জাহাঙ্গীর একবার মাত্র একবারই মহবত খানকে তার বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন। তারা দুজনে একদিন ডাল হ্রদের তীরে ঘোড়ায় চেপে পাশাপাশি ভ্রমণ করছিলো, দেহরক্ষীরা তাঁদের একটু পিছনে অবস্থান করছে তাদের উভয়ের সাথে সবসময়ে যাদের অবস্থান করা সম্রাটের পলায়ন রোধ করার ক্ষেত্রে আর আততায়ীর হাত থেকে তাঁর নিজের সুরক্ষার কারণে মহবত খানের কাছে বিচক্ষণতার পরিচায়ক বলে মনে হয়েছে, যখন জাহাঙ্গীর সহসা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মহবত খান, তুমি কি এখনও যা চাও সেটা চাইবার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে শিখেছো? আমিও অসীম ক্ষমতার অধিকারী হতে চাইতাম যখন সেটা তখনও আমার হয়নি। আর আমি যখন সেটার অধিকারী হলাম, আমি দেখলাম সেই ক্ষমতা নিয়ে কি করবো সেটা ঠিক করা আরো বেশি কঠিন, কাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করবো এমনকি নিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠদের ভিতরে যারা রয়েছে তাদের বিষয়েও কখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারি নি।
মহবত খান এই স্বীকারোক্তির সততা অনুধাবন করে মুখ কুঁচকায় কিন্তু জাহাঙ্গীর বোধহয় সেটা লক্ষ্য করেননি এবং তিনি বলতে থাকেন, ‘ক্ষমতা বেশিরভাগ লোকেরই অবক্ষয় ঘটায়। আমি জানি আমার ক্ষেত্রে এটা হয়েছে, আর সেজন্যই আমার স্ত্রীর প্রস্তুত করা আফিম আর সুরার মিশ্রণের ভিতর দিয়ে এর কেন্দ্র থেকে সরে যেতে পেরে আমি আনন্দিত। সম্রাজ্ঞীর উপরে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব অর্পণ করাটা ছিল পরম স্বস্তিদায়ক আর তিনিও এখন সেই দায়িত্ব থেকে মুক্ত কারণ তুমি সেটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আমি তোমায় সতর্ক করে দিতে চাই, ক্ষমতা নিঃসঙ্গতার দ্যোতক–বা আমার কাছে অন্তত তাই মনে হয়েছে। জাহাঙ্গীর এক মুহূর্ত কি যেন ভাবে তারপরে আবার বলতে শুরু করে। সম্ভবত আমি যে সময় এটা লাভ করেছিলাম ততদিনে আমি নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করতে শুরু করায় সেটা আরও বেশি করে মনে হয়েছিল। আমার দাদিজান হামিদা সদ্য মৃত্যুবরণ করেছেন–আমার একটা বিশাল আশ্রয়স্থল ছিলেন– অবশ্যই আমার আব্বাজানের মতই… যদিও আজ পর্যন্ত আমি জানি না তিনি আমায় কি আসলেই ভালোবাসতেন–এবং আমি তারপরেই আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, আমার দুধ-ভাই সুলেমান বেগকে হারাই। আমার কোনো সন্তানের সাথে আমার কোনো ধরনের ঘনিষ্ঠতা জন্মায় নি বা আমার স্ত্রীদের সাথে। আমি কিছু দিন আমার কর্তৃত্বের মাঝে মহিমান্বিত হয়ে ছিলাম আর কখনও–এখন আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই–ক্ষমতার প্রয়োগে ছিলাম নির্মম আর খামখেয়ালী। তারপরে আমি মেহেরুন্নিসাকে বিয়ে করি। আমি তাকে ভালোবাসতাম এবং এখনও ভালোবাসি। আমার বিশ্বাস, তিনিও, আমায় ভালোবাসেন…আমায় সেই সাথে আমার ক্ষমতাকেও ভালোবাসেন। তিনি যত বেশি ক্ষমতার অধিকারী হতে চেয়েছেন আমি তার হাতে ততবেশি ক্ষমতা তুলে দিয়েছি। আমি কি ভুল করেছিলাম…?
