একজন যুবরাজ আর একজন পিতা হিসাবে–যদিও তাঁর প্রথম সহজাত অভিপ্রায় ছিল–তাঁর আব্বাজানের প্রস্তাব প্রত্যাখান করা, কিন্তু আরজুমান্দ কি ঠিক কথাই বলেনি? খুররম চিন্তা করে, তাঁর বাক্য বিন্যাসের স্পষ্টতা আর তারমাঝে নিহিত সত্য তাকে চমকে দেয়। তাদের সামনে আসলে সত্যিই কি করার আছে? তাঁর সাথে মাত্র তিনশ লোক রয়েছে এবং নতুন সৈন্য নিয়োগের মত অর্থও তার নেই। সে যদি একা হত তাহলে প্রথম মোগল সম্রাট বাবরের মত সে একাকী লড়াই করতে পারতো, পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে চোরাগুপ্তা হামলার পাশাপাশি ভূখণ্ড অধিকার করার সুযোগের অপেক্ষা করতো। কিন্তু তাকে নিজের পরিবারের কথাও ভাবতে হবে…
সে এখন যখন অনেক শান্ত সুস্থির হয়ে চিন্তা করে সে দেখে যে জাহাঙ্গীরের প্রস্তাব দাবার জটিল চালের মত তাঁর আব্বাজানের অভিপ্রায়ে সাড়া দেয়া ছাড়া তাঁর সামনে আর কোনো পথই খোলা রাখেনি। জাহাঙ্গীর একটা সময় দাবা খেলতে পছন্দ করতো, কিন্তু খুব ভালো করেই জানে কার জটিল মন থেকে তাকে তার সন্তানদের সমর্পণ করার দাবি উত্থাপনের মত ধারণার জন্ম হয়েছে। সে মানসপটে দেখতে পায় মেহেরুন্নিসা তাঁর আঙুলের চারপাশে একগোছা কাল চুল নিয়ে খেলা করার ছলে হাসছেন এই ভেবে যে সে আর আরজুমান্দ কি করবে। মেহেরুন্নিসা অনেকটা মাকড়সার মত যে একটা বা দুটো মামুলি সুতো দিয়ে শুরু করে আরো জটিল একটা জাল বুনে ফেলে। তাঁর আব্বাজান বহু বছর আগেই সেই জালে আটকা পড়েছেন। একদিন, সে নিজের কাছে ওয়াদা করে, সে এই জাল ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করবে। সে নিজেকে, সেইসাথে তাঁর পরিবারকে এবং এমনকি তার আব্বাজানকেও–যদি না তিনি এরই মধ্যে মেহেরুন্নিসার জালে পুরোপুরি হারিয়ে না যেয়ে থাকেন–তাঁর বন্ধন থেকে মুক্ত করবে, মোগল সাম্রাজ্যকে আরো একবার উন্নতির সুযোগ দেবে। কিন্তু সেই সন্তুষ্টি কেবল ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে রয়েছে। তাকে সবচেয়ে প্রথমে বর্তমানের দিকে নজর দিতে হবে।
‘তুমি ঠিকই বলেছো, সে কথা বলার সময় তার হৃদয়ের চারপাশে একটা ভার চেপে বসতে থাকে। সত্যি কথাটা–এবং আমার চেয়ে দ্রুত তুমি সেটা অনুধাবন করতে পেরেছো–আমাদের সামনে রাজি না হয়ে অন্য কোনো পথ নেই। কিন্তু দারা শুকোহর সাথে আমরা আমাদের অন্য কোনো সন্তানকে প্রেরণ করবো-শাহ সুজা না আওরঙ্গজেব?
‘আওরঙ্গজেব,’ আরজুমান্দ কিছুক্ষণ চিন্তা করে উত্তর দেয়। সে যদিও শাহ সুজার চেয়ে বয়সে এক বছরের ছোট কিন্তু সে শক্তিশালী–সে এখনও পর্যন্ত একদিনও অসুস্থ হয়নি–এবং সে নির্ভীক। সে এমনকি দরবারে যাবার সম্ভাবনায় উৎফুল্লও হতে পারে। আরজুমান্দের কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে উঠে। তাঁদের কবে নাগাদ যেতে হবে?
