মহবত খান যুদ্ধবাজ প্রাণীর প্রথম দলটাকে নদীতে নামতে দেখেন, যেখানে নদী প্রায় আশি গজ প্রশস্ত, তিনটা রণহস্তীর একটা দল যাদের প্রত্যেকের দেহ আর মস্তক ইস্পাতের আবরণ দ্বারা আবৃত এবং লাল রঙ করা গজদন্তে ধারালো তরবারি সন্নিবিষ্ট রয়েছে। প্রত্যেকের জন্য দু’জন করে মাহুত রয়েছে যারা তার কানের পেছনে বসে রয়েছে আর নিজেদের অরক্ষিত অবস্থানের কারণে যতটা সম্ভব কুঁকড়ে রয়েছে নিজেদের যতটা সম্ভব ছোট নিশানায় পরিণত করতে। প্রত্যেকটা হাতির পিঠে উন্মুক্ত কাঠের হাওদায় পাঁচজন করে তবকি গাদাগাদি করে অবস্থান করছে। আরো দুটো হাতি প্রথম দলটাকে অনুসরণ করে শীতল পানিতে নামে এবং মহবত খান দেখে যে পেছনে আরো বিশটা কি ত্রিশটা হাতি সারিবদ্ধ অবস্থায় অপেক্ষা করছে। সে ভাবে হাতিগুলোর কিছু হয়তো মালবহনের কাজে ব্যবহৃত হয় যাদের এখন অপরিচিত ভূমিকা পালনের জন্য বাধ্য করা হয়েছে। নদীর তীরে শতাধিক অশ্বারোহী যোদ্ধা সমবেত হয়েছে আর তাদের খুরের আঘাতে জায়গাটা কাদায় পরিণত হয়েছে। তাদের অনেকেই লম্বা বর্শা বহন করছে যার অগ্রভাগে মোগলদের সবুজ নিশান সংযুক্ত রয়েছে। প্রথম সারির মধ্যের হাতিটা কেবল দশ গজ মত অগ্রসর হয়েছে এবং তাঁর লোকেরা এখন গুলিবর্ষণ করা থেকে নিজেদের সংবরণ করে রেখেছে যখন তার বন্দিরা নদীর তলদেশে যে গর্তের কথা বলেছিল খুব সম্ভবত সেগুলোর একটায় জটা সে প্রাণীটাকে হোঁচট খেতে দেখে। প্রাণীটা এমন ভয়ঙ্কর ভাবে দুলে উঠে যে তার পিঠের খোলা হাওদা থেকে দু’জন তবকি দ্রুত বহমান পানিতে আঁছড়ে পড়ে ভাটিতে নৌকার তৈরি সেতুর পোড়া অবশিষ্টাংশের দিকে ভেসে যায়।
মহবত খান জানেন এটাই তার সুযোগ এবং চিৎকার করে গুলিবর্ষণ শুরু করার আদেশ দেন। তবকি আর তীরন্দাজেরা নদী তীরের মাটির ঢালের পেছন থেকে বের হয়ে আসে এবং তাঁদের কাজ শুরু করে। গুলির প্রথম ঝাপটার কয়েকটা সামনের আরেকটা হাতির দুই মাহুতকেই ধরাশায়ী করে আর তারা উভয়েই ঝিলমের ঘুরপাক খাওয়া পানির স্রোতে আছড়ে পড়তে পানি ছিটকে উঠে আর চালকবিহীন জন্তুটা তখন আতঙ্কে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে যেখান থেকে এসেছে সেই উত্তরের তীরের দিকে পুনরায় ফিরে যাবার চেষ্টা করে। জটা ঘুরে দাঁড়াতে সেও পিছলে যায় এবং তার বাম কাঁধ পানির নিচে নিমজ্জিত হয়। ভারি বর্মের কারণে বাধাগ্রস্থ হয়ে সে পুরোপুরি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং পানিতে আধা নিমজ্জিত অবস্থায় ভেসে যায় আর ডুবতে শুরু করলে এর হাওদায় অবস্থানরত তবকিরা পানিতে লাফিয়ে নেমে সাঁতরে যতটা সম্ভব নিজেদের জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করে। প্রথম সারির অবশিষ্ট শেষ হাতিটা অবশ্য অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রাখে সেইসাথে তার পেছনে অবস্থানরত হাতিগুলোও যতক্ষণ না গজলের একটা গোলা চতুর্থ সারির একটা একটা হাতিকে তাঁর মুখের অরক্ষিত অংশে আঘাত করে এবং সেও পানিতে আছড়ে পড়ে ঝিলমের জন্তুটার রক্তে ঝিলমের সবুজাভ পানিতে ছোপ ছোপ দাগের সৃষ্টি হয়।
