সে তখন দেখতে পায় গুলি কোথা থেকে করা হচ্ছে–প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে নদীর ভেতর দিয়ে মন্থর গতিতে অগ্রসর হতে থাকা একটা অতিকায় পিঠের গিল্টি করা হাওদা। হাওদায় চারটা অবয়র দেখা যায়। সামনে যে রয়েছে তার পরনে কালো রঙের আলখাল্লা। হাওদায় উপস্থিত বাকি তিনজন আদতে পরিচারক, দু’জন ব্যগ্রতার সাথে লোহার শিক দিয়ে গাদাবন্দুকের নলে সীসার বল প্রবিষ্ট করছে তৃতীয় জন গুলি ভর্তি বন্দুক আলখাল্লা পরিহিত অবয়বের সাথে সেটা তুলে দিচ্ছে। মহামান্য সম্রাজ্ঞী, মহবত খান সাথে সাথে বুঝতে পারে। সে সহজাত প্রবৃত্তির বশে এটাও বুঝে যে তিনিও তাকে চিনতে পেরেছেন। ব্যাঘ শিকারী হিসাবে তাঁর দক্ষতা সম্বন্ধে ভালোমতই অবহিত থাকার কারণে সে চেষ্টা করে নিজেকে কুঁকড়ে ছোট করে ফেলতে, নিজের ঘোড়ার কাঁধের উপর নুয়ে পড়ে দুহাতে জন্তুটার গলা আঁকড়ে ধরে। কিন্তু কিছুক্ষণের ভিতরে সে তীক্ষ্ণ একটা যন্ত্রণা অনুভব করে আর সাথে সাথে তার ডান হাতের উৰ্দ্ধাংশ অবশ হয়ে যায় আর ঘোড়াটা সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সে আর তার বাহন উভয়েই আহত হয়েছে।
সে সাথে সাথে নিজেকে শীতল পানিতে আবিষ্কার করে, স্রোতের টানে ভাটির দিকে ভেসে চলেছে। সে ঘোড়া থেকে ছেটকে যাবার সময় যদিও মাথার শিরোস্ত্রাণ হারিয়েছে কিন্তু দেহ রক্ষাকারী বর্মের ভারে সে পানির নিচে তলিয়ে যেতে থাকে। তার কানের ফুটো আর নাসারন্ধ্রে পানি প্রবেশ করেছে এবং সে বহু কষ্টে নিজের মুখ বন্ধ রাখে। তাঁর কানের ভিতরে ততক্ষণে দপদপ যন্ত্রণা শুরু হয়েছে আর তার ফুসফুস বুঝি ফেটে যাবে। তাকে দ্রুত কিছু একটা করে বুকের বর্মটার হাত থেকে রেহাই পেতে হবে। নতুবা পানিতে ডুবে মরার হাত থেকে কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। আঘাত পাওয়া সত্ত্বে সে এখনও নিজের ডান হাত নাড়াতে পারে এবং সে। তার কোমরে গোঁজা খঞ্জরটা হাতড়াতে থাকে। সেটা খুঁজে পাবার পরে সে সাবধানে খঞ্জরটার জেড পাথরের বাটের চারপাশ আঙুল দিয়ে ভালো করে। আঁকড়ে ধরে যাতে ময়ান থেকে টেনে বের করার সময় সেটা তার হাত থেকে পিছলে পড়ে না যায়। বেশ সহজেই খঞ্জরটা বের হয়ে আসে এবং সে প্রথমে একটা বাঁধন কাটে তারপরে দেহের বামপাশে বর্মের আরেকটা চামড়ার বাঁধন কেটে দেয়। বর্মটার একপাশ খুলে যেতে পানির স্রোত সেটা লুফে নেয় এবং ডানপাশের বাঁধন তখনও অটুট থাকায় সে নিজেকে পুরোপুরি বর্মটার হাত থেকে আলাদা করার আগে ঘুরপাক খেতে খেতে পানির নিচে আরও তলিয়ে যায়। সে হাত পা ছুঁড়ে পানির উপর ভেসে উঠে এবং বুক ভরে শ্বাস নেয় কেবল আরেকটা তীক্ষ্ণ আঘাত অনুভব করার জন্য এবং তারপরে পিঠের মাঝামাঝি আরেকটা।
সে আরেকটা ভাসমান দেহের সাথে পেচিয়ে যেতে শুরু করেছে–মরণ যন্ত্রণায় পা ছুঁড়তে থাকা একটা মরণাপন্ন ঘোড়া। মহবত খান বড় একটা শ্বাস নিয়ে আবার পানিতে ডুব দেয় এবার ঘোড়ার দেহের নিচে এবং নদীর তলদেশের একটা পাথর আঁকড়ে সেখানেই অবস্থান করে যতক্ষণ না পানির স্রোতে ঘোড়ার দেহটা ভেসে যায়। সে আবার পানির উপর ভেসে উঠে এবং নদীর পানিতে সাঁতার কাটার ভুল করে বসে। শ্যাওলা আবৃত পিচ্ছিল একটা পাথরে তার পা পিছলে যায় আর সে আবারও পানিতে তলিয়ে যায়। সে এইবার আর ভুল করে না নিজের সামান্য সাঁতারের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তীরের দিকে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু সে নদীর বাঁকের কাছে পৌঁছে গিয়েছে এবং স্রোতের বেগ হ্রাস পেতে শুরু করেছে। সে নিজের শেষ শক্তিটুকু কাজে লাগিয়ে কোনোমতে অগভীর পানিতে পৌঁছায় এবং হাচড়পাঁচড় করে উঠে দাঁড়ায় তার ভেজা কাপড় থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ার সময় ডান হাতের ক্ষতস্থান থেকে পড়তে থাকা রক্তের সাথে মিশে যায়।
