আরজুমান্দের আড়ষ্ট মুখাবয়ব সহসা রক্তিম দেখায়। রাজকীয় মিনা বাজারে প্রথমবার সে যে লাজুক উচ্ছল মেয়েটাকে দেখেছিল তাকে পুনরায় সেরকম দেখায়। এটাতো ভীষণ আনন্দের কথা। তিনি আপনার সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সম্মত হয়েছেন। তিনি আপনাকে মার্জনা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটা অবশ্যই তারই ইঙ্গিত করে। এতগুলো বছর ভবঘুরের মত কাটাবার পরে আমি আর আমার সন্তানেরা অবশেষে এবার নিরাপদে থাকতে পারবো।’ সে দুহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে কিন্তু খুররম যখন তাকে একই আবেগে জড়িয়ে ধরতে ব্যর্থ হয় সে তখন তাঁর গলা ছেড়ে দিয়ে কয়েক কদম পেছনে সরে আসে। কি ব্যাপার? আপনি কি এটাই আশা করছিলেন না? খুররম, আপনাকে কেন আনন্দিত দেখাচ্ছে না? আমাকে দয়া করে সব খুলে বলেন?
খুররম মনে মনে জাহাঙ্গীরের শীতল, সংক্ষিপ্ত, অপমানজনক শব্দগুলোর কথা ভাবে–পিতার কাছ থেকে পুত্রের কাছে মার্জনার কোনো বার্তা না বরং কোনো শাসকের কাছ থেকে অপকর্ম করা কোনো জায়গীরদারের কাছে প্রেরিত শর্তের তালিকা। আর এসব শর্তের ভিতরে যে শর্তটা এখনও মেনে নিতে তার কষ্ট হচ্ছে সেটাই তাকে এখন আরজুমান্দের কাছে খুলে বলতে হবে।
‘আমার সদাচারের নিশ্চয়তা হিসাবে, আব্বাজান দাবি করেছেন যে দারা শুকোহ আর তার এক ভাইকে আমায় দরবারে পাঠাতে হবে।
‘কি? আরজুমান্দ ফিসফিস কণ্ঠে বলে। সে নিজের মাথায় হাত দেয় যেন এইমাত্র কেউ তাকে সেখানে আঘাত করেছে এবং তারপরে সে ধীরে ধীরে লাল মলিন গালিচার উপর হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে। খুররম অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকে সে যখন কাঁদতে শুরু করে। তার উচিত তাকে জড়িয়ে ধরা এবং কাছে টেনে নেয়া কিন্তু তাকে সে কীভাবে সান্ত্বনা দিতে পারে যখন সে নিজেও একই রকমের হতাশা বোধ করছে।
‘আমার আব্বাজান বলেছেন দুজনের সাথেই ভালো আচরণ করা হবে কিন্তু তোমার কাছ থেকে আমি সত্যি কথা গোপন রাখতে পারবো না। তারা আসলে বন্দি থাকবে সেটা যেভাবেই বলা হোক না কেন।
‘দারা শুকোহর বয়স এত অল্প… আমি বিষয়টা ভাবতেই পারছি না। আপনার আব্বাজান এতটা নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারেন? তিনি দারাকে একটা সময় ভালোবাসতেন… আমার মনে আছে দারার জন্মের সময় তিনি তাকে কি উপহার দিয়েছিলেন…’।
‘আমি নিশ্চিত আমার আব্বাজান আমার সন্তানদের কখনও কোনো ক্ষতি করবেন না। কিন্তু…’ সে কথা বন্ধ করে এবং আরজুমান্দের দিকে তাকায়, জানে সে বুঝতে পেরেছে।
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখ থেকে অশ্রু মুছে নিয়ে এবং প্রাণপণে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবার চেষ্টা করতে করতে আরজুমান্দ কেবল একটা শব্দই কোনোমতে উচ্চারণ করে।
‘মেহেরুন্নিসা?
