মহবত খান বৃত্তাকারে ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়ে চরাচর ঢেকে রাখা ধুসরতার মাঝে এগিয়ে যায়। তার ভবিষ্যতের জন্য আগামী কয়েক ঘন্টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সে হয় সাম্রাজ্যের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ লাভ করবে নতুবা যদি তার ধৃষ্টতাপূর্ণ প্রয়াস ব্যর্থ হয়, ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হবে–সম্রাট কখনও একজন বিশ্বাসঘাতককে দ্রুত বা সহজে মৃত্যুবরণ করতে দেন না। সে শূলবিদ্ধ অবস্থায় বা গরম সূর্যের নিচে গলা পর্যন্ত বালিতে পুতে যাঁদের মৃত্যু বরণ করার জন্য ফেলে রাখতে দেখেছিল কিংবা জীবন্ত অবস্থায় ভাবলেশহীন চোখের নির্যাতনকারী নাড়িভূড়ি ইঞ্চি ইঞ্চি করে টেনে বের করে একটা লাঠির চারদিকে পেঁচানোর স্মৃতি মনে পড়তে সে কেঁপে উঠে। তাকে তার নিজের এবং তাঁর লোকদের খাতিরে অবশ্যই সফল হতে হবে এবং সে সফল হবেই। সে নিজের কালো স্ট্যালিয়নকে গম্ভীর মুখে সামনে এগোবার জন্য তাড়া দেয়।
এক ঘন্টার ভিতরে এবং কোনো ঘটনা ছাড়া বা তাদের অবস্থান ফাঁস হবার কোনো নির্দিষ্ট ইঙ্গিত ছাড়াই সে এবং তাঁর লোকেরা ঝিলম নদীর তীরের কিছু নিচু মাটির টিলায় উঠে আসে এবং নিচে অবস্থিত নৌকার সেতুর দিকে তাকায়। কুয়াশা এখনও যদিও রয়েছে কিন্তু দ্রুত পাতলা আর ছাড়া ছাড়া হয়ে উঠছে। মহবত খান কুয়াশার মাঝে বিদ্যমান ফাঁকের ভিতর দিয়ে দেখতে পায় যে আরো রাজকীয় সৈন্য সেতু অতিক্রম করছে তাদের সাথে রয়েছে হাতির পাল যাদের ওজন আর হাঁটার ভঙ্গির কারণে দ্রুত বহমান পানির স্রোতে সেতুর নৌকাগুলো টলমল করে উঁচুনিচু হয়, হিমবাহ আর পাহাড় থেকে বয়ে আনা পলি আর পাথরের কারণে পানির ধুসর সবুজাভ দেখায়। গড়াতে থাকা কুয়াশার মাঝে বিদ্যমান আরেকটা ফাঁক দিয়ে মহবত খান দেখে যে লাল রঙের রাজকীয় তাবু এখনও তার পাড়ের দিকেই রয়েছে এবং তাদের পাশেই রান্নার চুলা জ্বলছে–সম্রাট আর সম্রাজ্ঞী সম্ভবত আলস্যের সাথে সকালের প্রাতরাশ সম্পন্ন করছেন। সে দরবারে নিজের উপস্থিতি থেকে জানে যে সম্রাট, পূর্ববর্তী রাতে নিজের মাত্রাতিরিক্ত সেবনের কারণে বিভ্রান্ত থাকায়–সেটা হতে পারে আফিম, সুরা কিংবা উভয়ের মিশ্রণ–প্রায়শই দেরি করে ঘুম থেকে উঠেন আর আধা তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকেন এবং দুপুরের আগে কখনও পুরোপুরি মানসিকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ হন না। সে দোয়া করে যে তিনি আজও যেন সেরকমই করেন কিন্তু সে এর উপর নির্ভর করতে পারে না।
