গোলাপজলের গন্ধে ভেতরটা ভরে আছে। পাথরের একটা টুকরো থেকে তৈরি করা গোসলের বিশাল পাত্রটা থেকে বাষ্প উড়ছে যা সম্রাট ভ্রমণের সময় সর্বদা সাথে রাখেন কিন্তু গোসলের পাত্রটা খালি কেবল গরম পানি সেখানে রয়েছে এবং তাঁর পাশে যে দু’জনকে মহবত খান দেখতে পায় তাঁদের কমনীয় মুখে আতঙ্ক আর ভয় স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। সে সহসা নদীর পাড় থেকে গাদাবন্দুকের পরপর কয়েকটা গুলির শব্দ শুনতে পায়। সম্রাট কোথায়? সবকিছু কি তাহলে ভেস্তে যেতে বসেছে? নাকি আল্লাহ না করেন, তাঁর দীর্ঘ যাত্রার সময় তাঁরই কোনো লোক কি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, জাহাঙ্গীরকে সুযোগ করে দিয়েছে তার জন্য ফাঁদ পাততে? মহবত খান ঘুরে দাঁড়ায় এবং প্রচণ্ড বেগে হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হতে থাকা অবস্থায় দৌড়ে হাম্মাম থেকে বের হয়ে আসে। সম্রাটকে খুঁজে বের করো!’
*
জাহাঙ্গীরের স্বপ্নে ইস্পাতের সাথে ইস্পাতের ঘর্ষণ আর চিৎকারের শব্দ ছন্দোবদ্ধ ভঙ্গিতে আন্দোলিত হয়। কিন্তু তারপরে সহসা নিকটবর্তী হতে, তারা তাঁর নিদ্রা ভঙ্গ করে।
তিনি নিজের বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলোকে বিন্যস্ত করার চেষ্টা করতে করতে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ান, এবং তার কর্চিকে ডেকে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে তিনি ধীর পায়ে তাবুর প্রবেশ মুখের দিকে এগিয়ে যান।
মহবত খান ঘোড়ায় চেপে নদীর তীরে ফিরে যাবার জন্য মন স্থির করায় তাবুর পর্দা উঠার দৃশ্যটা তাঁর নজর এড়িয়ে যায় এবং তখনও রাতের পোষাক পরিহিত অবস্থায় ভেতর থেকে বের হয়ে আসা পিঠ টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্বল অবয়বের সাথে সে কোনোমতে নিজেকে ধাক্কা খাওয়া থেকে বিরত রাখে। সে সাথে সাথে জাহাঙ্গীরকে চিনতে পারে, আগের চেয়েও কৃশকায় এবং চোখ আরও কোটরে ঢুকে গিয়েছে।
সম্রাটই প্রথমে কথা বলেন। মহবত খান, এসব হট্টগোলের কি মানে?
মহবত খান কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা খুঁজে পায় না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো মতে উত্তর দেয়। আমি সাম্রাজ্যের খাতিরে আপনাকে বন্দি করতে এসেছি।’
‘সাম্রাজ্যের খাতিরে বন্দি করতে? কি উদ্ভট কথা! তুমি কি বলতে চাও?
‘সম্রাজ্ঞী এবং আপনার বর্তমান পারিষদবর্গ আপনার না বরং তাদের নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করতে বেশি আগ্রহী। আপনাকে পরামর্শ দেয়ার জন্য তাদের চেয়ে আমি অনেক ভালো অবস্থানে আছি,’ মহবত খান আনাড়ির মত বলে।
‘তোমার এতবড় স্পর্ধা!’ জাহাঙ্গীর গর্জে উঠে তার চোখে মুখে সেই পুরাতন ক্রোধ আর আগুন ঝিলিক দেয় এবং তাঁর হাত কোমরের কাছে উঠে আসে যেখানে যদি তাঁর পোষাক সম্পূর্ণ হতো তবে সেখানে তাঁর খঞ্জরটা গোঁজা থাকত। খঞ্জর অনুপস্থিত দেখে তিনি চারপাশে নিজের প্রহরীদের খুঁজতে চেষ্টা করেন কিন্তু যে কয়েকজন তার চোখে পড়ে সবাই মাটিতে থেবড়ে বসে রয়েছে, হাত ইতিমধ্যে পিছমোড়া করে বাঁধা আর মহবত খানের লোকেরা সব জায়গায় উদ্যত তরবারি হাতে ঘুরে বেড়ায় প্রথম সকালের আলোয় তাদের হাতের তরবারি ঝিলিক দেয়। তিনি হাত নামিয়ে নেন এবং জানতে চান, পরামর্শদাতাদের এই সম্ভাব্য পরিবর্তন কি আমি নিজে পছন্দ করতে পারি?
