহবত খানকেও নদীর অপর পাড়ে গভীর চিন্তায় ডুবে থাকতে দেখা যায়। জাহাঙ্গীর আর মেহেরুন্নিসা যদিও শান্তভাবেই তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নেয়া অব্যাহত রেখেছিলেন নিজের অবস্থান কীভাবে আরও জোরদার করা যায় সেই সম্বন্ধে নিজের সাথে নিজে যুক্তিতর্কের অবতারণা করতে গিয়ে সে নিজের কাছে অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। সম্রাট ঠিকই বলেছিলেন যে কর্তৃত্বের অধিকারী হবার মানেই একাকিত্ব বরণ করা। সে বুঝতে পারে অন্যদের সাথে পরামর্শ করতে বা নিজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করতে সে অপারগ, আশঙ্কা করে যে সেটা করলে বিষয়টাকে হয়তো তার সিদ্ধান্ত হীনতা বা দুর্বলতা হিসাবে দেখা হবে। একটা পর্যায়ে যা তাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি কালক্ষেপণের দিকে নিয়ে গিয়ে যাত্রাকালীন সময়ের রসদ আর খাবারের মত মামুলি বিষয়ে অত্যাধিক মাত্রায় মনোনিবেশে বাধ্য করে। সে এখন তাঁর ঘোড়াকে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে নেয় এবং নৌকার সেতুর উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত পথ অনুসরণ করে নামতে শুরু করে। সম্রাট আর সম্রাজ্ঞী অচিরেই নদী অতিক্রম করা শুরু করবেন।
সে সেতুর কাছে পৌঁছে যখন মৃদু দুলতে থাকা নৌকার সেতুর উপর দিয়ে বেগুনী পাগড়ি পরিহিত রাজপুত অশ্বারোহীকে মন্থর ভঙ্গিতে ফিরে আসতে দেখে সে বিস্মিত হয়, এবং ওপাড়ে তাকিয়ে অনুসরণ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কোনো লক্ষণ রাজপরিবারের মাঝে দেখতে ব্যর্থ হয়। এসব কি হচ্ছে? সে লাফিয়ে নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসে এবং বার্তাবাহক অশ্বারোহী সেতুর উপর থেকে নেমে আসা মাত্র তাঁর দিকে দৌড়ে যায়। তরুণ রাজপুত যোদ্ধা তোতলাতে তোতলাতে রাজেশের বক্তব্য পেশ করতে ক্রোধে মহবত খানের মুখ বিকৃত দেখায় এবং সে তাঁর অশ্বচালনার দাস্তানা সজোরে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে।
