মেহেরুন্নিসা চলে যাবার পরে, জাহাঙ্গীর পুনরায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে। তিনি দারা শুকোহ আর আওরঙ্গজেবের ভক্ত হয়ে উঠেছেন এবং আজকাল টের পান তাঁর প্রতি তাদের প্রাথমিক স্বল্পভাষিতা হয়ত শিথিল হতে শুরু করেছে। পিতা আর পুত্রের সম্পর্কের চেয়ে দাদাজান আর তাঁর নাতির মধ্যকার সম্পর্ক আরো কম অস্বস্তিকর হওয়া উচিত… প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো অনুষঙ্গ সেখানে থাকতে পারে না। তাঁর নিজের আব্বাজান আকবর হয়ত এই কারণেই তার নাতিদের মাঝে এমন আনন্দ খুঁজে পেতেন।
*
‘সেনাপতি, আমরা রাজকীয় বহরের নাগাল ধরে ফেলেছি। মহামান্য সম্রাট ঝিলম নদীর তীরে আমাদের প্রায় পাঁচ মাইল সামনে গত দু’রাত ধরে শিবির স্থাপন করে অবস্থান করছেন যখন তার লোকেরা নদীর উপর নৌকা দিয়ে সেতু নির্মাণে ব্যস্ত। তাঁর অধিকাংশ সৈন্য–আমার ধারণা তাঁর সাথের তিন হাজারের দুই হাজার–আজ সন্ধ্যাবেলা অন্ধকার নামার আগেই নদী অতিক্রম করেছে এবং আমি তারপরে চিৎকার করে রাতের মত পারাপার বন্ধ রাখার আদেশ দিতে শুনেছি এবং তারপরে রাতের খাবার তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আমি নিশ্চিত রাজকীয় বহর আগামী কাল নদী অতিক্রম করবে,’ চারপাশের ভূপ্রকৃতির সাথে মিশে যাবার জন্য ধুসর খয়েরী রঙের পোষাকে আপাদমস্তক আবৃত গুপ্তদূত সেদিন সন্ধ্যাবেলা অন্ধকার নামার পরে ভারমুক্ত মহবত খানকে জানায়।
মহবত খান তার লোকদের মানসিকতা সম্বন্ধে ঠিক যেমনটা আশা করেছিল তাঁরা তাঁর সাহসী আর আবেগতাড়িত পরিকল্পনার প্রতি সাথে সাথে এবং সবস্বরে নিজেদের সমর্থন জ্ঞাপন করে অনিবার্য ঝুঁকি আর বিপদের সম্ভাবনা সত্ত্বেও। তার পোড় খাওয়া রাজপুত বাহিনীর পুরো দলটাও একই রায় দিয়েছে। রাজকীয় বহরের চেয়ে আটগুণ দ্রুত অগ্রসর হয়ে তারা দ্রুত ব্যবধান হ্রাস করেছে। আসবার পথে কোনো রাজকীয় আধিকারিক তাঁদের এহেন দ্রুততার বা তাদের অভিযান সম্পর্কে খোঁজখবর নিলে মহবত খান জোরালো কণ্ঠে যখন জানিয়েছে যে আরেকটা সফল অভিযানের সংবাদ সে নিজে সম্রাটকে দিতে চায় তারা সহজেই সন্তুষ্ট হয়েছে। তা যাই হোক সে কৃতজ্ঞ যে ধাওয়া করার পর্ব সমাপ্ত হয়েছে এবং সময় হয়েছে তাঁদের পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করার।
শিবিরের পেছনের অংশে কি পাহারার বন্দোবস্ত রয়েছে?’ মহবত খান জানতে চায়।
না, গুপ্তদূত উত্তর দেয়। প্রহরী অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেটাও গুটি কয়েকজন এবং তারা শিবিরের সীমানার কাছাকাছি অবস্থান করে আর তাঁদের দেখে ভীষণ নিরুদ্বিগ্ন মনে হয়েছে। আমি পরিক্রমণে কেবল তাঁদেরই বের হতে দেখেছি যারা সম্ভবত নদীর অপর তীরে সামনের পথ পর্যবেক্ষণে রওয়ানা হয়েছিল।