সে নদীর কর্দমাক্ত তীরে বসে ক্ষতস্থানটা পরীক্ষা করে। সে চর্বি আর লালচে মাংসপেশী দেখতে পেলেও কোনো হাড় দেখতে পায় না। আল্লাহতালা মেহেরবান, কেবল ক্ষতটা কেবল মাংসপেশীতে হয়েছে। সে তারপরে বুকের বর্মের ঘর্ষণজনিত ক্ষত পরিহার করতে গলায় জড়ানো হলুদ পশমের কাপড়টা খুলে নেয়। কাপড়টা পানিতে ভিজে জবজব করছে কিন্তু বামহাতে সে বহু কসরত করে অবশেষে সেটা নিংড়ে নেয় এবং দাঁতের সাহায্যে ডান হাতের ক্ষতস্থানে কোনোমতে সেটা বেধে দেয়। সে তারপরে পেছন থেকে আগত একজন অশ্বারোহীর ছায়া দেখতে পায়। সে নিমেষে বুঝতে পারে অশ্বারোহী যদি সম্রাটের সৈন্য হয় তাহলে তাঁর দফারফা হয়ে যাবে কিন্তু সে যখন ঘুরে দাঁড়ায় সে পরম স্বস্তির সাথে লক্ষ্য করে ব্যাপারটা সেরকম নয়। তাঁর দেহরক্ষীদের একজন খেয়াল করেছিল যে সে পানিতে পড়ে গিয়েছে এবং সে যদি কোনোক্রমে তীরে ভেসে আসে সেজন্য তাকে অনুসরণ করে ভাটিতে এসেছে।
মহামান্য সেনাপতি আপনি সুস্থ আছেন?’ লোকটা জিজ্ঞেস করে।
‘আমার তাইতো মনে হয়, সে বলে যদিও শীত আর আঘাতজনিত অভ্যাঘাতের কারণে সে ইতিমধ্যেই কাঁপতে শুরু করেছে। তোমার ঘোড়াটা আমায় দাও, সে একটু থেমে আবার যোগ করে। সে কোনোমতে উঠে দাঁড়ালে তাঁর হাঁটু দেহের ভর নিতে অস্বীকার করতে সে আবারও মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অশ্বারোহী দ্রুত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসে এবং সে তার কাছে পৌঁছাবার আগেই মহবত খান আবারও পায়ের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তাঁর হাঁটু এইবার দেহের ভর নিতে পারে এবং সে টলমল করতে করতে ঘোড়ার দিকে এগিয়ে যায়। দেহরক্ষীর কাছ থেকে সামান্য সাহায্য নিয়ে সে চার হাতপায়ের সাহায্যে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে। তার পা এতই ঠাণ্ডা হয়ে আছে যে সে তাদের অস্তিত্ব প্রায় অনুভবই করতে পারে না কিন্তু তারপরেও আড়ষ্ট ভঙ্গিতে সে রেকাবে পা রাখে এবং দেহরক্ষীকে উচ্চকণ্ঠে ধন্যবাদ জানিয়ে নদীর অগভীর অংশের চারপাশে চলতে থাকা যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ফিরে যেতে শুরু করে। জায়গাটা খুব একটা দূরে নয় এবং সে বুঝতে পারে গুলিবিদ্ধ হয়ে পানিতে আঁছড়ে পড়ার পড়ে খুব সম্ভবত সোয়া ঘন্টা সময় অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এটা দীর্ঘ সময়। সে যতটা বুঝতে পারে তার লোকেরা আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে, সংখ্যাধিক্যের কারণে আর তাদের প্রতিপক্ষকে গুলিবর্ষণের মুখে নদী অতিক্রম করতে হয়েছে বিধায় সেটাই হওয়া উচিত। সে তারপরে রাজেশকে দেখতে পায় এবং ঘোড়া নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যায় এবং শ্রবণ সীমার মধ্যে পৌঁছাতে সে চিৎকার করে জানতে চায়, সোনালী হাওদার হাতিটার কি খবর?
