‘আমার আব্বাজান বলেছেন তিনি কেবল নিজের স্বার্থের কথাই বিবেচনা করেন, দারা শুকোহ্ বলতে থাকে। তিনি সেজন্যই আপনাকে এমন মদ্যপ করে তুলেছেন–যাতে করে তিনি নিজে সব আদেশ দিতে পারেন। তিনি আমাকে বলেছেন কখনও যেন তাকে বিশ্বাস না করি… এবং আমি করিওনা। আমি আর আমার ভাই বাসায় যেতে চাই।’
‘অনেক হয়েছে! আমি তোমাদের আমার কাছে নিয়ে আসতে বলেছিলাম কারণ আমার মনে হয়েছিল তোমরা বোধহয় ভয় পেয়েছো আর এভাবে তোমরা তাঁর প্রতিদান দিলে। দারা শুকোহ্ আমাদের এই বিপদ যখন কেটে যাবে তখন আমি ভুলে যাবার চেষ্টা করবো তুমি এইমাত্র যা বলেছে। কিন্তু আমি দুঃখ পেয়েছি যে আমার ছেলে নিজের মত তোমাদেরও অকৃতজ্ঞ আর উদ্ধত হবার শিক্ষাই দিয়েছে।
জাহাঙ্গীর ঘুরে দাঁড়িয়ে গভীর একটা শ্বাস নেয়। দারা শুকোহর উগ্রতা তাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
*
‘সর্বাধিকারী, নদীর তীর বরাবর তাঁরা এগিয়ে আসছে, মহবত খানের একজন অধস্তন যোদ্ধা পরের দিন সকাল হবার ঘন্টা দুয়েক পরে চিৎকার করে জানায়। মহবত খান তাঁর গুপ্তদূতদের সতর্কতার সাথে অপর তীরের সৈন্য সমাবেশের উপর নজর রাখার আদেশ দিয়েছেন মেহেরুন্নিসা আর জাহাঙ্গীরের দেহরক্ষী বাহিনীর যোদ্ধাদের পরবর্তী পদক্ষেপ অনুমান করার প্রয়াসে। সে নিজে বন্দিদের প্রশ্ন করে–শারীরিক নির্যাতন না তার নতুন শাসকমণ্ডলীর অধীনে পুরষ্কারের প্রলোভন দেখিয়ে–জানতে যে জাহাঙ্গীরের সাথে আগত রাজকীয় বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা সে যেমন তিন হাজার অনুমান করেছিল সেটা সঠিক নয় তাদের সংখ্যা আসলে ছয় হাজার যাদের ভিতরে আনুমানিক দেড় হাজার সৈন্য প্রচুর যুদ্ধ উপকরণসহ তার হাতে বন্দি হয়েছে। তার সাথে দশ হাজার রাজপুত যোদ্ধার বাহিনী থাকায় তাত্ত্বিকভাবে মেহেরুন্নিসার চেয়ে এখন তার লোকবল দ্বিগুণ কিন্তু বাস্তবে সে জানে এই সংখ্যার এক চতুর্থাংশ সেনাছাউনি আর বন্দিদের পাহারা দেয়ার কাজে নিয়োজিত রাখতে হবে। সে অশোক আর তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত দু’শ ধীর স্থির সৈন্যদের বিশেষ করে নির্দেশ দিয়েছে জাহাঙ্গীর আর তার দুই নাতির নিরাপত্তা দিকে লক্ষ্য রাখতে কিন্তু সেই সাথে এটাও নিশ্চিত করতে যে তারা সর্বদা তাঁর হাতের মুঠোয় রয়েছে।
মেহেরুন্নিসার আদেশে বিভিন্ন দিকে অসংখ্য রেকি বাহিনীর প্রেরণে একটা সময় পর্যন্ত সে যদিও বিভ্রান্তবোধ করেছিল, কিন্তু একটা বিষয় তার কাছে ক্রমশ পরিষ্কার হতে শুরু করে যে রাজকীয় বাহিনী আসলে উজানে তাদের দিকের নদীর কিনারে একটা ছোট পাহাড়ের চারপাশে তাদের সমস্ত প্রয়াস একীভূত করছে। সকাল হবার ঠিক আগ মুহূর্তে তাঁর হাতে বন্দিদের একজন স্বেচ্ছায় তাকে অবহিত করে যে রাজকীয় বাহিনী ঝিলম নদী অতিক্রম করার জন্য নৌকার সেতু তৈরি করার পূর্বে সেখানে অবস্থিত নদীর একটা গভীর অংশ দিয়ে নদী পার হবার ব্যাপারটা বিবেচনা করলেও দ্রুত সেটা বাতিল করে দিয়েছিল। মহবত খানের এক মুহূর্ত সময় লাগে অনুধাবন করতে যে মেহেরুন্নিসার আদৌ পলায়নের