দীর্ঘ নিরবতা বিরাজ করতে থাকে। জাঁহাপনা।’ দীর্ঘদেহী, বাজপাখির মত নাকের অধিকারী এক বাদখশানি শেষ পর্যন্ত কথা বলে, সে তখনও অবশ্য সরাসরি তাঁর চোখের দিকে তাকান থেকে বিরত থাকে। চার কি পাঁচদিন আগে আমি যখন ঝিলম নদী অতিক্রম করার জন্য উপযুক্ত স্থানের সন্ধানে একটা অগ্রবর্তী রেকি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম তখন এখান থেকে প্রায় মাইলখানেক উজানে আমরা নদী পার হবার জন্য একটা সম্ভাব্য অগভীর স্থান খুঁজে পাই। আমরা জায়গা বাতিল করে দেই কারণ মানুষের জন্য সেখানে পানির গভীরতা বেশি থাকায় পানির ভিতর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় স্রোতের টানে ভেসে যাবার একটা সম্ভাবনা ছিল। অশ্বারোহী আর হাতির পক্ষে কেবল সেখান দিয়ে নদী পার হওয়া সম্ভবএবং তারপরেও নদীর তলদেশ পাথুরে আর অসমান। সম্ভাব্য বিপদের ঝুঁকি এড়াবার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়াটা তখন সহজ ছিল এবং এখানে নৌকার সেতু তৈরি করা যেখানে–যদিও পানি অনেক বেশি গভীর-স্রোতের বেগ অনেক কম যেহেতু নদী এপাড়ে অবস্থিত ছোট টিলার কাছে একটা বাঁক নিয়েছে। জাঁহাপনা, আর কোনো উপায় যদি না থাকে আমরা তাহলে সেই অগভীর অংশ অতিক্রম করে আক্রমণের বিষয়টা বিবেচনা করতে পারি।’
‘আপনারা আর কেউ এর চেয়ে ভালো কিছু পরামর্শ দিতে পারবেন? মেহেরুন্নিসা জানতে চায়। নিরবে দেহের ভার এক পায়ের উপর থেকে অন্য পায়ে স্থানান্তরিত করা আর হতাশ দৃষ্টি বিনিময় করা ছাড়া আর কোনো উত্তর পাওয়া যায় না।
‘বেশ তাহলে, সেই অগভীর স্থানেই আমরা যাব–আমি এবং আপনারও নিশ্চয়ই দলত্যাগী, বিশ্বাসঘাতক মহবত খানের হাতে সম্রাটকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিতে চান না। আক্রমণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে কত সময় লাগবে?
‘আমাদের সাথে কি অস্ত্র রয়েছে আর ওপাড়ে আমরা কি ফেলে এসেছি সেটা মিলিয়ে দেখতে, পানি থেকে আমাদের পক্ষে যতটা সুরক্ষা দেয়া সম্ভব সেজন্য গাদা বন্দুকগুলো আর বারুদ তৈলাক্ত কাপড়ের থলেতে বাঁধতে, অবশিষ্ট রণহস্তীগুলোকে তাদের যুদ্ধের সাজে সজ্জিত করতে এসব খুটিনাটি বিষয়ের জন্য কয়েক ঘন্টা সময় প্রয়োজন… আমরা সন্ধ্যা নামার আগেই প্রস্তুত হতে পারবো কিন্তু সকালবেলা হলে ভালো হয়।
‘আমরা যখন এসব প্রস্তুতি গ্রহণ করবো ততক্ষণ মহবত খান দাঁড়িয়ে না থেকে অন্যত্র যাবার জন্য যাত্রা শুরু করবে না? নিখুঁতভাবে ছাটা দাড়ির অধিকারী এক অল্পবয়সী তরুণ সেনাপতি–সবচেয়ে কমবয়সী যোদ্ধাদের একজন–এতক্ষণে কথা বলে।