সে মাথা নাড়ে।
‘আপনার সত্যিই মনে হয় সে তাঁদের কোনো ক্ষতি করতে পারে।
খুররম মনে মনে ভাবে। সে মেহেরুন্নিসাকে যতটা ঘৃণা করে–এবং বিপরোয়া পরিস্থিতিতে তিনি কি করতে পারেন সেটা কে বলতে পারে?–তাতে সে কি তাকে ঠাণ্ডা মাথায় শিশু হত্যাকারী হিসাবে কল্পনা করতে পারে? না, আমার সেটা মনে হয় না, সে অবশেষে তাকে বলে। ‘আর সর্বোপরি, সে কেন এমনটা করবে? আমাদের সন্তানদের উপরে নিয়ন্ত্রণই তার জন্য যথেষ্ট। তিনি এটা জানার জন্য যথেষ্ট বুদ্ধি রাখেন যে তাঁদের প্রতি যেকোনো ধরনের বিরূপ আচরণ জনমতকে আঘাত করবে। আমাদের ঐতিহ্য–সেই তৈমূরের সময় কাল থেকে এটা চলে আসছে–সেটা হল অল্পবয়সী আর নির্দোষ যুবরাজদের জীবন পবিত্র জ্ঞান করা। তারা যখন বড় হয়ে বিদ্রোহ করে কেবল তখনই তারা কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হয়ে থাকে।
আরজুমান্দ ধীরে ধীরে নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং মুখের উপর থেকে খোলা চুলের গোছা সরিয়ে দিয়ে মন্থর পায়ে জানালার দিকে হেঁটে যায়। সূর্য অস্ত যাচ্ছে, দূরের গোলাপি পাহাড়ের চূড়া গোলাপিবর্ণ ধারণ করেছে। রাতের খাবার রান্না করার জন্য জ্বালান গোবরের আগুনের ঝাঁঝালো গন্ধ সে টের পায় এবং তাকিয়ে দেখে নিচের আঙিনায় রাতের প্রথম মশালের আলো জ্বলছে। সবকিছু কত স্বাভাবিক দেখাচ্ছে, সে ভাবে, অথচ তাদের সবার জীবন কেমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। একজন মা হিসাবে তার কি করণীয়? তাঁর দু’জন সন্তানকে সমর্পণ করে বাকিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা? সে এখন যে মানসিক যাতনা অনুভব করছে তাঁর সাথে সন্তান জন্ম দেবার কষ্টের কোনো তুলনাই হয় না।
‘আমাদের সামনে একটা পথ রয়েছে। আমরা আমার আব্বাজানের শর্ত উপেক্ষা করতে পারি। আমরা উত্তরে যাত্রা করতে পারি, পাহাড়ী এলাকায় যেখানে মহবত খানের পক্ষে আমাদের অনুসরণ করা কঠিন হবে…’
কিন্তু আরজুমান্দের মুখ সে যখন জানালা থেকে ঘুরে দাঁড়ায় কঠোর দেখায়। না। আপনি যদি আপনার আব্বাজানের প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন তাহলে তিনি কি বলবেন সেটা একবার ভেবে দেখেন যে তার কাছে আমাদের সন্তানদের-তার নাতিদের-বিশ্বাস করে প্রেরণ করতে আপনার অনিচ্ছার অর্থই হচ্ছে আপনি কখনও তার প্রতি অনুগত থাকতে চাননি। তিনি তখন প্রশ্ন করবেন একজন সম্ভাব্য অনুগত আর দায়িত্ববান সন্তান কেন নিজের সন্তানদের তাদের দাদাজানের কাছে পাঠাতে অস্বীকার করবে যদি না তার বিদ্রোহ করার কোনো অভিপ্রায় না থাকে। তিনি তখন আপনাকে গ্রেফতার করার জন্য দ্বিগুণ সৈন্য প্রেরণ করবেন আর আমাদের সন্তানদের তখন কি হবে?