মহবত খান নিজের আধিকারিকদের দিকে ঘুরে আদেশ দেয়, নষ্ট করার মত সময় নেই। এখন সক্রিয় হও এবং দ্রুত। তোমাদের লোকেরা যেন শৃঙ্খলা বজায় রাখে। তাদের আমাদের নিশান অবমুক্ত করতে আদেশ দাও যাতে রাজকীয় সৈন্যরা আমাদের পরিচয় বুঝতে পারে আর আমাদের অভিপ্রায় সম্বন্ধে তাদের যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব অনিশ্চয়তার মাঝে রাখতে চেষ্টা করো।’ সে কথাটা শেষ করেই গোড়ালি দিয়ে নিজের কালো ঘোড়ার পরে তো দেয়, যা সাগ্রহে সাড়া দেয় এবং মাটির পাহাড়ের উপর দিয়ে নিচের শিবিরের দিকে দ্রুত নামতে শুরু করলে মাটির ঢেলা ছিটকে উঠে।
*
মহবত খান পাঁচ মিনিট পরে জাহাঙ্গীরের খাপছাড়াভাবে সুরক্ষিত শিবিরের ভিতর দিয়ে আস্কন্দিত বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে এগিয়ে যায়। প্রথম কয়েকজন প্রহরী এতটাই বিভ্রান্তবোধ করে যে তাঁরা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেরি করে ফেলে এবং তারা অস্ত্রধারণ করার আগেই সংখ্যায় অনেকবেশি তার নিজের লোক এসে তাঁদের ঘিরে ফেলে। সে নদীর দিকে এগিয়ে যাবার সময় চারপাশে তাকায় এবং রাজেশের লোকদের শিবিরের চারপাশে নিজেদের দ্বারা একটা বৃত্তাকার ব্যুহ রচনা করতে দেখে আর অশোকের সাথের লোকেরা ঘোড়া হাঁকিয়ে নৌকার সেতুর দিকে ছুটে চলেছে, যাবার সময় তাঁদের ঘোড়ার খুরের আঘাতে রান্নার পাত্র এবং শিবিরের অন্যান্য আলগা উপকরণ ছিটকে যায়। সে গুলির কোনো শব্দ শুনতে পায় না এবং কোনো তীর বাতাসে ভাসতে দেখে না, সে এবার তাই রাজকীয় তাবুর দিকে অগ্রসর হতে আরম্ভ করে। সে অচিরেই তাবুর সামনে নিজেকে দেখতে পায় এবং সে ঝড়ের বেগে সেদিকে এগিয়ে যেতে বেশ কয়েকজন লোক আতঙ্কে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। তাদের শত্রুবিহীন মুখাবয়ব এবং কোমল, উজ্জ্বল রঙের কাপড় দেখে মনে হয় তারা হাম্মামের খোঁজা। সে এত জোরে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে যে ঘোড়াটা পেছনের পায়ে ভর দিয়ে প্রায় দাঁড়িয়ে পড়ে। মহবত খান তার বাহনকে স্থির করে খোঁজাদের একজনের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পিঠ থেকে দ্রুত লাফিয়ে নিচে নামে, নমনীয় দেহের অধিকারী তরুণ প্রথমে মহবত খানের হাত থেকে ছাড়া পেতে কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করে মোড়ায় কিন্তু কোনো লাভ হবে না বুঝতে পারা মাত্র সে প্রতিরোধের আর কোনো চেষ্টা করে না। মহবত খান দ্রুত তাঁর কাঁধ ধরে এবং জোরে ঝাঁকি দেয়। সম্রাট কোথায়?
খোঁজা লোকটা কোনো কথা বলে না কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে দশ ফিট দূরে অবস্থিত একটা এলাকার দিকে তাকায় যা শিকারের জটিল দৃশ্যাবলী অঙ্কিত কাঠের তিরস্করণী দ্বারা আলাদা করা এবং চামড়ার ফালি দিয়ে প্যানেলগুলো একত্রে বাঁধা। প্যানেলের নিচ দিয়ে পানি চুঁইয়ে পড়ছে। হাম্মাম তাবু–গোসলের তাবু–মহবত খান ভাবে গতরাতের ভোগলালসার চিহ্ন ধুয়ে ফেলতে তিনি নিশ্চয়ই সেখানে রয়েছেন। খোঁজাটাকে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে, সে দৌড়ে ঘিরে রাখা এলাকাটার দিকে যায় এবং লাথি মেরে কয়েকটা প্যানেলে ছিটকে ফেলে।