মহবত খান মৃদু হাসে। পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে চক্রান্ত শুরু করেছে। সকালে আরো রাজকীয় সৈন্য নদী অতিক্রম করা পর্যন্ত তাকে কেবল অপেক্ষা করতে হবে, সেতু পুড়িয়ে বা অবরোধ করে সে তারপরে শিবিরে হামলা চালিয়ে সম্রাট, সম্রাজ্ঞী আর খুররমের দুই সন্তানকে বন্দি করবে। নিরাপত্তার খাতিরে সে আর তার লোকেরা আজ রাতে অবশ্য এক বা দুই মাইলের মত পিছিয়ে যাবে এবং রান্নার জন্য আগুন জ্বালাবে না যা হয়ত তাদের অবস্থানের কথা ফাঁস করে দিতে পারে।
*
পাহাড়ের এবং ঝিলমের অববাহিকা ঘিরে রাখা পর্বতের ছায়ায় কনকনে শীতল একটা রাত। মহবত খান যখন সকাল হবার সাথে তার অশ্বারোহী যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিয়ে রওয়ানা দেয় তখনও চারপাশের চরাচর ভারি কুয়াশার চাদরে ঢাকা। ভাগ্য নিঃসন্দেহে তাঁর পক্ষে রয়েছে। সে ভাবে নদী পারাপারের স্থানে কুয়াশার কারণে তারা কারো চোখে ধরা না পড়ে পৌঁছে। যাবে। কিন্তু সে অবশ্যই কেবল ভাগ্যের উপর নির্ভর করবে না। সে অবশ্যই সংযত থাকবে এবং কোনো কিছুই ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেবে না। সে অনেক সেনাপতিকে যুদ্ধে পরাজিত হতে দেখেছে কারণ তারা ভেবেছিল সবকিছু অতিমাত্রায় তাদের পক্ষে রয়েছে যার কারণে তারা ঠিকমত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে নি বা তাদের আক্রমণে যথেষ্ট যত্নশীল হয়নি। সে তাই তার অধীনস্তদের গত রাতে তাঁর জারি করা আদেশ সম্বন্ধে আরো একবার সতর্ক করে দেয়।
‘অশোক, সে তার বাহিনীর অগ্রভাগে বাদামি রঙের ঘোড়ায় উপবিষ্ট তরুণ রাজপুত যোদ্ধাকে ডাকে। তোমার দায়িত্ব নৌকার সেতু অকার্যকর করা যাতে কোনো রাজকীয় সৈন্য নদী পার হয়ে আসতে না পারে। দরকার মনে করলে সেতু পুড়িয়ে দেবে। রাজেশ, তুমি’–সে ঘুরে আরেকজন বয়স্ক ঝাঁকড়া দাড়িঅলা যোদ্ধার দিকে তাকায় যার মুখে চুলের প্রান্তদেশ থেকে দাড়ি পর্যন্ত আড়াআড়ি একটা ক্ষতচিহ্ন রয়েছে এবং যেখানে তাঁর বামচোখ থাকার কথা ছিল তার উপরে চামড়ার একটা পট্টি বাঁধা–’তুমি আর তোমার লোকেরা শিবির ঘিরে ফেলবে এবং দেখবে কেউ যেন দক্ষিণে আমাদের আক্রমণের খবর জানাতে পালিয়ে যেতে না পারে। আমি বাকি সৈন্যদের নিয়ে নিজে রাজকীয় পরিবারকে বন্দি করার জন্য যাব।
‘তোমরা সবাই মনে রাখবে, যতদূর সম্ভব হতাহতের বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করবে কেবল আমাদের লোকদের ক্ষেত্রেই না রাজকীয় সৈন্যদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমাদের তাদের যত বেশি সম্ভব তত বেশি লোকের সহযোগিতা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, রাজকীয় পরিবারের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। তাঁরা জীবিত অবস্থায় আমাদের কাছে তাদের ওজনের পরিমাণ সোনার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি মূল্যবান। তারা মারা গেলে তাঁদের ওজন আমাদের টেনে পাতালে নিয়ে যাবে, সবাইকে আমাদের শত্রুতে পরিণত করবে এবং সমঝোতা অসম্ভব করে তুলবে। তোমরা আমার কথা বুঝতে পেরেছো?’ তাঁর আধিকারিকেরা মাথা নাড়ে। ‘এখন এসো এই কুয়াশার সর্বোচ্চ সুবিধা গ্রহণ করা যাক।
