‘সম্রাজ্ঞীকে তুমি কখনও দেখোনি তাই এমন বলছো। এই মহিলার বক্ষপিঞ্জরে বাঘিনীর হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর মৃদু হাসে। মহবত খানকে মোটেই আহাম্মক বলা যাবে না। মেহেরুন্নিসা মুক্ত থাকায় এখনও সব আশা শেষ হয়ে যায় নি।
তাবুর বাইরে মহবত খান, দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কায় তাঁর আরো একবার কুঁচকে উঠেছে, দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের ঘোড়ায় উপবিষ্ট হোন এবং নৌকার তৈরি সেতুর দিকে এগিয়ে যান। সম্রাজ্ঞী যদি আসলেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হোন তাহলে তার পরিকল্পনা কেবল অর্ধেক সফল হবে। নদী খুব কাছেই অবস্থিত হওয়ায় কয়েক মিনিটের ভিতরে তাকে আবার ঘোড়ার পিঠ থেকে নামতে দেখা যায়। সেতুর চারপাশে প্রাণের কোনো লক্ষণ নেই, যা অক্ষত রয়েছে তার কয়েকজন তবকিকে অনতিদূরে একটা উল্টান মালবাহী শকটের পেছনে আত্মগোপন করে থাকতে দেখা যায়। তারা তাদের বন্দুক গুলিবর্ষণের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় তেপায়ায় রেখে অবস্থান করছে এবং নদীর অপর পাড়ে তাক করা অবস্থায় লম্বা ব্যারেলের উপর দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। অন্যদের ভিতরে অশোককে দেখা যায়, ঝুঁকে তাদের দু’জন সহযোদ্ধার তদারকি করছে যা দেখতে বন্দুকের গুলির ক্ষতচিহ্নের মত মনে হয়। অন্যত্র রক্তে রঞ্জিত কাপড় নিয়ে, নদীর তীরে দু’জনের মৃতদেহ হাত পা ছড়িয়ে নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে। মহবত খানের কাছে এখন স্পষ্ট হয় গুলির শব্দ কোথা থেকে এসেছিল এবং সে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ধারণা করতে পারে এখানে আসলে কি ঘটেছিল। অশোক, কি ব্যাপার?
‘প্রথমে সবকিছুই ভালোমত চলছিল। আমরা সেতুতে উঠার পথ অবরোধ করি। সেতুর উপরে যারা অবস্থান করছিল তারা আমাদের আদেশ অনুযায়ী যদি বাধা দিতে চেষ্টা করে তাহলে আমাদের বন্দুকেন নিশানা হবার হুমকি শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে নেমে আসে বা সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। যারা নদী পার হবার জন্য অপেক্ষা করছিলো–যাদের বেশির ভাগই খচ্চরের সাথে খচ্চর-চালক–প্রায় সাথে সাথে আত্মসমর্পণ করে কেবল তাঁদের পারাপারের ব্যবস্থা তদারককারী এই আধিকারিক তরবারি বের করেছিল। মহবত খান অশোকের হাতের নির্দেশ অনুসরণ করে তাকিয়ে হাত পিছমোড়া করে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা সুঠামদেহী এক অবয়বকে দেখতে পায় যাকে অশোকের দু’জন লোক পাহারা দিচ্ছে। তাকে নিরস্ত করার আগেই সে আমার একজন অধস্তন সেনাপতিকে সামান্য আহত করেছে, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।’
কিন্তু তাহলে অন্য লোকগুলো কীভাবে আহত হল আর মারা গেল?