না। মহবত খান আর যাই হোক তোমার চেয়ে কম আহাম্মক, মেহেরুন্নিসা বলে। সে খুব ভালো করেই জানে যে সে যদিও সম্রাটকে বন্দি করেছে কিন্তু আমায় বন্দি করতে ব্যর্থ হওয়ায় সে ক্ষমতা দখল করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভয় পেয়ো না–সে আমার পরবর্তী পদক্ষেপ দেখার জন্য অপেক্ষা করবে। আমরা সকালবেলায়ই আক্রমণ করবো যাতে তোমাদের কোনো অপদার্থ বলতে না পারে তারা প্রস্তুতি নেয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পায় নি। ইত্যবসরে, নদীর অপর পাড়ের অবস্থান লক্ষ্য করে মাঝে মাঝে গুলিবর্ষণ করা অব্যাহত থাকবে যাতে মহবত খানের। লোকেরা সারা রাত একটা অস্বস্তির ভিতরে কাটাতে বাধ্য হয়। আর সেই সাথে, চারদিকে রেকির দল পাঠাও যাতে সে আমাদের আসল অভিপ্রায় সম্বন্ধে অনুমান করতে ব্যস্ত থাকে। মেহেরুন্নিসার মুখে নির্মম হাসি ফুটে উঠে। সে পরিস্থিতি প্রায় উপভোগই করছে বলা যায়। মহবত খান তাকে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দিয়েছে এবং পূর্বের মত একজন মধ্যস্থতাকারী সহায়তা তাকে নিতে হচ্ছে না। আমার হাতি আর সেটা হাওদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করো। আগামী কাল আমি তোমাদের সুনাম পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেব এবং আমাদের সম্রাটকে উদ্ধার করবো। তোমাদের ভিতরে হয়তো অনেকেই কাপুরুষ কিন্তু একজন মহিলা যখন নেতৃত্ব দিচ্ছে তখন তাঁরাও নিশ্চয়ই পিছিয়ে থাকবার দুঃসাহস দেখাবে না।
*
‘জাহাপনা, মহবত খান আপনার নাতিদের আপনার সাথে থাকবার অনুমতি দিয়েছেন, প্রবেশ পথের মখমলের পর্দা একপাশে সরিয়ে দীর্ঘদেহী এক রাজপুত কথাটা বলে।
দারা শুকোহ আর আওরঙ্গজেব ইতস্তত ভঙ্গিতে ভেতরে প্রবেশ করে। জাহাঙ্গীর ভাবে, যা কিছু ঘটছে এসব কিছুরই কোনো অর্থ তারা বুঝতে পারছে না। তাবুর ভেতরে তারা তিনজন ছাড়া যখন আর কেউ নেই তখন তিনি হাঁটু মুড়ে বসেন এবং দু’হাতে তাদের দু’জনকে আলিঙ্গণ করেন। ‘ভয় পেয়ো না। তোমাদের কেউ কোনো ক্ষতি করবে না। আমি এখানে আছি আর আমি তোমাদের আগলে রাখবো। আর অচিরেই সম্রাজ্ঞী আমাদের উদ্ধার করবেন। মহবত খানের কবল থেকে তিনি পালিয়ে গিয়েছেন এবং এই মুহূর্তে নদীর অপর তীরে তিনি আমাদের সৈন্য আক্রমণের লক্ষ্যে সজ্জিত করছেন।
আওরঙ্গজেব কোনো কথা বলে না কিন্তু জাহাঙ্গীর অনুভব করেন দারা শুকোহ কেমন গুটিয়ে যায়। সম্রাজ্ঞী মোটেই আমাদের বন্ধু নন–তিনি আমাদের শত্রু। আমি আব্বাজানকে সেরকমই বলতে শুনেছি।
‘তিনি ভুল করেছেন। মেহেরুন্নিসা সম্পর্কে তোমাদের দাদীজান হন আর তোমাদের মঙ্গলের জন্য তিনিও উদ্বিগ্ন। আমাদের সাহায্য করার একটা পথ তিনি ঠিকই খুঁজে বের করবেন… তোমাদের সাহায্য করার জন্য…’ জাহাঙ্গীর আওরঙ্গজেবকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
