‘আপনার দেহরক্ষীদের একজন আমায় বলেছে যে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আপনি পানিতে পড়ার সাথে সাথে হাতিটার দুই মাহুতের একজন জন্তুটার গলা থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায় এবং অন্যজন, সম্ভবত আহত হওয়ায়, জটাকে ঠিকমত নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। হাতিটা ঘুরে আবার মাঝনদীর দিকে চলে গিয়েছে এবং প্রহরীরা সেটাকে আর দেখতে পায় নি।
‘হাতির পিঠে আমাদের মহামান্য সম্রাজ্ঞী ছিলেন, মহবত খান হঠাৎ বলে বসে, বিশাল হাতিটা বা তার পিঠের সোনালী হাওদার সামান্যতম চিহ্নের খোঁজে তাঁর দৃষ্টি নদীর বুকে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের অবশ্যই হাতিটা খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের জানতেই হবে তিনি জীবিত না মৃত।
‘আমাকে জন্মের পর মৃত্যুবরণের জন্য পরিত্যাগ করা হয়েছিল কিন্তু আমি মারা যাই নি। মহবত খান আমাকে হত্যা করা তোমার পক্ষে সম্ভব না, তার পেছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। মহবত খান বিস্ময়ে চমকে উঠে এবং ঘুরে দাঁড়ায়। যুদ্ধের হট্টগোল আর নদীর বুকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে থাকার কারণে একজন বন্দি নিয়ে তাঁর দেহরক্ষীদের এগিয়ে আসবার শব্দ সে শুনতে পায় নি। মেহেরুন্নিসা বন্দি হলেও তাকে অনুত্তেজিত দেখায়।
মহবত খান তোমায় হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমায় মার্জনা করবে। আমি এইবার তোমাদের হাতে ধরা দিয়েছি নিজের স্বার্থের কারণে ভয়ে নয়। আমায় এখন আমার স্বামীর কাছে নিয়ে চল। আমি আমার লোকদের ইতিমধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছি। কেবল মনে রাখবে তোমার এই ‘বিজয় সাময়িক।
২.০৮ বিভেদের সূচনালগ্ন
‘জাহাপনা, আমি আবারও আপনার সমঝোতার জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। রাজেশ অশ্বশালার আধিকারিক হিসাবে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করবে–নিঃসন্দেহে আলিম দাসের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সাথে লোকটা একে দূর্নীতিপরায়ণ তার উপরে ঘোড়াও ঠিকমত চিনে না। মহবত জান মাথা নত করে অভিবাদন জানায় এবং তারপরে ঘুরে দাঁড়িয়ে দরবার হল ত্যাগ করে। জাহাঙ্গীর এত সহজে রাজেশকে বহাল করতে রাজি হয়েছে দেখে সে অবাক হয়েছে। বস্তুত পক্ষে ঘোড়া সম্পর্কে রাজেশের জ্ঞান পূর্ববতী আধিকারিকের চেয়ে সামান্যই বেশি আর তার মাঝেও অর্থগৃধনুতার লক্ষণ রয়েছে এবং নিজের অবস্থান ব্যবহার করে সেও হয়তো লাভবান হতে চেষ্টা করবে। অল্প কয়েকজন আধিকারিকই এর উপরে উঠতে পারে। কিন্তু নিদেন পক্ষে সে খারাপ না, আর তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আধিকারিকের জন্য এই বহালটা একটা উপযুক্ত পুরষ্কার।
