*
কাশ্মীর ত্যাগ করতে আমার খারাপই লাগবে।’
‘যদিও আমরা এখানে বন্দি ছিলাম।’
‘হ্যাঁ। কোনো কিছুই এর সৌন্দর্যকে হরণ করতে পারবে না এবং মহবত খান আমাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল।’
‘তাকে সেই শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য কোনো মূল্য দিতে হয় নি। সে যদি আপনার কাছে জানতে চাইতো যে আপনি কাশ্মীর ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত কিনা তাহলে সেটা হতো প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন। সে তার পরিবর্তে যাত্রার দিনটা কেবল মার্জিতভাবে ঘোষণা করে গেল যেন আমরা তার ভৃত্য।
‘আমাদের পক্ষে এখানে আর বেশি দিন অবস্থান করা সম্ভব হতো না, তাঁর প্রতি কোনো ধরনের পক্ষপাত প্রদর্শন না করেও বলতেই হয়। আর কয়েক সপ্তাহের ভিতরেই গিরিপথে শীতের প্রথম তুষারপাত শুরু হয়ে যাবে।’
‘সত্যি। যাই হোক, মহবত খানের ধৃষ্টতা সত্ত্বেও, আমরা এখান থেকে বিদায় নেওয়ায় আমি আনন্দিত। আমাদের পরিকল্পনার সাফল্য সমতলে আমাদের প্রত্যাবর্তনের উপরে নির্ভর করছে। মেহেরুন্নিসা উঠে বসে এবং তাঁর স্বামীর জন্য গোলাপজলে সামান্য পরিমাণ আফিম মিশ্রিত করতে থাকে। কাশ্মীর ত্যাগ করে আমরা যখন নিচে নামতে থাকবো আপনি তখন মহবত খানের যেকোনো অনুরোধের প্রতি সম্মতি প্রদর্শনের কথাটা স্মরণ রাখবেন, আপনি পারবেন’না? পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় এখন যখন ঘনিয়ে এসেছে এটা গুরুত্বপূর্ণ যে তাঁর মনে সন্দেহ উদ্রেক করে এমন কোনো কিছুই আমরা করবো না বা বলবো না।
‘অবশ্যই। সে যাই হোক, মহবত খান খুব সামান্যই অনুরোধ করে।
‘আপনি সেই সাথে আপনার নাতিদের সামনে অবশ্যই সতর্ক থাকবেন। বাচ্চারা তাদের শোনা উচিত নয় এমন কিছু শোনার ব্যাপারে এবং তারপরে লোকজনকে মুগ্ধ করার জন্য সেটা বোকার মত বলতে ভীষণ পারদর্শী।
‘আমি কিছুই বলিনি।
‘ভালো। তারপরেও অবশ্য ঝুঁকি থেকেই যায় যে তারা তাদেরকে তাদের বাবা-মা’র কাছে ফেরত পাঠাবার বিষয়ে মহবত খানকে রাজি করাবার জন্য তাঁরা আড়ি পেতে শুনেছে এমন কিছু হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করবে–বিশেষ করে দারা শুকোহ্। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি সে মহবত খানের সাথে ঘুরতে, তাঁর কাছে যুদ্ধের গল্প শুনতে ভীষণ পছন্দ করে এবং সে সবসময়েই তাকে প্রশ্ন করতে থাকে।’
‘দারা বুদ্ধিমান আর কৌতূহলী ছেলে। আর তাছাড়া, সব বাচ্চারাই কি প্রশ্ন করে না? আমি করতাম, আমার বেশ মনে আছে। পুরোটাই বড় হয়ে উঠার একটা অংশ।’
‘সম্ভবত। কিন্তু আমাদের তারপরেও সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে আমরা যখন আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জনের নিকটবর্তী হতে শুরু করেছি।’
‘আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা যদি তোমার এসব ষড়যন্ত্রের পরিবর্তে মহবত খানের সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা, একটা সুবিধাজনক উপযোজনে উপনীত হতে পারতাম। ‘আপনি এমনভাবে বলছেন যেন মহবত খানকে বিশ্বাস করা যায়। তার মনে আসলেই কি রয়েছে সে বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’
‘তোমার নিশ্চয়ই মনে হয় না যে সে আমাদের কোনো ক্ষতি করতে চায়?