রাজকীয় অশ্বারোহী বাহিনীর অসংখ্য যোদ্ধা ইতিমধ্যে পানিতে নেমেছে এবং তারা আর তাঁদের বাহন হোঁচট খেতে থাকা হাতির পালকে পাশ কাটিয়ে কখনও হেঁটে, কখনওবা সাঁতার কেটে বেশ ভালোই অগ্রসর হতে থাকে। অশ্বারোহীদের কেউ কেউ এমনকি সাহসিকতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে রেকাবের উপর দাঁড়ায় তীর নিক্ষেপ করতে বা–মহবত খানকে মনে মনে বিস্মিত করে–একজন এমনকি লম্বা ব্যারেলের গাদা বন্দুক থেকেও গুলি বর্ষণ করে। মহবত খানের দুই কি তিনজন তবকি ধরাশায়ী হয় এবং ইতিমধ্যে অন্যরা বন্দুকে গুলি ভরার কাজে ব্যস্ত থাকায় নদী তীরের তার দিক থেকে গুলি বর্ষণের হার হ্রাস পায়। এই সুযোগে বেশ কয়েকজন রাজকীয় অশ্বারোহী নদী অতিক্রম করে এপাড়ে চলে আসে।
‘আক্রমণ করো!’ মহবত খান চিৎকার করে উঠে এবং সে তাঁর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের সম্মুখে অবস্থান করে নদীর কর্দমাক্ত তীরের দিকে ধেয়ে নামতে থাকে পানি থেকে উঠে আসা রাজকীয় অশ্বারোহী যোদ্ধাদের আক্রমণ করতে। তাঁর তরবারির প্রথম আঘাত প্রতিপক্ষের একজনের বুকের বর্মে লেগে প্রতিহত হয় কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় আঘাত খয়েরী রঙের একটা ঘোড়ার গলায় গেঁথে গেলে হতভাগ্য জন্তুটা সাথে সাথে পিঠের আরোহীকে শূন্যে নিক্ষিপ্ত করে মাটিতে আঁছড়ে পড়ে। জন্তুটা কিছুক্ষণের জন্য পানির অগভীর অংশে পড়ে থেকে পা ছুঁড়ে, গলার ক্ষতস্থান থেকে গলগল করে রক্ত বের হয়ে পানিতে মিশে যায় কিন্তু তারপরেই নিথর হয়ে যায়। তার চারপাশে নদীর কিনারে অশ্বারোহী যোদ্ধারা লড়াই করছে। একটা ঘোড়া সেখানে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে তাঁর পিঠের রাজকীয় যোদ্ধা পিছলে যায়; একটু দূরে তার এক রাজপুত যোদ্ধা পর্যাণ থেকে ছিটকে যায়, রান্নার জন্য মুরগী শলাকাবিদ্ধ করার মত এক রাজকীয় যোদ্ধা তাকে গেঁথে ফেলে। অন্যত্র দুজন যোদ্ধা অগভীর পানিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে, তারা পানিতে একে অপরের মাথা চেপে ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে কেবলই গড়াতে থাকে। একজন তারপরে খঞ্জর বের করতে সক্ষম হয় এবং প্রতিপক্ষের পাঁজরের ঠিক নিচে সেটা আমূল ঢুকিয়ে দেয়। পানিতে আবারও রক্ত এসে মিশে। বিজয়ী যোদ্ধা–মহবত খান স্বস্তির সাথে তাকিয়ে দেখে তাঁরই একজন রাজপুত যোদ্ধা–নিজের উপর থেকে মরণাপন্ন প্রতিপক্ষের দেহটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সারা দেহ থেকে পানি ঝরে পড়া অবস্থায় টলতে টলতে নদী থেকে উঠে আসতে শুরু করে। কিন্তু মহবত খানের স্বস্তি হতাশায় পরিণত হয় লোকটা যখন সহসা হাত দুপাশে ছড়িয়ে দিয়ে পেছনের দিকে উল্টে পড়ে এবং স্রোতের টানে সাথে সাথে ভেসে চলে যায়। আরেকজন রাজপুত যোদ্ধা মহবত খানের এত কাছে প্রায় সাথে সাথেই ঘোড়া থেকে নিচে আঁছড়ে পড়ে যে তাঁর পতনের ফলে ছিটকে উঠা শীতল পানি তাকে প্রায় ভিজিয়ে দেয়। সে চারপাশে তাকিয়ে এহেন নিখুঁত লক্ষ্যভেদের উৎস খোঁজার চেষ্টা করে এবং সে যখন সেটা খুঁজে পায় তার মাথার উপর দিয়ে গাদাবন্দুকের আরেকটা গুলি ভয়াল শিস তুলে উড়ে যায়।