শ্রীনগরের হরি প্রাবত দূর্গে নিজের বিলাসবহুল আবাসন কক্ষের দিকে সে হেঁটে যাবার সময়, মহবত খান রাজপরিবারকে বন্দি করার পরের মাসগুলোর ঘটনাবলী গভীরভাবে ভাবে। সে অনেক ভাবনা চিন্তার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাঁরা একসাথেই শ্রীনগর অভিমুখে তাদের যাত্রা অব্যাহত রাখবে। তারা তাদের স্বাভাবিক যাত্রা বজায় রাখলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হবে যে কোথাও কোনো অনভিপ্রেত অনাকাঙ্খিত কিছু ঘটে নি সেই সাথে তারা যদি আগ্রা বা লাহোর ফিরে যায় তাহলে কীভাবে অন্যান্য অমাত্য আর আধিকারিকদের প্রশ্নের উত্তর দেবে সেই দায় থেকে তাকে মুক্তি দেবে। কাশ্মীরের সুবেদার তার একজন পুরান সহযোদ্ধা এবং পারস্যের তাবরীজ থেকে আগত। সে উভয় কারণেই তাকে সম্ভাব্য সমব্যথী হিসাবে ভেবে নিয়েছে এবং সেটাই হয়েছে, অবশ্য দামী উপহার আর পদোন্নতির প্রস্তাবে সেটা আরও জোরদার হয়েছে।
তাঁর নিজের কাছে সবচেয়ে কঠিন হয়ে দেখা দিয়েছে–এবং এখনও সেটার সমাধান হয়নি–নিজের এই নতুন প্রাপ্ত ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করবে সেটা নিয়ে; কীভাবে তাঁর এই নিয়ন্ত্রণকে অস্থায়ী তকমা মুক্ত করা যায়। সে জাহাঙ্গীর বা মেহেরুন্নিসার সাথে যখন কথা বলে তারা তাঁর পরামর্শ বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়। তারা কেবল একবারই আপত্তি জানিয়েছিল যখন সে তাদের কয়েকজন ঘনিষ্ট পরিচারককে পরিবর্তনের বা কাশ্মীর যাত্রায় তাদের সাথে আগত অবশিষ্ট দেহরক্ষীদের বরখাস্ত করার প্রস্তাব করেছিল। সে তাদের অভিপ্রায় বাহ্যিক ভাবমূর্তির কারণে মেনে নিয়েছিল এবং তাদের পরিচারক আর দেহরক্ষীরা তাঁদের সাথেই রয়েছে।
জাহাঙ্গীরের স্বাস্থ্য অবশ্য বেশ দুর্বল। তিনি সামান্যই আহার করেন কিন্তু আফিম আর সুরা পানের মাত্রা তাঁর দিন দিন বেড়েই চলেছে। মহবত খান চোখের সামনে দেখতে পায় যে আটান্ন বছর বয়সের একজন পুরুষের পুরো দেহে মাদকের বাহুল্য তাঁদের ছাপ ফেলতে শুরু করেছে। দিনের অধিকাংশ সময় পারিপার্শ্বিকের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ আর ঝাপসা চোখের পাশাপাশি আজকাল প্রায়ই কাশির দমকে তাঁর শরীর কুঁকড়ে যায়। তিনি অবশ্য এখনও দাবি করেন যে কাশ্মীরের পাহাড়ী বাতাসে তাঁর ফুসফুস পরিষ্কার হয়ে যাবে, কিন্তু মহবত খানের মনে হয় সুন্দর পাহাড়ী উপত্যকার উপকারী প্রভাব কার্যকর হতে বেশি সময় নিচ্ছে।
সম্রাট এখনও অবশ্য মাঝে মাঝে যখন তিনি মাদকের প্রভাব থেকে মোটামুটি মুক্ত থাকেন, তখন সামরিক বিষয়ে বিচক্ষণ পরামর্শ দিয়ে এবং তাঁর অমাত্য আর আধিকারিকদের চরিত্র এবং ব্যর্থতা সম্বন্ধে তীক্ষ্ণ মন্তব্য করে মহবত খানকে চমকে দেন। গাছপালা আর পশুপাখি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের নিয়মকানুন বিশেষ করে কাশ্মীর সম্বন্ধে সম্রাটের বিশদ জ্ঞান দেখে পার্সী সেনাপতি যারপরনাই মুগ্ধ হয়।