কিংবা আত্মসমর্পণের কোনো অভিপ্রায় নেই বরং বন্দি স্বামীকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য তিনি নদীর সেই গভীর অংশ দিয়েই আক্রমণের একটা পরিকল্পনা করেছেন। তিনি তাঁর স্বদেশী এই পার্সী মহিলাকে সাহসকে শ্রদ্ধা না করে পারেন না। তিনি বস্তুতপক্ষে তাকে তার নিজের স্ত্রীর কথা মনে করিয়ে দেয় এবং এক মুহূর্তের জন্য সেই কঠিন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী মহিলার প্রশান্তিদায়ক সঙ্গ পেতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেন। কিন্তু দাক্ষিণাত্য থেকে তাঁর এই আবেগপ্রবণ অভিযাত্রা শুরু করার আগেই তিনি চিঠি লিখে তাকে পারস্যে নিজের আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখার করার অজুহাতে আগ্রা ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাকে রাজস্তানের আরাবল্লী পাহাড়ী এলাকায় চলে যেতে বলেছিলেন, যেখান থেকে তার সেরা যোদ্ধাদের অনেককেই তার বাহিনীতে যোগ দেয়ায় তিনি জানেন তার স্ত্রী সেখানে নিরাপদেই থাকবে। তিনি একবার যখন নিশ্চিত হন যে নদীর এই গভীর অংশ দিয়েই আগে বা পরে সম্ভাব্য আক্রমণ হতে চলেছে তিনি তখন তার সেরা তবকিদের ভিতরে একহাজার যোদ্ধাকে তাদের আটক করা মালবাহী বহরে খুঁজে পাওয়া গাদাবন্দুক থেকে অতিরিক্ত একটা করে বন্দুক সাথে নিতে আদেশ দেন যাতে তারা দ্রুত দু’বার গুলি বর্ষণ করতে পারে। তিনি তার অন্য লোকদের তাদের গুলি ভরতে সাহায্য করার নির্দেশ দেন, তাঁদের গুলিবর্ষণের হার বৃদ্ধি করার অভিপ্রায়ে। তিনি আশা করেন এভাবে কামানের অভাব পূরণ হবে যদিও রাজকীয় মালবাহী শকটের বহরে তাঁরা ব্রোঞ্জের তিনটি ছোট গজল পেয়েছেন যদিও এর সাথে সামান্যই বারুদ আর গোলা পাওয়া গিয়েছে। তিনি আদেশ দিয়েছেন এগুলো মালবাহী শকটে স্থাপন করে রাতের অন্ধকারে ষাড় দিয়ে টেনে নিয়ে অগভীর অংশের তীরের কাছে অবস্থিত কয়েকটা নিচু মাটির ঢিবির আড়ালে রাখতে বলেছেন, যেখানে তিনি তার বাছাই করা কিছু তবকিকে তাদের অতিরিক্ত বন্দুক আর সাহায্যকারী নিয়ে লুকিয়ে অবস্থান করার আদেশ দিয়েছেন।
যুদ্ধের মুহূর্ত এখন যখন আরো একবার নিকটবর্তী হয় মহবত খান ক্রমশ শান্ত সমাহিত হয়ে উঠেন। তিনি চিৎকার করে নিজের তবকি আর তীরন্দাজদের গুলিবর্ষণ করা থেকে বিরত থাকতে বলেন যতক্ষণ না তিনি নিশ্চিত হন যে তাদের লক্ষ্যবস্তু নিশানার ভিতরে এসেছে আর তিনি তারপরে আদেশ দেন। তাঁর লোকেরা এরপরে যত দ্রুত সম্ভব গুলিবর্ষণ শুরু করে। ছোট কামানগুলোর দায়িত্বে যারা রয়েছে তিনি তাদেরও একই আদেশ দেন, যদিও তিনি জানেন যে অস্ত্রটা ব্যবহারে তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে গোলা বর্ষণ করতে তাদের সময় বেশি লাগবে। তিনি এরপরে রাজকীয় বাহিনীর কোনো সৈন্য যদি আক্ষরিক অর্থেই ঝিলম নদী অতিক্রম করতে সক্ষম হয় তবে তাদের যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য অপেক্ষমান অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে মিলিত হবার জন্য অগ্রসর হন।