‘এই ঘটনার কয়েক মিনিটের বেশি পরের কথা না যখন আমি আমার পেছনে ঘোড়ার ধাবমান খুরের আওয়াজ শুনতে পাই এবং আলখাল্লা পরিহিত একটা অবয়ব প্রচণ্ড গতিতে ঘোড়া হাঁকিয়ে সেতুর দিকে ছুটে যায়। আমি চিৎকার করি, “থামুন, নতুবা আমরা গুলি করব!” অশ্বারোহীর মাথা থেকে এমন সময় মস্তকাবরনী খসে গেলে আমি লম্বা কালো চুল বাতাসে উড়তে দেখি। আমি এক মুহূর্তের জন্য ভাবি যে অশ্বারোহী একজন মহিলা কিন্তু তারপরে আমি ধারণাটা নাকচ করে দেই। কোনো মেয়ের পক্ষে দু’পাশে দু’পা ঝুলিয়ে দিয়ে এভাবে প্রাণীটাকে হাত আর হাঁটু দিয়ে তাড়া দেয়া সম্ভব না। আমি গুলি করার আদেশ দিতে যাব তখন আমি বুঝতে পারি যে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আমি এতবেশি সময় নিজের সাথে তর্ক করেছি যে অশ্বারোহী সেই সুযোগে সেতুতে উঠার পথ পাহারা দেয়া দুই প্রহরীকে ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছে একজন কাঁপতে কাঁপতে পানিতে গিয়ে পড়েছে আর সে ইতিমধ্যে সেতু অর্ধেক অতিক্রম করে ফেলেছে ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের দাপটে সেতুর নৌকাগুলো ভীষণভাবে টলমল করছে। আপনার নির্দেশ স্মরণে থাকায় যে প্রভাবশালী হতে পারে এমন লোকদের ক্ষতি যেন না হয় আমি অশ্বারোহীকে নির্বিঘ্নে সেতু অতিক্রম করার সুযোগ দেই। আমি লোকটার সাহসের তারিফ না করে পারছি না। তিনি নদীর অপর তীরে পৌঁছাবার পরে গাদাবন্দুকের গুলিবর্ষণ শুরু হয় এবং অবিরাম গুলিবর্ষণের প্রথম ঝাপটাই আমাদের হতাহতের কারণ। আমরা তারপর থেকে কিছুক্ষণ পর পরই গুলি বিনিময় করছি।’
‘তুমি গুলি না করে ভালো করেছে। তুমি চিন্তাও করতে পারো না তুমি তাহলে কাকে খুন করে বসতে,’ মহবত খান বলেন। তারপরে, তার পরিস্থিতিতে বিষয়টা অদ্ভুতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তা করে, তিনি যোগ করেন, ‘সেতু পুড়িয়ে দাও, যাতে কেউ ফিরে আসতে না পারে।
২.০৭ রক্তগঙ্গা
‘আল্লাহ্র সামনে, সম্রাট এবং তাঁর প্রজাদের সামনে আপনি নিজের সম্মানহানি ঘটিয়েছেন। আপনার অবহেলার কারণে অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে গিয়েছে। সম্রাট বন্দি হয়েছেন! মেহেরুন্নিসা পর্দা প্রথা পুরোপুরি অবজ্ঞা করে ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে জাহাঙ্গীরের দেহরক্ষীদের বয়োজ্যেষ্ঠ আধিকারিকদের সামনে পায়চারি করে। সে যখন সরাসরি তাদের চোখের দিকে তাকায় তখন তারা বাধ্য হয় দৃষ্টি সরিয়ে নিতে, অবলা কুমারী মেয়ের মত তারা মাথা নিচু করে রাখে। আপনারা কীভাবে নিজেদের সম্মান পুনরুদ্ধার করবেন? কীভাবে আপনারা সম্রাটকে উদ্ধার করবেন? আমি সেতুর উপর দিয়ে পালিয়ে আসবার প্রায় সাথে সাথে মহবত খানের লোকেরা যখন সেতুতে আগুন ধরিয়ে দেয় আপনার দাঁড়িয়ে দেখেছেন। আমরা এখন কীভাবে নদী অতিক্রম করবো? আমাদের যদি ঘোড়া আর হাতিগুলোকে সাঁতরে ওপাড়ে নিয়ে যেতে হয় তবুও আমরা নদী অতিক্রম করবোই। দাঁড়িয়ে থাকবেন না, আমার প্রশ্নের উত্তর দিন?