‘সে একজন মার্জিত ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং সে নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ সেনাপতি, কিন্তু একটা বিষয় কখনও ভুলে যাবেন যে সে সর্বোপরি একজন বিশ্বাসঘাতক যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে যা জোর করে নয়, আপনিই কেবল প্রদান করতে পারেন। সে সেইসাথে বিশাল একটা ঝুঁকি নিয়েছে, যা–সে যদি অকাট মূর্খ না হয়ে থাকে–সে অবশ্যই বুঝতে পেরেছে। সে যদি নিজের বিপদ বুঝতে পারে তাহলে কে জানে সে তখন ঝোঁকের বশে কি করবে? আর তাছাড়া, আমার “ষড়যন্ত্র” আপনি যে নামেই সেটাকে অভিহিত করেন পরিস্থিতির সাথে মানানসই। মেহেরুন্নিসা গোলাপজল আর আমি একটা গোলাপি বোতলে নিয়ে আঁকায় তারপরে সেখান থেকে খানিকটা ঢেলে নিয়ে সেটা তাঁর হাতে তুলে দেয় এবং তার গায়ের সূক্ষ নক্সা করা কাশ্মিরী শালটা আরেকটু ভালো করে জড়িয়ে দেয়। জাহাঙ্গীরের কাশিটা বেড়েছে এবং বাতাসে শীতের প্রকোপ বাড়ছে।
‘আপনি আমার মত আপনার ভূমিকা পালন করবেন, আপনি করবেন’না? সে আবেদনের সুরে বলে। মহবত খান আমার সম্বন্ধে ভীষণ সতর্ক কিন্তু সে আপনাকে শ্রদ্ধা করে…’
*
জাহাঙ্গীর ঝিলমের উত্তর তীর থেকে তাঁর প্রিয় হাতি বজ্রদায়িনীর হাওদায় উপবিষ্ট অবস্থায়, মহবত খান আর অশোকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। দক্ষিণের তীরে মাটির একটা ঢিবির উপরে তাঁরা দু’জন নিজ নিজ ঘোড়ায় নিরুদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে উপবিষ্ট অবস্থায়, কাশ্মীর থেকে ফিরতি পথের একেবারে শেষ পর্যায়ে ঝিলমের উপরে তাঁরা যে নতুন নৌকার সেতু নির্মাণ করেছে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছে। নদীতে এখন স্রোত অল্প এবং বসন্তের চেয়ে অনেকবেশি সংকীর্ণ এবং তারা সেতুর তলদেশ নির্মাণের জন্য দড়ি দিয়ে একসাথে বাঁধার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক নৌকা বেশ সহজেই সংগ্রহ করতে পেরেছে এবং তারপরে একত্রে বাঁধা নৌকাগুলোর উপরে অস্থায়ী ছাউনির নানা বাতিল টুকরো আর কাঠেরখণ্ড তক্তার মত বিছিয়ে দিয়েছে। আহাওয়া এখনও সদয় আচরণ করেছে এবং গিরিপথ আর উপত্যকার ভিতর দিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এসেছে। গাছের পাতা এখানে লাল আর সোনালী বর্ণ ধারণ করতে আরম্ভ করেছে এবং স্থানীয় লোকজন আপেল আর নাশপাতির ফলন ঘরে তোলা আর আঙুর ও আখরোট শুকানোর কাজও শেষ করেছে যার জন্য এই এলাকাটা পুরো ভারতবর্ষে বিখ্যাত। কৃষকেরা তাদের শস্যাগারে ভূট্টা, মূলা আর খড় রুক্ষ শীতকালের দীর্ঘ সময়টায় নিজেদের আর নিজেদের গৃহপালিত পশুদের আহারের জন্য মজুদ করছে। একটা প্রায় শান্তসমাহিত যাত্রা যা প্রায় সকলের মনকেই শান্ত করে তুলেছে। মেহেরুন্নিসা আপাতদৃষ্টিতে ফার্সী কবিতাচর্চায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে, সে কেবল জাহাঙ্গীরের জন্য অস্থায়ী ছাউনি ত্যাগ করে বাইরে থেকে শরতের ফুল আর কীটপতঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করতে পরিচারকদের আদেশ দিতে নিজের আবাসন এলাকা থেকে বাইরে বের হোন, সে মহবত খানকে জানিয়েছে যে সম্রাট শরতের সৌন্দর্যে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন উদ্যমে প্রাকৃতিক জগৎ সম্বন্ধে তাঁর চর্চা আবার শুরু করেছেন।