জাহাঙ্গীর যত দীর্ঘ সময় কথা বলে তাঁর কণ্ঠস্বর ততই সমাহিত এবং অন্তবীক্ষপ্রবণ হয়ে উঠে আর একটা পর্যায়ে তিনি কথা বন্ধ করে সূর্যের আলোয় ডাল হ্রদের ঝিকমিক করতে থাকা পানির মাঝামাঝি কোথাও একটা অনির্ণেয় বিন্দুর দিকে আবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। মহবত খান কোনো উত্তর দেয় না এবং জানে যেকোনো উত্তর প্রত্যাশা করাও হয় নি বা তার কোনো প্রয়োজনও নেই।
সম্রাজ্ঞীর কি মনোভাব? সে ভাবতে চেষ্টা করে। সে যখনই জাহাঙ্গীরের সাথে কথা বলার সুযোগ পেতো তখনই তিনি সেখানে নিয়মিতভাবেই উপস্থিত থাকতেন এবং তাঁর সামনে কোনো ধরনের পর্দা বজায় রাখার ভান। পুরোপুরি ত্যাগ করতেন, যদিও বাকি সময় তিনি হেরেমের নির্জনতার মাঝে প্রত্যাবর্তন করতেন। তাঁদের যখনই দেখা হয়েছে তিনি অকপট চোখে তার চোখের দিকে তাকিয়েছেন এবং কখনও কখনও বিশেষ করে যখন তিনি বলতেন যে সম্রাটের ক্ষমতা তিনি ধারণ করেন, যে তিনি তাঁরই আদেশ পালন করেন, তাঁর চোখে সে যে অভিব্যক্তি দেখেছে তাকে কল্পনা করতে বাধ্য করেছে যে নিয়ন্ত্রণ লাভের একটা অনুষঙ্গ হিসাবে তাকেও প্রলুব্ধ করার ধারণা কখনও হয়ত তিনি অলস মনে চিন্তা করেছেন। তাঁর এখন মাত্র চল্লিশ বছর বয়স, তাঁর নিজের চেয়ে বয়সে মাত্র কয়েক বছরের বড় এবং রমণীদের যখন বয়স হয় বা তাদের শরীরে মেদ জমে তখন প্রায়শই যেমন হয়ে থাকে যে মোমবাতির গা বেয়ে গড়িয়ে নামা মোমের মত তাঁদের মাংসপেশী ঝুলে পরতে শুরু করে তেমনটা তার ক্ষেত্রে এখনও হয় নি। সে অবশ্য প্ররোচনার ধারণাটা কল্পনা হিসাবে বিবেচনা করে মন থেকে কঠোর ভাবে ঝেড়ে ফেলে কিন্তু তারপরেও এখনও তাদের যখন দেখা হয় সেই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। তিনি যখন মৃদু কণ্ঠে কথা বলেন এবং হাসেন সে সাধারণত, কোনো অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই, তার অনুরোধের প্রতি সম্মতি দেয়, যেমনটা অবশিষ্ট দেহরক্ষীদের মোতায়েন রাখার ক্ষেত্রে দিয়েছে।
তিনি কি সম্রাটকে ভালোবাসেন? হ্যাঁ, সম্ভবত তিনি তাকে ভালোবাসেন। তিনি অবশ্য তাকে আফিমে আসক্ত করে তুলেছেন। তিনি অবশ্যই সম্রাটের ক্ষমতা উপভোগই করেন এবং মোটেই লাজুক নন তার ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাপারটা মানুষকে জানাতে। সে বহুবার এটা প্রত্যক্ষ করেছে। অবশ্য তিনি যখন তাঁর কপাল মুছে দেন বা তার অসুস্থতার সময়ে তিনি যখন তার সামনে থুতু ফেলার জন্য পিকদানি তুলে ধরেন তখন সে তার চোখে মুখে ভালোবাসার ছায়া দেখতে পেয়েছে। তাঁর নিজের মত বোধহয় তাঁরও অভিপ্রায়গুলো তালগোল পাকান। তারা যখন দক্ষিণে লাহোর অভিমুখে ফিরতি পথে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করবে তখন হয়তো সবকিছু অনেক প্রাঞ্জল হয়ে উঠবে, যা আর বেশি দিন বিলম্বিত করা যাবে না। রাতের বেলা আজকাল বেশ শীত পড়ছে এবং শরতকাল প্রায় শেষ হয়ে আসছে। তাকেও ততদিনে নিজের কর্তব্য করণীয় সম্বন্ধে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। সম্রাটকে তার দলবলসহ বন্দি করার বিষয়ে সে সতর্কতার সাথে পরিকল্পনা করেছিল, সে অনুধাবন করে নিজের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্বন্ধে সে যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা করে নি আর এখন কীভাবে নতুন মিত্র অর্জন করা যায় আর ক্ষমতার বলয়ে নিজের জন্য একটা নিরাপদ স্থান সৃষ্টির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হীনতার কারণে সে প্রায় অথর্ব হয়ে পড়েছে। কাশ্মীরে তার আগমনের পরে আসফ খানের নিকট তাঁর জামাতার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য বার্তা প্রেরণ করা ছাড়া সে আর কিছুই মূলত করে নি, চিঠিতে সে খুররমকে তাঁর সন্তানদের সুস্বাস্থ্য আর তাঁদের সাথে ভালো আচরণের বিষয়ে নিশ্চিত করেছে এবং রাজপরিবারের প্রতি তাঁর সার্বিক আনুগত্যের সাথে সাথে খুররমের অবস্থান বিশেষভাবে অনুধাবনের বিষয়ও জানিয়েছে। মহবত খান গভীরভাবে চিন্তা করে তার মন ঠিক করে যে এক সপ্তাহের ভিতরে নিচের সমতলের উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রা শুরু করা উচিত।