‘আব্বাজান আমাকে আদেশ দিয়েছেন আমার সিদ্ধান্ত পাটনার সুবেদারের কাছে সাথে সাথে জানাতে যিনি রাজকীয় অশ্বারোহী বার্তাবাহকদের সাহায্যে আমার চিঠি দ্রুত আগ্রা প্রেরণের বন্দোবস্ত করবেন। আমরা যদি তাঁর প্রস্তাব মেনে নেই তাহলে কড়া প্রহরায় আমাদের সন্তানদের এলাহাবাদে প্রেরণ করতে হবে যেখানে তিনি তাঁর লোকদের পাঠাবেন তাঁদের স্বাগত জানাতে। আমাদের অবশ্যই তাদের দ্রুত প্রস্তুত করতে হবে। দারা শুকোহ বড় হয়েছে সে এটা বুঝতে পেরেছে যে আমার আর আমার আব্বাজানের মাঝে বিরোধ রয়েছে। আমাদের অবশ্যই তাকে বলতে হবে যে আমরা আমাদের বিরোধ মিটিয়ে ফেলেছি এবং তাদের দাদাজান তাঁদের দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। আমরা কতটা বিপর্যস্ত সেটা আমরা তাদের সামনে প্রকাশ করবো না…
২.০৬ সুবিধাবাদী শয়তান
মহবত খান ক্লান্ত-দর্শন রাজকীয় অশ্বারোহী বার্তাবাহকের হাত থেকে চামড়ার তৈরি বার্তার থলিটা গ্রহণ করে যে মাত্র পাঁচ মিনিট আগে খুররমকে মোকাবেলার উদ্দেশ্যে ধূলোর মেঘের আড়ালে অগ্রসরমান সৈন্যদলের সাথে এসে যোগ দিয়েছে। মহবত খান চামড়ার জীর্ণ থলিটা খুলে ভেতরে রক্ষিত একমাত্র চিঠিচা বের করেন এবং সবুজ সীলমোহর ভাঙেন। চিঠিটায় দ্রুত একবার চোখ বুলিয়ে তিনি তাঁর যা জানার জেনে নেন। সীলমোহরটা যদিও জাহাঙ্গীরের কিন্তু চিঠির লেখাটা মেহেরুন্নিসার, তাকে প্রদত্ত আদেশের ক্ষেত্রে প্রায়শই যা হয়ে থাকে। তাঁর চিঠির ভাষা কঠোর: বদমাশটার বোধোদয় ঘটেছে এবং শর্ত মেনে নিয়েছে, তাঁর ভবিষ্যতের ভালো ব্যবহারের নিশ্চয়তা স্বার্থে নিজের দুই ছেলেকে আমাদের তত্ত্বাবধানে প্রেরণে সম্মত হয়েছে। আপনার অভিযান সমাপ্ত হয়েছে। আগ্রায় ফিরে আমার পরবর্তী আদেশের জন্য অপেক্ষা করেন যা আমরা কাশ্মীর পৌঁছাবার পরে প্রেরণ করা হবে। মেহের। চিঠি লেখার স্থান আর তারিখ এরপরে দেয়া রয়েছে–লাহোর।
মহবত খান চিঠির কাগজটা নিজের হাতের মুঠোর মুচড়ে নিয়ে ভাবে, কোনো সামান্যতম ধন্যবাদজ্ঞাপন বা শুভেচ্ছার একটা শব্দও নেই। ‘কোনো উত্তর দেয়ার প্রয়োজন নেই, সে বার্তাবাহককে বলে, কেবল মামুলি প্রাপ্তিস্বীকার যে আমি আদেশ পেয়েছি। তার পাশে অবস্থানরত আধিকারিকের দিকে তাকিয়ে–খয়েরী রঙের ঘোড়ায় উপবিষ্ট, অশোক নামের এক সুঠামদেহী তরুণ রাজপুত–সে বলে, ‘সম্রাট–বা বলা যায় সম্রাজ্ঞী–আমাদের ফিরে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। অভিযান সমাপ্ত হয়েছে। আমরা এখানেই যাত্রাবিরতি করে আজ রাতের মত শিবির স্থাপন করবো। তারপরে, গলার স্বর মোলায়েম করে, সে তার একজন পরিচারকের উদ্দেশ্যে বলে, বার্তাবাহক যেন ভালো করে খাবার আর বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পায় আর সেই সাথে সে ফিরতি পথে যাত্রা শুরু করার সময় তাকে যেন তাজা ঘোড়া দেয়া হয় সে বিষয়টা নিশ্চিত করবে।