‘জাহাপনা, যথা সময়ে, আপনি দেখতে পাবেন আপনার বর্তমান পরামর্শদাতাদের চেয়ে আমি কত ভালো পারদর্শিতা প্রদর্শন করতে সক্ষম। মহবত খানের মনে হয় আফিমের কারণে চোখের মণি প্রসারিত হওয়া সত্ত্বেও সম্রাট যেন নিজের পছন্দের বিষয়গুলো বিবেচনা করছেন। তিনি অবশেষে মাথা নাড়েন যেন বুঝতে পেরেছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের চেষ্টা করা বৃথা এবং ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে তার তাবুর লাল চাঁদোয়ার নিচে ফিরে যান। সম্রাটের তাবু পাহারা দাও কিন্তু তার সাথে শিষ্টতা বজায় রেখে আচরণ করবে। তিনি আমাদের সম্রাট।
তাবুর অভ্যন্তরে জাহাঙ্গীর একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর অর্থ বুঝতে চেষ্টা করেন। মহবত খান কি অর্জন করতে পারবে বলে মনে করেছে? জাহাঙ্গীর জানেন এই মুহূর্তে তার সামান্যই করণীয় রয়েছে। তার নাতিরা আর মেহেরুন্নিসা কোথায়? তিনি শীঘ্রই বাইরে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় থেকে উত্তর জানতে পারেন।
‘সেনাপতি, আমরা খুররমের সন্তানদের হেফাজতে নিয়েছি, তিনি শুনতে পান। আমরা তাকে অন্যদের চেয়ে সামান্য দূরে স্থাপিত কঠোর পাহারাধীন এক তাবুতে খুঁজে পেয়েছি। দারা শুকোহ কেবল জানতে চাইছে তাদের বাবা-মার কাছে কখন ফিরিয়ে দেয়া হবে সে কেবলই বলছে আমাদের তাহলে ভালোমত পুরস্কৃত করা হবে। আমি তাকে বলেছি যে সেটা এখনই হবে না আর তাকে ধৈর্যধারণ করতে বলেছি। আওরঙ্গজেব সামান্যই কথা বলেছে কিন্তু আমি তার চোখে ঔদ্ধত্য দেখেছি।
‘রাজেশ, সেটা ভালো, জাহাঙ্গীর মহবত খানের উত্তর শুনতে পান। ‘খুররম, তাহলে অন্তত আমাদের সাথে সমঝোতায় আসতে পারলে খুশিই হবে। ছেলেদের ভালোমত যত্ন নাও কিন্তু তাদের চোখে চোখে রাখবে। আমি তাদের পালিয়ে যাবার সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করছি না। সম্রাজ্ঞী কোথায়?
‘আমি জানি না। শিবিরের সবস্থানে আমার লোকেরা খুঁজে দেখছে কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাকে পাওয়া যায় নি। হাম্মামখানার আমরা এক খোঁজাকে পেয়েছি যে বলছে কালো একটা আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় নিজের ধনুক আর তীরের তূণ নিয়ে তিনি লাফিয়ে একটা ঘোড়া পিঠে উঠে দুই পা দু’পাশে ঝুলিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে বের হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সেনাপতি কোনো মেয়ের পক্ষে এভাবে ঘোড়া চড়া অসম্ভব।
